সম্পাদকীয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সম্পাদকীয় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সম্পাদকের কলমে


সম্পাদকের কলমে

যুদ্ধটা কৃষকদের। সরকারের আনা আইনের বিরুদ্ধে। সরকারের সাথে। যে দেশে ৭০% মানুষ কোন না কোনভাবে কৃষির সাথে জড়িত, সেদেশে কৃষকদের কে কে সমর্থন করলো আর করলো না, তাতে কৃষক আন্দোলনের বিশেষ কিছু যাবে আসবে না। সমগ্র কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে প্রয়োজনে সরকার পতনও ঘটে যেতে পারে। সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা হল সমগ্র কৃষক সমাজের ঐক্যবদ্ধ হওয়া নিয়ে। এবং সেই ঐক্য মজবুত রাখা নিয়ে। সরকারপক্ষ তার সমস্ত মেশিনারি দিয়ে কৃষক সমাজকে বিভক্ত রাখার চেষ্টা করবে। সেটাই সরকারের কাজ। সরকারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলও তার সকল শক্তি নিয়োগ করবে কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে। এবং রাজনৈতিক বল প্রয়োগ করে কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে লাগাতার অপপ্রচার চালিয়ে যাবে। বিগত বছরের ২৬শে নভেম্বর থেকেই যা করা হচ্ছে। এবং আরও জোরদার অপপ্রচার শুরু হয়ে গিয়েছে ২৬শে জানুয়ারীর লালকেল্লা ষড়যন্ত্রের পর থেকে। ফলে ছবিটা এখন পরিস্কার। একদিকে কৃষক সমাজের একটা বড়ো অংশের, রাজপথে দুর্বার কৃষক আন্দোলন। অন্যদিকে সরকার তার সমস্ত শক্তি নিয়ে। এবং সরকারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল, তার রাজনৈতিক শক্তির দৌলতে লাগাতার অপপ্রচারের কার্যক্রম নিয়ে। এই দুই মুখোমুখি পক্ষের মাঝে আমি আপনি কখন কোন পক্ষে, সেটা খুব একটা জরুরী বিষয় নয় বলেই মনে হয়।

 

যেটা জরুরী বিষয়। সেটি হলো। আমার আপনার এই কৃষক আন্দোলন সম্বন্ধে ব্যক্তিগত অবস্থান কি, সেটি। তাতে কৃষক আন্দোলনের গতি প্রকৃতি পরিণতি কোন কিছুই নির্ভর করছে না ঠিক। কিন্তু নির্ভর করছে আমার আপনার আত্মপরিচয়ের আসল ছবিটি। এই যে আমি আপনি। কেউ অশিক্ষিত। কেউ স্বল্প শিক্ষিত। কেউ উচ্চ শিক্ষিত। এবং অনেকেই অর্ধশিক্ষিত। আমরা এই আন্দোলনলকে কিভাবে দেখছি। বুঝছি। জানছি। এবং অনুধাবন করছি। সেখানেই কিন্তু আমাদের আত্মপরিচয়ের স্বরূপ। অনেকেই মুখে কুলুপ এঁটে থাকায় বিশ্বাসী। থাকবও। অনেকেই সরব হতে ভালোবাসি। হই্। কেউ একজনের পক্ষে তো কেউ আর একজনের পক্ষে। কিন্তু যারা মুখে কুলুপ এঁটে থাকায় পারদর্শী, তারাও অন্তরে কোন না কোন একটি পক্ষের হয়ে ওকালতি করতে থাকি। ফলে খোলা আকাশের নীচে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় দিল্লীর সীমানায় ব্যারিকেডের ওপারে রাজপথে অবস্থানরত কৃষকদের আন্দোলনের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে আমরা সকলেই। কেউ ভোকাল। কেউ সাইলেন্ট।

 

এখন আন্দোলনের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে আমাদের এই অবস্থান আমাদেরকে প্রথমেই যে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, সেটি হলো। আমরা কে কতটা সৎ। একজন অসৎ মানুষ যে কখনোই চলমান কৃষক আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়াবেন না। সেটা কিন্তু চোখ বুঁজেই বলে দেওয়া যায়। কিন্তু তাই বলে একথাও বলা যায় না যে কৃষক আন্দোলন বিরোধী সকলেই অসৎ। তার একটা অন্যতম কারণ এই, আমাদের দেশে স্বাধীন ভাবে চিন্তা করার মতো ক্ষমতা খুব বেশি মানুষের থাকে না। প্রায় অধিকাংশ মানুষই প্রচারের দাসত্ব করে থাকে। কি অশিক্ষিত। কি অর্ধশিক্ষিত। কি শিক্ষিত। ফলে এই শ্রেণীর মানুষের একটাই ভরসা। প্রচার যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ। এবং তাঁরা সেটাই করে থাকেন। কোন না কোন পক্ষের প্রতি অন্ধভক্তিই এই কাজে সহায়তা করে থাকে। এবং এই অন্ধভক্তি এমনই সুদৃঢ় যে নিজের ঘাড়ে কোপ না পড়লে ভক্তি টলে না। বস্তুত চলমান কৃষক আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রায় সকল কৃষকের ক্ষেত্রেই এই ঘটনাটিই ঘটে গিয়েছে। এই কৃষি আইন পাশ হওয়ার আগে বিগত সাত বছরে সরকারের আনা একাধিক অন্যায্য আইন প্রয়োগের সময়েও এই কৃষকদের সরকারের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে টাল খায়নি। কারণ সেই আইনগুলি সরাসরি তাদের জীবনজীবিকায় মারণ কোপ বসায় নি। তাই তাঁরা সরকারের প্রতি তাদের অন্ধবিশ্বাসের ধারাটিকে মজবুত করেই ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু এইবার, নতুন এই কৃষি আইন চালু হতেই সেই সুদৃঢ় অন্ধবিশ্বাসে এমন ফাটলই ধরলো যে, আজ অধিকাংশ কৃষকই সরকার বিরোধী অবস্থানে পৌঁছিয়ে গিয়েছেন। কারণ এই আইন সরাসরি তাদের জীবনজীবিকাকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কথায় আছে আপনি বাঁচলে বাপের নাম। ভারতবর্ষের কৃষকরা আজ সেটি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। তাই রাজপথই আজ তাদের একমাত্র আশ্রয়। একমাত্র অস্ত্র।

 

অন্ধবিশ্বাস যখন ভাঙে তখন এইভাবেই বন্যার জলে বাঁধ ভাঙার মতো করেই ভেঙে পড়ে। এখন কৃষক আন্দোলন আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের স্বরূপ উন্মোচনেও একটা বড়ো ভুমিকা রেখেছে। এই আন্দোলন প্রমাণ করে দিচ্ছে, আমরা কে কতটা অন্ধভক্ত। আর কে কতটা প্রকৃত শিক্ষিত। যাঁর স্বাধীন ভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা রয়েছে। সমাজের পক্ষে মাঝে মাঝে এই ঝাড়াঝাড়ির খুব দরকার। কুলোয় করে ঝাড়ার মতোন, আমরা দুই পক্ষে ভাগ হয়ে যাচ্ছি। কে অন্ধভক্ত। আর কে চক্ষুষমান। এটার সত্যিই খুব দরকার ছিল। যাঁরা সমাজ ও সমকাল নিয়ে পড়াশুনা করেন। গবেষণা করেন সমাজ ও রাজনীতির সমকালীন ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে। তাঁদের পক্ষে এ এক মেঘ না চাইতেই জল। তাঁরা দেখতে পারছেন সমাজের সামগ্রিক চিত্রটা। বুঝতে পারছেন সেই চিত্রের বাস্তবিক সত্যের স্বরূপ।

 

এখন প্রশ্ন, আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? আমাদের নিজেদেরকে? দিল্লীর সীমান্তে অবস্থানরত এই কৃষক আন্দোলনের পরিণতি যাই হোক না কেন। এই আন্দোলন আমাদেরকে এক যুগসন্ধিক্ষণের আগাম বার্তা দিচ্ছে। সেই যুগসন্ধিক্ষণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা কি চিনে নিতে পারছি নিজেদের স্খলন পতন কিংবা অর্জন? উপলব্ধি করতে পারছি নিজেদের ব্যক্তিস্বরূপের একান্ত উন্মোচনকে? আমাদের ব্যক্তিস্বরূপের একান্ত এক উন্মোচন তো হচ্ছেই। কুয়াশা কেটে যেতে থাকা ভোরের মতো। হ্যাঁ, সেই ঘটনা স্বীকার করা না করা, প্রত্যেকের মৌলিক অধিকারের বিষয় অবশ্যই। চলমান কৃষক আন্দোলনের এই এক বড়ো সাফল্যের দিক। আজ আর নিজের কাছে নিজেকে লুকিয়ে রাখার উপায় থাকছে না। যে কাজটি আমরা বিশেষ দক্ষতার সাথে বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে এসেছি। আর এসেছি বলেই হয়তো আজ শুধু কৃষকরাই পথে বসে নি। বাকিরাও সময়ের সাথে সাথে একে একে বসতে চলেছে। কেউ একটু আগে কেউ একটু পড়ে টের পাবে শুধু।

 

কৃষক আন্দোলনের পক্ষে বিপক্ষে থাকা নিয়ে আমরা নিজেদের সাথে অন্যদেরকেও চিনে নিতে পারছি। কার দৌড় কত। কে কোন দরের। এবং তাই নিয়ে সমাজে জল ঘোলাও কম হচ্ছে না। কে কি টুইট করলো। কে কার কোন টুইট রিটুইট করলো। কে কি বাইট দিল। ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার কৃষক আন্দোলনের উপরে নেমে আসা রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের পক্ষে বিপক্ষে থাকার ভিতর দিয়েও আত্মস্বরূপের উন্মোচন হচ্ছে। বেশ দ্রুতই। এর ভিতর আবার অনেকে আছেন। যাঁদের সাহেব মেমদের কথার উপরে বিশ্বাস বেশি। ফলে ভারতীয় কৃষক আন্দোলন ও সেই আন্দোলন দমনে কেন্দ্রীয় সরকারের ভুমিকা নিয়ে সাহেব মেমরা কে কি বলছেন, তার উপরেও অনেকের গভীর বিশ্বাস। এবং সেই মতো নিজেদের চিন্তা ভাবনা সমর্থন বিরোধীতার ভুখণ্ড সাজিয়ে নিচ্ছেন।

 

এই সব খণ্ড খণ্ড ছবিগুলি সামগ্রিক ভাবে একটা ছবি সুস্পষ্ট করে তোলে। সেটি হলো আত্মনির্ভর মানসিকতার অভাব। অপুষ্টির মতো এই একান্ত মানসিক পরনির্ভরতাও এক রোগ। এই রোগ সমাজের ভিতরে যত গভীরে শিকড় বিস্তার করবে এবং যত ব্যাপক ছড়িয়ে পড়বে একটি দেশ একটি সমাজ ততই দুর্বল হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক শক্তিগুলি এই মানসিক পরনির্ভতার ভিতের উপরেই তাদের রাজত্ব বিস্তার করে। এবং নিজেদর শক্তি ও সম্পদ বৃদ্ধি করে নেয়। তাতে রাজনৈতিক শিবিরগুলি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠিকই। কিন্তু জাতি ও দেশ তত বেশিই দুর্বল হয়ে পড়ে। চলমান কৃষক আন্দোলনের দীপ্তিতেও যদি আমাদের চেতনার রুদ্ধ দ্বার না খোলে, তবে সেটা হবে আত্মহত্যার সামিল। এই কৃষক আন্দোলন সফল হোক বা ব্যর্থই হোক। জাতির পক্ষে একটা স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে নিঃসন্দেহে। সেই ছাপ আমাদেরকে নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আমাদেরকে আত্মনির্ভর করে তুলতে পারলে, সেটাই হবে এই কৃষক আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভুমিকা।

 

সম্পাদকের কলমে

 


সম্পাদকের কলমে

 


করোনার সংকট কতটা স্বাস্থ্য জনিত আর কতটা জীবন জীবিকা সংক্রান্ত অর্থনৈতিক বিষয় সেই বিষয়ে মনযোগ দেওয়ার সময় এসে গিয়েছে বলেই মনে হয়। দেশে দেশে করোনার বিপুল সংক্রমণ ও মৃত্যু সত্যিই কি মহামারীর আকার নিয়েছে? নাকি সংক্রমিতের তুলনায় মৃতের সংখ্যা ঠিক ততটা ভয়াবহ নয়। যতটা আতঙ্কিক আমরা সকলেই। কিংবা যতটা আতঙ্কিত করা হচ্ছে আমাদের। সরকারী প্রশ্রয়ে মিডিয়ার মদতে। জানুয়ারীতে বিশ্বব্যাপী করনা ছড়িয়ে পড়ার সময় থেকে পুরো দশ মাস সময় অতিক্রান্ত। এই সম্পাদকীয় লেখার সময় আবিশ্ব করোনা সংক্রমিতের মোট সংখ্যা: ৪ কোটি ৯৬ লক্ষ ৮৫ হাজার ৩১১ জন। আর সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৩ কোটি ৫২ লক্ষ ৬৮ হাজার ৯৩৭ জন। আবিশ্ব মৃত্যু হয়েছে ১২লক্ষ ৪৯ হাজার ০৩০ জনের। না মৃতের সংখ্যাটি কম নয়। গড়ে প্রতি বছর সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জায় মারা যায় যেখানে ছয় থেকে আট কি নয় লক্ষ মানুষ। তবুও এখন অব্দি আবিশ্ব পরিসংখ্যান আনুসারে কারোনা সংক্রমিতের ভিতর সুস্থতার হার ৯৭% এবং মৃত্যুর হার ৩ শতাংশ। এইখানেই প্রশ্ন, করোনা কি সত্যই মহামারীর আকার নিয়েছে? না’কি মানুষের প্রয়াসে মহামারী আটকিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অন্তত এখন অব্দি। এই দশ মাসে। এবং আমাদের মনে রাখতে হবে করোনার কোন ওষুধ এখন অব্দি আবিষ্কৃতই হয় নি। এবং যে রোগের ওষুধই আবিষ্কার হয় নি, সেই রোগের মৃত্যুর হার বিগত দশ মাস ব্যাপী ৩% এর ভিতর আটকিয়ে রাখা রীতিমত সাফল্যের বিষয়। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা মৃত্যুর এই হার বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে নয়। মোট করোনা সংক্রমিতের অনুপাতে। যদি মোট জনসংখ্যার অনুপাতে হতো। তাহলে আমরা বলতে পারতাম লকডাউন একটা বড়ো সাফল্য। ৯৭% মানুষের জীবন রক্ষা করা গিয়েছে। কিন্তু ৩% মৃত্যুর হার যখন মোট সংক্রমিত রুগীর তুলনায়, তখন সেই হার কোনভাবেই লকডাউনের উপরে নির্ভরশীল নয়। বরং একদিকে প্রচলিত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি ও অন্যদিকে করোনার কম ভয়াবহতার উপরেই নির্ভরশীল। অর্থাৎ তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই। বিশ্বব্যাপী লকডাউন সফল। তবে বলতেই হবে সেই সাফল্য মোট সংক্রমিতের সংখ্যায় হতে পারে মাত্র। আবার যদি ধরে নেওয়া যায়। কোথাও যদি কোন লকডাউন করা নাই হতো। তাহলেও কিন্তু এই ৩% মৃত্যুর হারের কোন হেরফের হতো না। সেক্ষেত্রে অবশ্যই মোট সংক্রমিত রুগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। মোট আরোগ্যলাভ করা রুগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেত। বৃদ্ধি পেত মোট মৃতের সংখ্যাও। কিন্তু প্রতিটি পরিসংখ্যানের তুলনামূলক শতাংশের হার একই থাকতো।


আর মূল প্রশ্নটা কিন্তু এইখানেই। লকডাউন করে ও না করেও যদি সুস্থতার হার ও মৃত্যুর হার একই থাকে। এবং করোনার ওষুধ আবিষ্কার ছাড়াই। তবে এই লকডাউনের যৌক্তিকতা কতটুকু? এবং চিত্রের অন্যদিকে রয়েছে লকডাউন করে দিয়ে দেশে দেশে অর্থনৈতিক বিপর্য্যয় সৃষ্টি করে মানুষের জীবন জীবিকাকে ঘোর সংকটে ফেলে দেওয়ার বিষয়টি। বিষয়টি আর আশংকার ব্যাপার নয়। বিষয়টি এই সময়ের ঘোর বাস্তব সত্য। দেশে দেশেই সত্য। বিশেষ করে ভয়াবহ সত্য আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে। লকডাউনের প্রথম ছয় মাসে এই ভারতবর্ষেই নতুন করে পনেরো জন শিল্পপতি বিলিয়নীয়র হয়ে উঠেছেন। এবং আরও মজার কথা পূর্বের কোন বিলিয়নীয়রই লকডাউনের দশ মাসে সম্পত্তির মুল্যায়ণ কমে মিলিয়নীয়র হয়ে গিয়েছেন, এমন কোন তথ্য কারুর হাতে নাই। উল্টে বিলিয়নীয়রদের সম্পদের পরিমাণ এই সময়ে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে দেশে চাকুরীজীবিরা সংকটে। অধিকাংশেরই মাস মাহিনায় কোপ পড়েছে। শ্রমজীবি মানুষরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশে দেশে কলকারখান বন্ধ করে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকাকে বিপর্য্যয়ের কবলে ফেলে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। ব্যাবসা বাণিজ্যের উপরে করোনার প্রভাব পড়েছে ব্যাপক ভাবে। ছোট ও মাঝারি ব্যাবসায়ীদের অবস্থা মোদেই ভালো‌ নয়। অর্থনীতির চাকা অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। আকাশ ছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সংকটজনক করে তুলেছে। অথচ দেশে দেশে বিলিয়নীয়রদের মোট সম্পদের পরিমাণ ফুলে ফেঁপে উঠছে। অর্থনীতির কোন জাদুতে এটা সম্ভব হচ্ছে। সেটি সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে। কিন্তু ঘটনা যে ঠিক এই রকমই সেটি তো নিশ্চিত সত্য। তখনই কি মনে হয় না, লকডাউনের আসল সাফল্য এইখানেই?


লকডাউনের ফলে যে অর্থনৈতিক বিপর্য্যয় নেমে এসেছে। সেই বিপর্য্যয় কোন ভাবেই মিলিয়নীয়র বিলিয়নীয়রদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি। পারলে করোনায় মানুষের মৃত্যুর হার বেশি হলেও দেশে দেশে লকডাউন হতো না যে, সেকথা বলে দেওয়া যায় চোখবুঁজেই। করোনার আতংক ছড়িয়ে দিয়ে এই যে লকডাউন করে অর্থনীতির চাকাকে বিশেষ ভাবে নিয়ন্ত্রণের খেলা। এই খেলাটি বিশ্বে এই প্রথম। এর কোন পূর্ব ইতিহাস নাই। আর নাই বলেই সাধারণ জনগণের চোখে ধুলো দেওয়া অনেক সহজ হচ্ছে। জনসাধারণকে মিডিয়া যেভাবে চালিত করছে, সেই ভাবেই চলছে জনগণ। অনেকেই মনে করতে পারেন। লকডাউন না করলে আরও বেশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তো্ মৃত্যু হতো আরও বেশি মানুষের। নিশ্চয় তাই। কিন্তু কতজন বেশি সংক্রমিত হতো আর আরও কতজনের মৃত্যু হতো? আমরা পূর্বেই দেখে নিয়েছি। সংক্রমণের হার যাই হোক না কেন। সংক্রমিত রুগীর ভিতর সুস্থতার হার ও মৃত্যুর হার কিন্তু একই থাকতো। আর সেই একই সময়ে আসুন দেখে নিই। ভারতে লকডাউন উঠে যাওয়ার পরের অবস্থা। দোকান বাজারে পুজোর কেনাকাটায়। পরিবহনে সর্বত্রই ভিড়ে ঠাসাঠাসির ছবি। পুজোর কেনাকাটার প্রথম দিকেই কলকাতার একটি বিখ্যাত জুতোর বিপণীর ঠাসাঠাসি ভিড়ের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে অনেককেই আতঙ্কগ্রস্ত করে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল এই এক দোকানের ভিড়েই বুঝি কলকাতায় মড়ক লেগে পথে ঘাটে মানুষ মরে পড়ে থাকবে। কিন্তু তারপরেও এক মাসব্যাপী হাতিবাগান নিউমার্কেট গড়িয়াহাটের ঠাসাঠাসি ভিড়ের ভিতর দিয়েই মানুষ পুজোর কেনাকাটা করেছে। অনেকের অনেক রকম প্রেডিকশন ভুল প্রমাণিত করেই কলকাতায় এখনও মড়ক লাগেনি। হাসপাতাল উপচিয়ে মৃতদেহ গড়াগড়ি খায়নি রাজপথ থেকে কানাগলিতে। বাজার দোকান সর্বত্র থিক থিক ভিড়েও করোনা সংক্রমণের হার সুস্থতার হার ও মৃত্যুর হারও কলকাতায় বিশেষ বাড়ে কমেনি। লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখে, মানুষের ভোগান্তিকে চরম পর্যায় নিয়ে গিয়ে তিন চার বাসের যাত্রীকে এক বাসে ঠুসে দিয়েও এই হারেও কোন পরিবর্তন আনা যায় নি। বরং ভারতীয় রেল পরিসেবাকে ধাপে ধাপে বেসরকারী শিল্পের হাতে নাম মাত্র মূল্যে বিক্রী করে দেওয়ার পরিকল্পনার দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলছে সরকার তলায় তলায়। করোনার আতঙ্ককে ঢাল করেই।


একটু ভেবে দেখলেই আমরা দেখতে পেতাম লকডাউন না করে গণপরিবহণের সামর্থ্যকে বাড়িয়ে দিয়ে অর্থাৎ আরও বেশি সংখ্যায় ট্রেন চালিয়ে। সরকারী বেসরকারী বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে তুলনামূলক কম ভিড় বজায় রেখে জনজীবন সচল করে রেখেও করোনা মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল। মানুষ ঠিক মত মাস্ক ব্যবহার করে বাড়ি ফিরে সাবান দিয়ে সব কিছু ধুয়ে নিয়ে এবং যতটা সম্ভব পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রেখেই সংক্রমণের হার এই একই জায়গায় ধরে রাখতে পারতো। সরকার যদি সঠিক পদক্ষেপ গুলি নিতে চাইতো। কল কারখানা বন্ধ না করেও সংক্রমণ ঠেকানোর উপায় নিশ্চয় ছিল। ছিল না কোন সদিচ্ছা। ফলে শিল্প বাণিজ্য সাধ্যমতো চালু রেখে, প্রতিদিনের অবস্থা ও উদ্ভুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সংক্রমণের হারের উপর নির্ভর করে এক এক অঞ্চলে এক এক রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেও সংক্রমণ মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল। দরকার ছিল না গোটা দেশের পরিবহণ ব্যবস্থাকে স্তব্ধ করে দিয়ে সর্বত্র একই ভাবে লকডাউন করে দেওয়ার। সংক্রমণের হারের তারতম্যের উপরে নির্ভর করে এক এক অঞ্চল এক এক সময়ে সাময়িক লকডাউনের আওতায় নিয়ে আসা যেতে পারতো নিশ্চয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে।


কিন্তু সরকার আতশত হিসাব নিকাশে যায় নি। সরকার ঠিক সেটিই করেছে যেটির সাফল্যে আরও নতুন করে ১৫জন ভারতীয় বিলিয়নীয়র হয়ে উঠতে পেরেছেন। এবং বাকি বিলিয়নীয়রদের সম্পত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে জেট গতিতে। সরকার ঠিক সেটিই করেছেন, যেটি করলে সরকারী সম্পত্তি নাম মাত্র মূল্যে কোটিপতিদের হাতে বিক্রী করে দেওয়া যায়। সরকার কিন্তু এই লকডাউনে হাত গুটিয়ে বসেছিল না। করোনার জুজু দেখিয়ে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখে সরকার তলায় তলায় দেশের সম্পত্তির বিক্রীবাটার ব্যবস্থাই করে চলেছে। আরও একটি কাজে সরকার হাত লাগিয়েছে। সেটি হলো বিদেশী ভ্যাকসিন কোম্পানীগুলির স্বার্থরক্ষায় সব রকম সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। লকডাউন করে মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলাই যার প্রাথমিক ধাপ। মানুষকে বোঝানো ভ্যাকসিন নেওয়াই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখা ও নাগরিক পরিসেবা পাওয়ার প্রধান শর্ত। আমাদের দেশকে সেই অভিমুখেই এগিয়ে নিয়ে চলেছে সরকার। অত্যন্ত বলিষ্ঠ হাতে। সেই পরিকল্পনা সম্বন্ধে অনেকেই আজও ওয়াকিবহাল নয়। সামনের বছরগুলিতে নতুন নতুন সরকারী আইন প্রণয়নের মধ্যে দিয়েই বিষয়গুলি স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকবে দিনে দিনে। না, এই অবস্থা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের অধিকাংশ অনুন্নত দেশেরই চিত্র একই রকম। এমনকি উন্নত বিশ্বের ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতেও আজ সাধারণ মানুষ এই রকম ভাবেই বিপন্ন। বিষয়টি তাই আর আঞ্চলিক নয়। বিশ্বব্যাপী এক মহাসংকট।


ফলে করোনায় মৃত্যুর হার দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নাই আসলেই। কিন্তু করোনার সুযোগে এই যে এক নিউ নরম্যাল স্লোগান ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যার বলে যখন যেমন খুশি নাগরিকের অধিকার খর্ব করা যেতে পারে। জনসাধারণকে আরও বেশি করে দারিদ্র্যের আবর্তে আটকিয়ে ফেলে বিলিয়নীয়রদেরকে ট্রিলিয়নীয়র করে তোলার এক অশুভ আঁতাত গড়ে উঠেছে শাসক ও পুঁজির নিয়ন্ত্রকদের যোগসাজগে। আতঙ্করে বিষয় এইটিই। করোনার ভয়াবহতার তুলনায় তাই লকডাউনের ভয়াবহতা চতুর্গুণ বেশি। বুঝতে হবে আমাদের সেটাই। ৩% মানুষের মৃত্যুর হারে সাধারণ জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রেখে ৯৭% এর সম্পত্তি হাতিয়ে তাদেরকে দারিদ্যসীমানায় ঠেলে দেওয়ার পদ্ধতিই এই লকডাউন। করোনাকে অজুহাত বানিয়েই সভ্যতাকে আজ এই ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন করে তুলেছে বিশ্বপুঁজির নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী। এইখানেই সভ্যতার সংকট।


৭ই অক্টোবর’ ২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক রক্ষিত

সম্পাদকের কলমে


সম্পাদকের কলমে

সংকটকালের নতুন একটা সমার্থক শব্দের খোঁজ পেলাম তবে আমরা। করোনাকাল। সেই করনোকালে, মানুষের জীবন ও মৃত্যুর ভিতর ব্যবধান কমতে কমতে শুধু একটা হাঁচি কি একটা কাশিতে এসে দাঁড়িয়েছে। কিংবা হয়তো একটুকু ছোঁয়াই জীবন মৃত্যুর ভিতর ব্যবধান দূর করতে যথেষ্ঠ। না আমরা আর ছোঁয়াছুঁয়ির ভিতরে নাই। তাই চোখের সমানে একজন রুগীর এম্বুলেন্সে ওঠার প্রাণান্তকর চেষ্টা বার বার ব্যার্থ হতে দেখেও, মোবাইলে সেই দৃশ্য তুলতে থাকলেও। মানুষের ভিড় থেকে একজন মানুষকেও খুঁজে পাওয়া গেল না, রুগীকে এম্বুলেন্সে তুলে দেওয়ার। সকলের চোখের সামনে মনুষ্যত্বের ছোঁয়াটুকু পেল না বলে পথের ধুলোতেই গড়িয়ে গেল একটা অমূল্য জীবন। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কাজ যে প্রতিষ্ঠানের। সেই হাসপাতালের দোরগোড়াতেই। মানুষের সমাজ আজ মনুষ্যত্বের ছোঁয়াটুকু বঞ্চিত। না, এই অবস্থা একদিনে হয় নি। এই অবস্থার জন্য শুধুমাত্র করোনাই দায়ী নয়। দায়ী সমাজিক অবক্ষয়। রাজনৈতিক দূর্নীতির সীমাহীন দুর্বৃত্তায়ন। মানুষ থেকে মানুষের দূরত্ব যত বেশি বৃদ্ধি পেতে থাকবে, ততই মানুষকে এমন ভাবেই পথের ধুলায় জীবন দিতে হবে গড়িয়ে। অথচ মানুষের কথাই ছিল মানুষেরই সাথে থাকার। এই চিত্র কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটা সামগ্রিক গ্যাংরিনের খণ্ডচিত্র মাত্র। মানুষের সাথে আর থাকে না মানুষ।

সম্পাদকের কলমে



সম্পাদকের কলমে

পঁচিশে বৈশাখ আর আমরা বাঙালি, অনেকেই মনে করেন এক অবিচ্ছেদ্দ সম্পর্ক। শরৎ আসলেই যেমন শিউলি ফুটবে তেমনই বৈশাখ মানেই যেন রবীন্দ্রনাথ। অনায়াসলব্ধ এক উত্তরাধিকার। আমরা নিশ্চিত যতদূর বাঙালি ততদূর রবিঠাকুর। যতদিন জীবন ততদিন রবীন্দ্রনাথ। এমনটা ভাবতেই অভ্যস্ত আমরা অনেকেই। বিশেষত বাঙালির সাংস্কৃতির কর্মকাণ্ডের পরতে পরতে রবীন্দ্রনাথ। সেই রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতেও আমাদের ভরসা রবীন্দ্রনাথই। তাঁকে অস্বীকার করে তাঁকে অতিক্রম করা সম্ভব নয়। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর এমনই অমোঘ প্রভাব। আর এই প্রভাব নিয়ে আমরাও নিশ্চিত আমরা আজও কবিকে নিয়েই রয়েছি। আমাদের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিতরেই আমাদের এই নিশ্চয়তার ছাপ রয়ে যায়। ফলে বৈশাখ আসলেই আমরা আরও বেশি করে উজ্জীবিত হয়ে উঠি রবীন্দ্রচর্চায়। দিকে দিকে পত্রপত্রিকায় বিশেষ রবীন্দ্রসংখ্যা প্রকাশের ধুম। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রজয়ন্তীর উদযাপন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার ইত্যাদি ইত্যাদি।

সম্পাদকের কলমে :


সম্পাদকের কলমে


যাই যাই শীতের আমেজে জমে উঠেছে ৪৩তম আন্তর্জাতিক কলিকাতা পুস্তকমেলা। মরশুমটা উৎসবের। সেই উৎসবের আরও একটি পার্বণ এই বইমেলা। এবং গ্রন্থ প্রকাশ। যদিও গ্রন্থ প্রকাশের বেশির ভাগটাই দখলে নিয়ে রেখেছে স্বনির্বাচিত কবিতার বই। প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে প্রচুর কবিতার বই। কবিতা সংকলনের এই সুনামিতে সকলেরই হাসি হাসি মুখের ছবি সোশ্যাল নেটওয়ার্কের নানান সাইট জুড়ে। আনন্দ আর তৃপ্তির পরিবেশে জমে উঠেছে উৎসব। সেই উৎসবের মধ্যেই প্রকাশিত হচ্ছে রংরুট দ্বিতীয় বর্ষের চতুর্থ তথা অন্তিম সংখ্যা মাঘ ১৪২৫। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথেই জানাতে বাধ্য হচ্ছি এই সংখ্যায় আমরা লেখকদের উৎসাহ আগ্রহ থেকে সম্পূ্র্ণ বঞ্চিত হয়েছি। হয়তো সকলেই এইসময় বইমেলা নিয়ে অতীব ব্যস্ত বলেই সময় মতো লেখা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন নি। অনেকেরই এই সময় বই প্রকাশের ব্যস্ততা রয়েছে। অনেকেই বইমেলা নিয়েও ব্যস্ত। ফলত সময় মতো লেখা না পাওয়ায় রংরুটের বর্তমান সংখ্যাটি ক্ষীণ কলেবরেই প্রকাশিত করতে বাধ্য হলাম আমরা।

সম্পাদকের কলমে ~


সম্পাদকের কলমে


জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। জনগণ যখন সচেতন ভাবে রংরুট ধরেই এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয় তখন এই পরিণতিই যে অবধারিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী নেতা নেত্রীর ভাষণে বিশ্বাস করতেই ভালোবাস। এবং যে দেশে শিক্ষার হার যত কম, সে দেশে জনগণকে মিথ্যায় বিশ্বাস করানো তত বেশি সহজ। বলাই বাহুল্য। আর চতুর এবং বুদ্ধিমান’রা তখন সেই সুযোগেই শিবির বদলের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। বেমালুম নির্লজ্জের মতোনই। সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার এও আর এক সহজ উপায়। তাই বাঘ ও কুমির দুই পক্ষই সেই সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী চতুর ও বুদ্ধিমানদেরকে আদর আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বৃহত্তর জনসাধারণ তাই দেখেই নিশ্চিন্তে হয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই লাইনে বুথ জ্যামই হোক আর ছাপ্পার কারবারই জমে উঠুক। জনগণ নিশ্চিন্ত থাকে অচ্ছে দিন আর পরিবর্তন এলো বলে। তাই যেখানেই ভোট দেওয়ার সুযোগ সেখানেই অচ্ছে দিন আর পরিবর্তনের স্লোগানে দাও ভোট। তার পরিণতি যা হবার তা তো হবেই। সে নিয়ে আর শোক করে কি হবে?

সম্পাদকের কলমে ~


সম্পাদকের কলমে


“It is a terrible calamity when human beings come near to one another and yet do not recognize the deeper bond of human relationship; when a strong people exploits the weaker and when some baser passion of men awaken at the meeting of races, obscuring the truth that unites them. This is a shame and should not be allowed to continue. I have felt deeply the pain of this unnatural situation.” (Talks In China: The English Writings of Rabindranath Tagore: Edited By Sisir Kumar Das. P-648)

সম্পাদকের কলমে ~ গণতন্ত্রের রংরুট


গণতন্ত্রের রংরুট!


সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ বেশ কয়েকটি সত্যকে খুব দৃঢ় ভাবেই প্রতিষ্ঠিত করে গেল। যদিও কয়েকটি মামলা এখনো সুপ্রীম কোর্টে ঝুলে রয়েছে। সেগুলির শেষ রায় না জানা অব্দি শেষ কথা বলাও যায় না। তবে ধরে নেওয়া যাক এবারের এই নির্বাচনী ফলাফল যদি সত্যই সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েই যায়, তাহলে বেশ কয়েকটি সত্য কিন্তু দিনের আলোর মতোই সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমতঃ, বিরোধী রাজনৈতিক প্রার্থীদেরকে মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে না দেওয়ার মতো অসাংবিধানিক কাজও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সাংবিধানিক বৈধতা লাভ করতে পারে, যদি শাসকদল সরকার ও নির্বাচন কমিশন সম্মত হয়। দ্বিতীয়তঃ কোন নির্বাচনের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে শাসকদলের দুষ্কৃতিদের বোমা বন্দুক গুলির কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিরোধী প্রার্থীদের নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারার বিষয়টিও সাংবিধানিক পরিসরে অসম্ভব কিছুই নয়। তৃতীয়তঃ এক তৃতীয়াংশের বেশি আসনের ফলাফল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্থির হয়ে যাওয়াও সাংবিধানিক ভাবে বৈধ হতে পারে। চতুর্থতঃ মাত্র দুই তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হলেও সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা অক্ষুণণ্ণই থাকে।

সম্পাদকের কলমে


বাংলা বাঙালি ও বইমেলা


ফেব্রুয়ারী ভাষার মাস। ফেব্রুয়ারী মেলার মাস। ফেব্রুয়ারী বইয়ের মাস। এইমুহূর্ত্তেই কাঁটাতারের উভয় পারেরই চলছে বিশ্ব বিখ্যাত দুইটি বই মেলা। কলিকাতা পুস্তকমেলা ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা। আমরা বাঙালিরা বই পাগল হই আর না হই মেলা পাগল জাতি। তাই যেখানেই মেলা, সেখানেই আমরা। বই পড়ি আর নাই পড়ি, বই কিনি কিংবা নাই কিনি বইমেলায় আমরা হাজির। বই মেলাকে বন্ধুমেলায় উত্তীর্ণ করে দিয়ে গল্প আর হুল্লোর ছবি আর সেল্ফীর মৌতাতে পরিপূর্ণ করে ঘরে ফেরা। না অনেকেই প্রতিবাদ করে উঠবেন জানি। বইমেলায় তবে এত এত কোটি টাকার বই বিক্রী হয় কি করে? অবশ্যই বিক্রী হয়। শুধু বইমেলা কেন, সারা বছরভর সারা বাংলায় বই বিক্রীও নিশ্চয়ই হয়। কিন্তু একটু পরিসংখ্যান নিতে পারলে হয়ত দেখা যাবে চিত্রটি ততটা আশাপ্রদ নয়, যতটা ওপর থেকে মনে হয়। দুই বাংলা মিলিয়ে মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ শিক্ষিত, আর সেই শিক্ষিত জনসাধারণের কত শতাংশ বই কিনতে অভ্যস্ত। একটু সঠিক ভাবে এই হিসাবটি নিতে পারলেই আমরা প্রকৃত চিত্রটি বুঝতে পারতাম।  এবং মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ সিলেবাসের পাঠ্যবইয়ের বাইরে  নিয়মিত বই কেনে সেই হিসাবটি যদি উন্নত বিশ্বের যে কোন দেশের হিসাবের সাথে তুলনা করে দেখা যেত তবে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, আমাদের অনেকেরই চোখ কপালে উঠে যেত। আর তখনই বোঝা যেত উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই কেন বইমেলার কোন রেওয়াজ নাই। সেখানে সারা বছর ধরে প্রকাশকরা যে পরিমাণে বই বিক্রী করতে পারেন, তাতে আর আলাদা করে বইমেলায় গিয়ে ক্রেতা ধরার আয়োজন করতে হয় না। এইখানেই আমাদের বাংলায় কাঁটাতারের উভয় পারেই বইমেলার গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা। মূলত বইমেলাকে কেন্দ্র করেই বাংলার প্রকাশকরা তাঁদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের লাভের করির হিসাবটা জারি রাখতে পারেন। নয়ত কবেই অন্য ব্যবসায়ে অর্থ লগ্নী করতে হতো।

সম্পাদকের কলমে ~শতবার্ষিকীর অক্টোবর বিপ্লব ও প্রাসঙ্গিকতা


একটি কথা মানতেই হবে, সকল মানুষের জন্যে সমান অধিকার ও সম সুযোগ, এই ধারণাটি মানুষের প্রত্যয়ে গেঁথে দিতে পেরেছিল মহান অক্টোবর বিপ্লবেরই সুদূরপ্রসারী অভিঘাত। বিশ্বের যে কোন প্রান্তেই হোক, আজকের মানুষ এই কথাটি বিশ্বাস করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই। সেই অধিকার ও সুযোগ কে কি ভাবে বাস্তবায়িত করবে, বা আদৌ করতে সক্ষম হবে কিনা, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু এই ধারণাটির নৈতিকতা নিয়ে আজ আর কেউই কোনভাবেই সন্দিহান নয়। বিগত একশ বছরে এইখানেই অক্টোবর বিপ্লবের প্রাণভোমরা সক্রিয় হয়ে থেকেছে। তাই এই বিপ্লবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে যাঁরা আজ প্রশ্ন তুলতে চান, বুঝতে হবে জীবনবাস্তবতার সাথে তাদের নাড়ীর যোগ বিলুপ্ত। আবিশ্ব ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির জৌলুসে বিমুগ্ধ হয়ে আজকের দিনে যারা অক্টোবর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতাকেই নস্যাৎ করে দিতে চান, বুঝতে হবে তাদেরও চোখ বন্ধ। বন্ধ বিশ্বায়নের ঠুলিতেই। বিশ্বায়নের এই ঠুলির বিরুদ্ধেই সরব হওয়ার সময় এসেছে আজ।~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

সম্পাদকের কলমে - কন্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে বাঁশি সঙ্গীতহারা

এই রংরুটই আমাদের কাছে সহজ রুট হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার সাত দশকে। সমাজবাস্তবতা ও আইন;  মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার যে পারেই যে থাকি না কেন। তাই অমরা জেনে গিয়েছি অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই পস্তাতে হবে। চোরকে ধরতে গেলেই আইন আমাকে ছিবড়ে করে দেবে। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ালেই নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় নিজেরই দস্তখত পড়ে যাবে। আর প্রতিরোধ করতে গেলেই রাজনীতি আপনাকে হাইজ্যাক করে নেবে। স্বাধীনতার সাত দশকে এটাই ভারতীয় উপমহাদেশের অর্জন। আজকে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা রামমন্দির না বাবরি মসজিদ। গোরক্ষকক না গোভক্ষক। আজকে বাংলাদেশের সমস্যা ইসলামী সংস্কৃতি না বাঙালি সংস্কৃতি। আজকে পাকিস্তানের সমস্যা মৌলিক অধিকার না মৌলবাদ। একদিকে বাইশে শ্রাবণের স্মরণ সভা আর আরেক দিকে স্বাধীনতার সাত দশকের উদযাপনের মাঝখানে তাই আজও সেই দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ যেন ঝুলতে থাকেন নিরালম্ব হয়ে।~~~~~~~~~~~~~~~

রংরুট * সম্পাদকীয়

সমাজ সংস্কৃতি সমকাল। আমাদের অস্তিত্বের তিনটি স্তম্ভ স্বরূপ। আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যক্তি আমির স্বরূপ গড়ে ওঠে কিন্তু এই তিনটি বিষয়ের ঘাত প্রতিঘাতের সংমিশ্রনেই। সেই ব্যক্তি আমির স্বরূপ সমষ্টির দিগন্তে নিজেকে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলবে হয়তো সেইটাই আমাদের প্রত্যেকের নিজের নিজের পথ। আবার সেই পথের কতটুকু রংরুট আর কতটুকু নয়, সে বিচার কালান্তরের হলেও সমকাল কিভাবে সেই ব্যক্তি আমির দর্পনে দৃশ্যমান সেটিও বড়ো কথা। তাই আমাদের সমাজ সংস্কৃতি সমকাল কি ভাবে আমাদের গড়ে তুলছে, বা একটু উল্টো দিক দিয়ে বললে, কিভাবে আমরা আমাদের সমাজ সংস্কৃতি সমকালকেও রূপ দিচ্ছি, আর সেই দেওয়ার পথ রংরুট না মনুষ্যত্বের দিগন্ত প্রসারী রাজপথ সেই দিকেই আলোকপাত করার উদ্দেশ্য লক্ষ্য ও বাসনা নিয়ে হাজির ভিন্ন স্বাদের ত্রৈমাসিক ‘রংরুট’। সমাজ সংস্কৃতি সমকালের বলিষ্ঠ দর্পন।~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~