য়ুক্তিতর্ক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
য়ুক্তিতর্ক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

জয়তী রায় ~ রাজনীতি এবং দ্রৌপদী


রাজনীতি এবং দ্রৌপদী

 

এক:

পাঁচহাজার বছর ধরে জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা মহাভারত রোজ নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে। নতুন নতুন ব্যাখ্যা আসছে। তবুও দেখা যাচ্ছে, পাঠকের কৌতূহল বা আগ্রহ ক্রমশঃ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েই চলেছে।

মহাভারতের দুটি মহল। একটি অন্তরমহল। অপরটি বহির্মহল।

পারিবারিক কলহ থেকে উদ্ভুত মহাযুদ্ধ হল বহির্মহল। অন্তমহলে আছে গীতা আর দর্শন। রামায়ণ ভক্তিযোগের কথা বলে। মহাভারত ভক্তির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে নিষ্কাম কর্মযোগ। কর্ম করো কিন্তু ফলের আশা করোনা - গীতার সমস্ত উপদেশ আধুনিক মনস্তত্ত্বের বিচারে মানুষের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল সাধন করতে সক্ষম।

*********

মহাভারত নিয়ে যখন কাজ করতে বসি, মনের ভিতর হতে উৎসারিত হয় আনন্দ। যদি বলো কেন? উত্তরে বলি, ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ পৌরাণিক গ্রন্থ মহাভারত, যা অধ্যয়ন করে আমরা তৎকালীন সমাজ ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি, সেগুলি যেন অজানা কিছু নয়। আজকের যুগে বসেও নিজের সময়ের প্রেক্ষিতে মহাভারতের যুগ চিনে নেওয়া - এটাই আনন্দ দিতে থাকে। বিশেষকরে চরিত্রগুলো। চরিত্রের ভিতর ঢুকলে দেখা যায়, সুখে, দুঃখে , ভালোবাসায়, হিংস্রতায়, চাওয়া পাওয়া সবকিছুতেই তাঁরা আমাদের কাছের মানুষ। এ গেল ভিতর মনের কথা। কেমন ছিল বাইরের জগৎ? ভূমি দখল, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, প্রেম , কামনা, আধুনিক যৌনতা, সন্তান জন্মে অপারগ হলে, বিকল্প ব্যবস্থা, দেবতা এখানে মানুষের প্রতিবেশীর মত। ঋষিমুনির হোমযজ্ঞ, আর্য অনার্য ভেদাভেদ। প্রশস্ত রাজপথ ধরে ছুটে চলেছে রাজকীয় রথ। শকট। নর্তকীর নুপূর কিঙ্কন বেজে উঠছে অভিজাত মহলে।

রাজশেখর বসুর মহাভারত সারানুবাদ পড়লে জানা যায়, যে, এই সময় প্রায় সকলেই মাংস আহার করতেন। গোমাংস ভোজন চলত। মহাভারতের যুবতী বিবাহ প্রচলিত ছিল। রাজাদের পত্নী, উপপত্নী,দাসী থাকত। অশ্বমেধ যজ্ঞে বীভৎস বলি হত। উৎসবে শোভাবৃদ্ধির জন্য বেশ্যার দল নিযুক্ত হত।

সুখের কথা, অতি প্রাচীন ইতিহাস ও রূপকথা সংযোগে উৎপন্ন এই পরিবেশে আমরা যে নরনারীর সাক্ষাৎ পাই তাদের দোষ গুণ সুখদুঃখ আমাদেরই সমান।

মহাভারত একটি রত্ন -সাগর। এতে রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি প্রভৃতি সমস্তনীতি আছে। মহাভারতের একটি উল্লেখ্য দিক হল এর রাজনৈতিক কার্যাবলী। অদ্ভুত ব্যাপার, তখনকার রাজনীতির সঙ্গেও এখনকার ভাবধারার প্রচুর মিল খুঁজে পাই। পরিষ্কার স্পষ্ট স্বচ্ছ ভাবে তৎকালীন রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা ধরা দেয় আমাদের কাছে। বিশেষকরে, নারীদের মধ্যেকার আধুনিক চেতনা, জীবন ও রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার মতামত দেখলে অবাক হতে হয়। আলোচ্য প্রবন্ধে দেখব সেই সময়ের রাজ্য রাজনীতিতে দ্রৌপদীর ভূমিকা ঠিক কিরকম ছিল!

*****************

 

: আগুন হতে জন্ম/ নিজেই যেন আগুন:

 

সর্বকালের সবচেয়ে আলোচ্য নারী চরিত্র যদি কেউ থেকে থাকে, সে হল দ্রৌপদী।

হেলেন , ক্লিওপেট্রাকে স্মরণে রেখেই এমন মন্তব্য করছি। রূপ গুণ বিদ্যা বুদ্ধি নিয়ে মহাকাব্যের বহু নায়িকা স্মরণীয় কিন্তু সমগ্র পুরুষ জাতিকে অবহেলায় পায়ের কাছে ফেলে রাখার ক্ষমতা একমাত্র ছিল , দ্রৌপদীর।

জন্ম কাহিনীই এত অদ্ভুত, যাঁর ব্যাখ্যা করা মুশকিল। সীতাদেবীকে পাওয়া গিয়েছিল কৃষিক্ষেত্রে, যে ঘটনার উপযুক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু, যজ্ঞআগুন হতে উদ্ভুত পূর্ণ বয়স্কা নারী ... এই ছবি মনে করলে , ভেসে আসে আগুনের মত তেজীয়ান কৃষ্ণবর্ণের মেয়ের অপরূপ রূপ।

যজ্ঞসেনস্য দুহিতা দ্রুপদস্য মহাত্মনঃ।

বেদিমধ্যাৎ সমুৎপন্না পদ্মপত্রনিভেক্ষণা।।

দর্শনীয়াহনবদ্যাঙ্গী সুকুমারী মনস্বিনী।

ধৃষ্টদ্যুম্নস্য ভগিনী দ্রোণশত্রোঃ প্রত্যাপিনঃ।।

( আদি: ১৭৭: )

 

মহাত্মা দ্রুপদ রাজার কন্যা পদ্মনয়না দ্রৌপদী যজ্ঞবেদী থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন। তাঁর কোনও অঙ্গই নিন্দনীয় নয়। অতি সুদৃশ্য এবং সুকোমল। দ্রোণশত্রু ধৃষ্টদ্যুম্নের ভগিনী। যাঁর নীলোৎপল তুল্য দেহের গন্ধ একক্রোশ দূর থেকেও বইতে থাকে।

এহেন রূপসী কন্যার জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে কাহিনী একটা ব্যাসদেব দিয়েছেন বটে, এবং সে কাহিনীর মধ্যে অবধারিত মিশে আছে রাজনীতি। দ্রোণাচার্যর সঙ্গে দ্রুপদের বিবাদ এবং দ্রোণ হত্যা নিমিত্ত যজ্ঞের বেদী থেকে দ্রৌপদীর উৎপত্তি। যজ্ঞের বেদী বলতে আগুন তো বটেই। ব্যাসদেব বলেছেন : বেদীমধ্যাৎ সমুথিতা।

এমন একজন নারী, ভবিষ্যতে যাঁর ক্রোধের আগুনে আহুতি হবে গোটা ভারতবর্ষ। যাঁর মান রাখতেই ঝাঁপিয়ে পড়বে পাঁচ ভাই। যাঁকে ঘিরে আবর্তিত হবে গোটা মহাভারত। হাজার হাজার বছর ধরে যাঁর রূপ গুণের বর্ণনা করে শ্রান্ত হবে না মানব। হাজার বছর পরেও যাঁর আকর্ষণ এতটুকু কম হবে না কোনোদিন। পাঁচ পাঁচটি স্বামী, অগুন্তি পুরুষের কামনার আগুন যাঁকে ঘিরে আবর্তিত অথচ তিনি পঞ্চ সতীর এক সতী!

মনে রাখতে হবে, মহাভারতে গল্পের মধ্যে গল্প থাকে। ক্যামোফ্লেজ। উপরের আবরণ সরিয়ে ভিতরের অর্থের গভীরে প্রবেশ করতে হয়। তবে সম্পূর্ণ সৌন্দর্য প্রতিবিম্বিত হবে। দ্রৌপদীর জন্ম যদি সাধারণ হত, তাঁর একটা ছেলেবেলা থাকত ধাপে ধাপে বড় হওয়া দেখান হত, তবে চরিত্রটির প্রতি আকর্ষণ প্রথম থেকেই সৃষ্ট হত না। দ্রৌপদীর আগে এসেছেন সত্যবতী, কুন্তী , গান্ধারী। প্রত্যেকেই ব্যতিক্রমী চরিত্র। কিন্তু , আপোষকামী। কুন্তী অবশ্যই লড়াকু চরিত্র। তবু, কোথায় যেন লকলক আগুন অনুপস্থিত। দ্রৌপদী প্রথম থেকেই দীপ্ত। প্রখর। তীব্র কণ্ঠে ঘোষনা করেন, যে পুরুষ তাঁর চুলে হাত দিয়েছে, তাঁর রক্ত ছাড়া আর চুল কোনোদিন বাঁধবেন না। কীচক থেকে শুরু করে যে যেখানে দ্রৌপদীকে অপমান করেছে, সেখানে আগুন জ্বলেছে। তবু, পুরুষ কামনা করেছে তাঁকে।

:যাজ্ঞসেন্যা পরামৃদ্ধিয়ং দৃষ্টা প্রজলিতামিবঙ:

দ্রৌপদী যেন জ্বলছে। চলনে বলনে ব্যক্তিত্বে সে যেন এক অধরা নারী। রহস্যময়ী। যা পুরুষের বুকে জ্বালা ধরায়। দ্রৌপদীকে ঘিরে ভারতের রাজাদের লোভ হিংসা কামুকতা__আবর্তিত হয়েছে।

দ্রৌপদী অর্থ আগুন। সেটাই মহাকবি বলতে চেয়েছেন। প্রধানা নায়িকার প্রবেশ হোক এমনভাবে , যাতে প্রথম আবির্ভাব থেকেই তাঁকে ঘিরে সৃষ্টি হবে চরম কৌতূহল ও আকর্ষণ। অগ্নির পাবক শক্তি সৃষ্টি আর ধ্বংসের প্রতীক। দ্রৌপদী ঠিক তাই। কাজেই , আমার বিচারে, দ্রৌপদীর জন্ম অলৌকিক নয়। প্রতীকী।

 

ভারত রাজ নীতি/ কৃষ্ণ ও দ্রৌপদী

____&______________

 

মনে করা হয়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কাল খ্রী পূর্ব ৩০০০ অব্দের কাছাকাছি এবং তার কিছুকাল পরে মহাভারত রচিত হয়। সেইসময় ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ভারত। দলাদলি , রাজনৈতিক ডামাডোল , অরাজকতা , শোষণ ইত্যাদি চলছে।

তখন ধীরে ধীরে উত্থান হচ্ছে যাদবকুলপতি শ্রী কৃষ্ণের।।

কৃষ্ণ ছিলেন প্রাজ্ঞপুরুষ। দূরদর্শী। চতুর।

Extremely clever firmly determined, an expert judge of time and circumstances. স্বপ্ন দেখছেন ভারতবর্ষ হোক এক অখণ্ড ধর্মরাজ্য। এ লক্ষ্যে প্রধান বাধা ছিলেন মগধরাজ জরাসন্ধ এবং তাঁর অনুগামীর দল। যেমন , কংস, শিশুপাল প্রমুখ। দুর্যোধন সমর্থন করতেন জরাসন্ধকে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুরোটাই দখলে ছিল পূর্ব মধ্য ভারতীয়দের দখলে। বিশাল ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের রাজন্যবৃন্দ পারস্পরিক দ্বন্দ্বে মত্ত থেকে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়াসকে করেছিল সুদূর পরাহত। সর্বোত্তম সর্বভারতীয় এক রাষ্ট্র গঠনের মনোভাব বা দূরদর্শিতা তাদের ছিল না। মহাভারতের সময় বিশাল ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক ঐক্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভারতে একটি দৃঢ়রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি নিজের দিকে নিয়ে আসতে প্রথমেই নিধন করলেন মাতুল কংসকে। এবং , নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন ভারতের সর্বোত্তম নেতা হিসেবে।

শ্রীকৃষ্ণের স্বপ্ন ছিল ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার। যা হবে অখণ্ড। এক পতাকার ছত্র ছায়া তলে একত্রিত হবে সমগ্র ভারত। সেই রাষ্ট্রের কর্ণধার ঠিক করতে তিনি চললেন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায়। কারণ, তাঁর অনুমান ছিল নির্ভুল। জানতেন ওই সভায় পঞ্চপান্ডব যেভাবেই হোক আসবে। তাঁরা তখন অজ্ঞাতবাস পালন করছে। কৃষ্ণ খুঁজে পাননি তাঁদের। আশা ছিল এখানে তাঁরা আসবেই। এবং , কৃষ্ণ মনে মনে ঠিক করেছিলেন, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির হবেন আগামী দিনের কর্ণধার।

******

দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভা। ভারতবর্ষের তাবৎ রাজাদের আগমন ঘটেছে সেখানে। তাঁরা প্রত্যেকেই ওই একটিমাত্র নারীকে কামনা করছিল। উপস্থিত ছিল পঞ্চপান্ডব। দ্রৌপদীর রূপে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তাঁরা সকলেই।

রাজনৈতিক ডামাডোলের সময় দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর খুব গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রাষ্ট্রের তাবৎ ঋষিকুল সহ শ্রীকৃষ্ণ উপস্থিত ছিলেন সেখানে। এখানে বলে রাখা ভালো, ভরতের পূর্ব - দক্ষিণ শক্তির( জরাসন্ধ প্রমুখ) উপর উত্তর পশ্চিম ভারতের আধিপত্য বিস্তারের জন্য সারা ভারত বর্ষ জুড়ে সে কা লে যে রাজ নৈতিক তথা কূটনৈতিক যুদ্ধ হয়েছিল, সেখানে শ্রী কৃষ্ণের প্রধান সহায় ছিলেন ঋষিকুল তথা ব্রামণকুল। ব্রামণ - ক্ষত্রিয় দ্বিপাক্ষিক চুক্তি জরুরি ছিল।

তথা দহ্তি রাজন্যো ব্রামণেন সমং রিপুম।

অর্থ:ঋষি কুলের সহায়তা পেলে শত্রু জয় করা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে কিছুই না। উল্লেখ্য যে, যুধিষ্ঠির নিজে ক্ষত্রিয় হলেও, তাবৎ ঋষিকুলের সঙ্গে ধর্ম আলোচনা করতেন। বেদ বেদাঙ্গ নিয়ে গভীর চর্চা করতেন। সেজন্যে আগামী ভারতের নায়ক হিসেবে ঋষি কুলের প্রথম ও একমাত্র পছন্দ ছিলেন যুধিষ্ঠির।

সমস্যা হল, সেই সময় দুর্যোধনে র গুপ্তঘাতকের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পাণ্ডব ছিল অজ্ঞাত বাসে। স্বয়ম্বর সভায় ছদ্ম বেশে এসেছিল। তার পিছনেও কারণ ছিল। সেই সময় পঞ্চাল শক্তিশালী রাজ্য। সেই রাজ্যের একমাত্র কন্যাকে যে ব্যক্তি বিবাহ করতে সমর্থ হবে, পরবর্তী কালে পঞ্চাল তার পাশে থাকবে। সুতরাং, দ্রৌপদীর বিবাহ নিছক বিবাহ ছিল না। তার পিছনেও ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। দ্রৌপদী কি জানতেন? এই উদ্দেশ্য মূলক বিবাহ সংঘটিত হতে দিতে সায় ছিল কি তাঁর? তথ্য বলে, তিনি অবগত ছিলেন। পিতা দ্রুপদ চেয়েছিলেন,কন্যার বিবাহ হোক অর্জুনের সঙ্গে। অর্জুন মহাবীর। জামাতা হলে সে হবে দ্রুপদের সহায়। নিতে পারবেন প্রার্থিত প্রতিশোধ, কুরুআচার্য ও একদা বন্ধু দ্রোণাচার্যের উপর। সেই জন্যই কঠিনতম শর্ত রাখা হল বিবাহের। যা ভেদ করা অর্জুন ব্যতীত আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে না।

লক্ষ্যভেদ অনুষ্ঠান শেষ হল।

কি অপূর্ব বিভঙ্গমে , নিখুঁত নিপুনতায় , সংযত ভঙ্গিতে লক্ষ্যভেদ করলেন অর্জুন। প্রশংসার পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল রাজসভা জুড়ে। কৃষ্ণ বুঝে গেলেন, এই নিপুণ ধনুর্ধর আর কেউ নয়। স্বয়ং অর্জুন। এরপর আরো কিছু ঘটনা ঘটল সেখানে। অর্জুনের প্রতি ঈর্ষায় কর্ণ দুর্যোধন শাল্ব শল্য দ্রুনায়নী ক্রথ সুনিথ বক্র শিশুপাল প্রমুখ রাজারা ছদ্মবেশী অর্জুনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন ভীম অর্জুনের দাপুটে যুদ্ধ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল উপস্থিত সকলে। কৃষ্ণ নিশ্চিন্ত। পঞ্চ পান্ডব এখানেই আছে। নি :শব্দে বার্তা বিনিময় হল, ঋষিদের সঙ্গে। একটা সঙ্কটের সূচনা নজরে পড়েছে তাঁদের। সেটা কী? অর্জুনের দ্রৌপদী লাভের ফলে ঈর্ষার করাল ছায়া শুধু অন্যান্য রাজাদের আক্রান্ত করেনি, পঞ্চপাণ্ডবের বাকি চার ভাই স্পষ্টত কাম এবং ঈর্ষায় আক্রান্ত। এর ফল হতে পারে ভয়ানক। নাহ। কিছুতেই পঞ্চপান্ডব ঐক্যভঙ্গ করা সম্ভব না।

তাই, অর্জুন লক্ষ্যভেদ করলেও কুন্তীর আদেশ হল পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে বিবাহ হবে দ্রৌপদীর। নারদ আর ব্যাসদেব বিধান দিলেন , এই ঘটনা দ্রৌপদীর পূর্ব জন্মে ছিল। সুতরাং বাধা কিসের?

আমার বিচারে, এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কুটিল সিদ্ধান্ত। পূর্বজন্ম কাহিনী সেই সময় পরিকল্পনা করেই বলা। কুন্তী আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিলেন যে, কৃষ্ণাকে দেখে তাঁর পাঁচপুত্রই কামে জর্জর। তাহলে? পাঁচ ভাইয়ের যে ঐক্য , যা নিয়ে আগামী দিনে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে হবে,দ্রৌপদীর রূপ সে লক্ষ্যে বাধার সৃষ্টি করবে। ভ্রাতাদের মধ্যেকার ঐক্য বিনষ্ট হলে স্বপ্নভঙ্গ হবে স্বয়ং কৃষ্ণের। সুতরাং, বন্ধকপাটের আড়াল থেকে কুন্তীর আদেশ, নারদ আর ব্যাসদেবের অলৌকিক তত্ত্ব প্রণয়ন ...এবং অর্জুনের প্রেম বুকে নিয়ে বিবাহের পরে প্রথমরাত যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে অতিবাহিত করা। আর একটা কথা বলে রাখা ভালো, উক্ত স্বয়ম্বর সভায় অর্জুনের আগে কর্ণ প্রায় ভেদ করে ফেলেছিলেন ল লক্ষ্য। কিন্তু, সর্ব সমক্ষে সুত পুত্র বলে অপমান করে ফিরিয়ে দেন তাঁকে দ্রৌপদী। এ অপমান সহজে মেনে নেয়নি দুর্যোধন, কর্ণ প্রমুখ। দ্যুতসভায় দ্রৌপদীর চরম অপমান এই উপেক্ষার একপ্রকার প্রতিশোধ বলা যায়।

রাজনীতির যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত সেই নারীর জীবনের প্রতিটি রাত কেমন করে নির্বাহ হত? কেউ জানতে চায়নি কোনোদিন। তবে, আগুন হতে উদ্ভুত কন্যার ভিতরের ক্ষোভ বাইরে প্রকাশ পায়নি , এটা তাঁর চরিত্র মহত্ব। নীরবে নিভৃতে রাত দিন কাটিয়েছেন অর্জুনের প্রতীক্ষায়।

 

অরণ্যবাস ও নিষ্ক্রিয় পঞ্চ পাণ্ডবের প্রতি দ্রৌপদীর উষ্মা।

&&&&&&&&&&&&&&&

 

দ্রৌপদীর জীবনে বঞ্চনা এসেছে বারবার। পঞ্চস্বামীর অকাতর সেবা করার পরেও যথোপযুক্ত সম্মান তিনি পেলেন কোথায়? দ্যুতক্রীড়ায় পণ রাখা থেকে শুরু করে প্রকাশ্য সভায়

বস্ত্র উন্মোচন , অসম্মানের শেষ সীমায় অবস্থিত করেও একবারের জন্য স্বামীদের দোষারোপ করেন নি। বরং তীক্ষ বুদ্ধির এই নারী স্থির মস্তিষ্ক থেকে যুক্তি প্রয়োগ করে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছেন তাঁদের। প্রখর ছিল তাঁর রাজনীতি বোধ। সাময়িক ভাবে তিনি উপেক্ষা করেছিলেন দুর্যোধন কর্ণ প্রমুখের অপমান। কিন্তু, ভুলে কিছুই যান নি। তখনো প্রস্তুত নন পঞ্চপাণ্ডব। দুর্যোধন অনেক বেশি ক্ষমতাবান। তাই, তিনি রইলেন সঠিক সময়ের অপেক্ষায়।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখা ভালো, বিবাহের পূর্বে দ্রৌপদী আইন শিক্ষা করেছিলেন। একথা মহাভারতের বনপর্বে তিনি নিজ মুখে বলেছেন। এছাড়া, শ্রী নৃসিংহপ্রসাদভাদুড়ি মহাশয়,তার মহাভারতের অষ্টাদশী গ্রন্থের ৪৭৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন," তখনকার দিনে আইনের বই বলতে বৃহষ্পতি সংহিতা,শুক্র সংহিতা এই সব ই ছিল। পণ্ডিতের কাছে বৃহস্পতি নীতির পাঠ নিতেন প্রধানত দ্রুপদ রাজা। কিন্তু আইনের ব্যপারে দ্রৌপদীর এত আগ্রহ ছিল যে ওই পাঠ গ্রহণের সময় তিনি কোন কাজের অছিলায় সেখানে চলে আসতেন। এবং বৃহস্পতি নীতির পাঠ গ্রহণ করতেন। অর্থাৎ আইন পড়তেন। এবং জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর এই শিক্ষা কাজে লেগেছিল, সন্দেহ নেই। যেমন, এই বনপর্ব।

দ্বৈতবনে প্রবেশ করলেন পান্ডব। একদিন সেখানে এলেন কৃষ্ণ এবং দ্রৌপদীর পিতৃগৃহের লোকজন। দ্রৌপদী বুঝলেন সময় এসেছে। তিনি এও বুঝেছিলেন,যুধিষ্ঠির নরম স্বভাব। যুদ্ধ বিগ্রহ পছন্দ করেন না। তিনি আর দেরি করলেন না। কৃষ্ণ কে দেখা মাত্র নিজের সমস্ত অভিযোগ তুলে ধরলেন। একটার পর একটা ঘটনা পর পর সাজিয়ে তুলে তুলে বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিলেন কোথায় কোথায় অন্যায় হয়েছে। বিচার হয় নি। বারংবার বলতে বলতে নয়ন যুগল মার্জনা করে নিশ্বাস ত্যাগ করে রাগতস্বরে কৃষ্ণ কে বললেন:

: নৈব মে পতয়: সন্তি ন পুত্রা ন চ বা ন্ধবা:।

ন ভ্রাতরো ন চ পি তা নৈব ত্বং মধুসূদন।।

মধুসূদন! আমার পতিরা নেই। পুত্রেরা নেই। বান্ধবরা নেই। ভ্রাতারা নেই। পিতা নেই। এমন কি তুমিও নেই।

সত্য। দ্রৌপদী যেন নাথবতী হয়েও অনাথবৎ!

সেই মুহুর্তে পরিবর্তন ঘটে গেল পান্ডবপক্ষে। কৃষ্ণ অর্জুন ভীম প্রত্যেকে দাঁড়িয়ে উঠে প্রতিশ্রুতি দিলেন, যুদ্ধ হবেই।

যুদ্ধ ঘোষণা করা হল। রচিত হল নতুন ইতিহাস। প্রতিষ্ঠা হল ধর্মরাজ্যের। সফল হল কৃষ্ণের স্বপ্ন। পঞ্চ পাণ্ডবের পরিশ্রম। সমস্ত কিছুর পিছনে রয়ে গেল দ্রৌপদীর অপরিসীম অবদান। ভারতের রাজনীতির একদিকে আছেন কৃষ্ণ। অপরদিকে অবশ্য দ্রৌপদী। এই দুজন না থাকলে, যুধিষ্ঠির হয়ত পাঁচটি গ্রাম উপহার হিসেবে প্রাপ্ত হয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন।

তাই, মহাভারতের রাজনৈতিক দিক বুঝতে হলে, দ্রৌপদীর কথা জানতেই হবে। মস্ত বড় ভূমিকা পালন করেছেন এই নারী। আজকের যুগেও তিনি সমান আধুনিক এবং প্রণম্য।

 

কপিরাইট লেখিকা কর্তৃক সংরক্ষিত

         

ভাস্কর পাল ~ টীকা ছাড়াও টিকে আছি


টীকা ছাড়াও টিকে আছি


ডারউইন সাহেবের কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তিনি বলেছিলেন কেবল মাত্র যোগ্যতম শ্রেণীই লড়াইয়ের ময়দানে টিকে থাকবে। আমরাও এই পৃথিবীর বাকি মানুষজন, যোগ্যতম কি না জানি না তবে টীকা ছাড়াই টিকে আছি এখনও। এই লেখা শুরু করার সময় এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছেন ৯৪৭২৬৬জন, আক্রান্ত হয়েছেন ৩০২৪১৩৭৭, সুস্থ্য জন হয়েছেন ২০৫৭৫৪১৬ জন। আর আমার ভারতে আমরা থালা বাজিয়ে মোমের আলো দেখিয়ে বিজ্ঞান ও যুক্তিকে শত যোজন দূরে রেখে এক নম্বর হওয়ার দৌড়ে মেতে আছি ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ৫২১৪৬৭৭ মারা গেছেন ৮৪৩৭০ আর সেরে উঠেছেন ৪১১২৫৫১ জন। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবায় আড়াআড়ি একটি জলস্রোত মুহূর্ত। মানব ইতিহাসে এর আগে কখনও এত, রোগে বহু দেশে একই সাথে এত বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্থান ঘটেনি। আণুবীক্ষণিক এই জীবের প্রাদুর্ভাব সারা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতা কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তি, স্থাপত্য, বিজ্ঞান এবং সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে আমাদের যে গর্ব ছিল তা এক লহমায় ধুলিস্যাৎ আতিমারীর এই আবহে যখন দেশে দেশে স্বজন হারার তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে তখন এই গোলকের আমরা সম্মিলিত প্রতিরোধ ভাবনা থেকে বহু দূরে হেঁটে আমাদের আন্তঃদেশীয় অনৈক্যকে প্রকাশ করে ফেলেছি বেটার গ্লোবাল গভর্নেন্স এবং জি-২০ এর মত উন্নয়ন সংস্থা এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে দীর্ঘায়িত আলোচনা এবং সদস্য দেশগুলিকে সময়মতো সমর্থন না করা থেকে বোঝা যায় যে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার জন্য আমাদের আরও উন্নত সমন্বিত বৈশ্বিক প্রশাসন ব্যবস্থা প্রয়োজন সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যাবস্থা নেই, প্রযুক্তি উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক উন্নয়নকে পাখির চোখ করে গড়ে ওঠা সামাজিক পরিকাঠামো সমন্বয়ের অভাব আর অনুকরণশীল মানসিকতা আর সমাজ বিছিন্ন করা লকডাউনে সুদীর্ঘ কাল যাপন করে আসা হোম স্যাপিয়ন্স আজ  যুদ্ধক্লান্ত, নিজের সাথে, সমাজের সাথে, প্রশাসনের সাথে, রাষ্ট্রের সাথে লকডাউনের লুকোচুরি খেলে খেলে, টিকে থাকার অসম প্রতিযোগিতা করে চলেছে। টীকা ভাবনা এখনও এই গোলকের বিভিন্ন প্রান্তে টিকটিক করে সময় গুনছে।


লকডাউনের জেরে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। অর্থনীতির বণ্টন বৈষম্য আরও বেড়েছে। ধনীরা আরও ধনী হয়েছেন। গরিব আরও গরিব। মোটের উপর আর্থিক সঙ্কট তৈরি হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্র বিরাট লাভবান হয়েছে অতিমারির সময়ে। এই সময়টায় শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে নার্সারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষণ সমস্ত কিছু অনলাইন হয়ে গিয়েছে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম এবং অনলাইন ক্লাসের জন্য ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের বিক্রি ব্যাপক হারে বেড়েছে। এই সবের জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি যাঁরা তৈরি করছেন, তাঁদের ব্যবসা বাড়ছে। একই ভাবে মাস্ক, স্যানিটাইজার-সহ চিকিৎসাসামগ্রী তৈরির সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলিও তাদের ব্যবসা বাড়ানোর বিপুল সুযোগ পেয়েছে। সব মিলিয়ে অনেকগুলি রাস্তা খুলে গিয়েছে। নতুন নতুন সম্পদশালী তৈরি হচ্ছেন। এই করোনা সঙ্কটের মধ্যেও বিগত কয়েক মাসে আমাদের দেশে নতুন ১৫ জন বিলিওনিয়ার তৈরি হয়েছে। ফোর্বস পত্রিকার রিয়েল টাইম বিলিওনিয়ারের তালিকায় আপাতত মোট ১১৭ জন ভারতীয় অথচ লকডাউনের মাস মার্চ মাসে এই সংখ্যাটা ছিল ১০২। আর এই ১১৭ জন সম্পদশালী ভারতীয়ের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি ডলার। বোঝাই যাচ্ছে যে করোনা পরিস্থিতিতে পুঁজি ও পুঁজিতন্ত্রের বিন্যাস এলোমেলো। অর্থনৈতিক এই গাড্ডাটি নতুন নয়, ছিলই। ওপরের চাকচিক্য ও জাঁকজমক দেখে তা  বোঝবার উপায় ছিল না। বিশ্বব্যাপী বাজারে ছেয়ে থাকা উজ্জ্বল পণ্যসমাবেশ, ৪২হাজার ছুঁয়ে থাকা শেয়ারবাজার, এখানে সেখানে ইয়াব্বড়ো ছাপান্ন-আটান্ন-ষাট-পঁয়ষট্টি ইঞ্চি ছাতিওয়ালা নেতাদের সদর্প দাপাদাপি, একদিকে জাতিরাষ্ট্র-জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে বিশ্বায়নের শান্তিবাণিজ্য বুলি আউড়ে প্রকৃতি ও সমাজকে তছনছ করা, এসবের আড়ালে আসলে পুঁজিতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু হাল ২০০৮-এর অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকেই গত এক-দশকের বেশি সময়কাল ধরে স্পষ্টতর, করোনা-পরিস্থিতি সে সঙ্কটকে শুধু আরো গভীরই করেনি, গোটা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বেয়াব্রু করে ফেলেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে কুখ্যাত স্প্যানিশ ফ্লু, ১৯২৯-৩০ এর মহামন্দা এবং তৎপরবর্তী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, এসব মনে রেখেও বলা যায়, পুঁজিতন্ত্রের মোটামুটি গত পাঁচশো বছরের ইতিহাসে — বিশেষত শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সময়ে  পুরো ব্যবস্থাটা সম্ভবত এর আগে ঠিক এইভাবে বিশ্বজোড়া সার্বিক হামলার মুখে পড়েনি। সে অর্থে, বর্তমান সঙ্কট অভূতপূর্ব। প্রায় সমস্ত শিল্প উৎপাদনপ্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ, বিশ্বের সর্বত্র নথিভুক্ত পঞ্জিকৃত বেকারের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ধনী ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রকে ও আর্ন্তজাতিক অর্থপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং ত্রাণ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। শুধু যে তথাকথিত শিল্প-উৎপাদনক্ষেত্র বিপর্যস্ত হচ্ছে তা নয়। গত তিন দশক ধরে নিওলিবারল বাজার অর্থনীতি ও পণ্যবাণিজ্যের অভাবনীয় বিস্তারের কালে যে যে ঝাঁ-চকচকে ক্ষেত্রগুলো দ্রুতগতিতে বেড়েছে, তার সবকটা একত্রে মুখ থুবড়ে পড়েছে,  নির্মাণ, পর্যটন, হস্পিটালিটি, অসামরিক বিমান পরিবহন, একচেটিয়া এবং বড় খুচরো ব্যবসা। বাকি ক্ষেত্রগুলোও প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে সংকুচিত হচ্ছে


পুঁজিতন্ত্রের কাছে যে বিষয়টা অনেক বেশি চিন্তার, গত কয়েক দশক ধরে অর্থপুঁজির যে বাড়বাড়ন্ত দেখা গিয়েছিল সেটিও অনেকাংশে গতিরুদ্ধ। রাষ্ট্রগুলো বাজারের সাম্য বজায় রাখার জন্য যে লগ্নি করেছে, তাতে করে শেয়ার বাজারের সরাসরি ধস সাময়িকভাবে আটকেছে বটে, সামগ্রিক নিম্নগতি রোধ করা যায়নি। লগ্নি এবং বিনিয়োগের বিভিন্ন সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সার্বিক সংকোচনের কারণে বর্তমান অর্থপুঁজির বাজারের কেন্দ্রে আবর্তিত যে অর্থনীতি, তা বিপন্ন। ফলে, আপাত-উৎপাদন বহির্ভূত (ননপ্রোডাক্টিভ), মুখ্যত অনিয়ন্ত্রিত মুনাফাবৃদ্ধির যে ধূমধামাকা পুঁজিবাজারের কেন্দ্র হয়ে উঠছিল, তা আর কতদিন চালু থাকবে তা নিয়েও সংশয় দেখা দিচ্ছে। এখন কথাটা হল, কীভাবে পুঁজিতন্ত্রে ঘেরা এই সমাজ ব্যাবস্থায় থেকে এই সঙ্কটকে দেখছেন কিংবা দেখবেন? করোনা মহামারি জনিত যে আপৎকালের মধ্যে আমরা গড়পড়তা মানুষেরা হাবুডুবু, সেই গোলমেলে সময়ের  দাবি ও প্রয়োজনকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েও, মহামারি অবস্থায় এবং তৎপরবর্তীতে এই মূল্যায়ন করা অবশ্যকর্তব্য


এমন অবস্থায় রাষ্ট্র কী করে?


এই সঙ্কট আমার আপনার আর আমি আপনি মিলেই তো পাড়া,মহল্লা জেলা, রাজ্য দেশ তাহলে এই সময়ে আমাকে ভালো রাখার দায়িত্ব কার? দেশের লোকের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? খাদ্যসঙ্কট নিরসনে মূল ভূমিকা কার? লোকে না খেতে পেয়ে, বন্যা ঘূর্ণিঝড় ভূমিকম্পে, করোনায় এবং হাঁটতে হাঁটতে মারা গেলে বা আরো দশ রকমের রোগব্যাধিতে ভুগে মারা গেলে, তা ঠেকানোর কথা কার?  সবাই জানেন এই দায়িত্ব আমাদের মহামূল্যবান ভোট দানের মাধ্যমে আমরা  সরকার নির্মাণ করি সেই রাষ্ট্রের।করোনার বাজারে পুরোনো মহামারী ও দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির কথা আসছে। সরকার দায়িত্ব নেবে। স্বাধীন দেশ বা রাষ্ট্র দেশের নাগরিকদের প্রতি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে। কেউ না খেতে পেয়ে অপুষ্টিতে ভুগে মরবেন না। কেউ বিনা চিকিৎসায় মরবেন না। কেউ তাঁর জন্ম পরিচয়ের কারণে (ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ) সামাজিক বৈষম্য-বঞ্চনার শিকার হবেন না। রাষ্ট্রীয় অ-বিচারের শিকার হবেন না কেউ। একটি স্বাধীন দেশে এইরকম হয়, হবারই কথা।


আর আমরা?


আমার দেশ জুড়ে আবার দেশ ভক্তির ঝড়। দেশ মানে সংবিধান। দেশ মানেই রক্তে লেখা বলিদান। ধর্মীয় উন্মাদনায় ডুবে আছে দেশের মানুষ। ধর্মীয় উন্মাদনা ও আবেগনির্ভর জাতীয়তাবাদের সঙ্গে পুঁজিতন্ত্রের সংশ্লেষ ও সহাবস্থান, এই অবস্থাটা একশো বছরেও বদলায় নি শুধু সময়টা বদলে গেছে, সবাই মিলে ভোট দিয়ে রাজা তৈরি করে, কিন্তু দেশকাল নির্বিশেষে রাজাদের দাপটে প্রজার দল ত্রাহি ত্রাহি রব তুলছে। তবু বিশ্বাসীর দল অনড়। কারণ রাজার মাহাত্যে ভরসা হারালে ঘোর নৈরাজ্য আসতে বাধ্য। এটা তো স্বাভাবিক ছিলই। সামগ্রিক ভাবে ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে ব্যর্থ এই সরকার, দেশ জুড়ে জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিন্ম মুখী। NRC, CAA তে চূড়ান্ত হয়রানিতে ভারতবাসী। পরিকল্পনাহীন ভাবনার অবাস্তব প্রয়োগের ফলে সারা দেশ এর অর্থনীতি বিপর্যস্ত। মেইড ইন ইন্ডিয়ার বদলে মেক ইন ইন্ডিয়ার সিংহ আজ মরচেতে ভঙ্গুর।  দেশের উৎপাদন বাণিজ্য নিন্মমুখী। শিল্পনীতি একমুখী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা উন্নয়ন শুধুই প্রচার সর্বস্য। এই সময় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাই একমাত্র সম্বল। আর যুদ্ধের জিগির তুলে দেশবাসীর ভাবনার অভিমুখ বদলে দেওয়ার আর এক চক্রান্ত। এই বিরুদ্ধ বিরোধিতায় আমার আপনার মগজ চুরি করার জন্য হাজির  এমন প্রচুর গিরগিটি, যারা এমন "বয়কট " এর মত বিজ্ঞাপনে সামিল হয়ে নজর ঘুরিয়ে দেবে বেকারীর থেকে..৫১% এর বেশি লগ্নী বলীয়ান বেসরকারি হয়ে যাওয়া প্রতিরক্ষা থেকে ব্যবস্থা বিলগ্নিকরন থেকেদেশের বনাঞ্চল ও খনিজ কর্পোরেটের  হাতে নিঃশব্দে সমর্পণের থেকে। শ্রম আইনের পরিবর্তনের থেকে।সার্বিক স্বাস্থ্য বিধানের দায়িত্ব ভাবনার প্রশ্ন গুলি এড়িয়ে আমরা মেতে থাকবো বয়কটের খেলায়।ফলত তাঁরা পরিযায়ী শ্রমিকদের অবস্থা, কৃষকদের দারিদ্র্য, ক্রমবর্ধমান বেকারি ও মূল্যবৃদ্ধি, মন্দা এসব নিয়ে ভাবতে যাবেন বলে মনে হয় না। আসলে, ভাবার ক্ষমতা, প্রয়োজন বা ইচ্ছা কোনোটাই তাঁদের নেই, তাছাড়া, না থেকেও দিব্যি চলে যাচ্ছে।


এখন চেতনার জগতে তোলপাড় করে প্রশ্ন উঠতে পারে, দেশের এই ঘোর দুঃসময়ে, খামোখা এসব চর্চায় কালক্ষেপ করে কি হবে? করোনা অতিমারী এবং তজ্জনিত খাদ্যসঙ্কট ও রেশনব্যবস্থার অসাম্য অবস্থা অথবা কেন্দ্র রাজ্য সমীকরণ এসব ছেড়ে আমরা কপি বুক অর্থনীতিতে মন দিচ্ছি কেন? দিচ্ছি একারণে, যে করোনা বলুন আর রেশন বলুন, কিছুই পুঁজিতন্ত্রের বাইরে নয়। করোনা-বিপর্যস্ত ধনী ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকান। আমেরিকা থেকে ফ্রান্স-জার্মানি হয়ে ইংল্যান্ড অবধি একের পর এক দেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, দেড় থেকে দু মাস প্রায় সমস্ত উৎপাদন বন্ধ, বেকারির হার আকাশ ছুঁচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলন বিপর্যস্ত, বড় সংগঠিত সংগঠন প্রায় সর্বত্র রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচারণে অক্ষম, অন্যরা, অর্থাৎ কম মজুরিতে কাজ করা বা তথাকথিত স্বনিযুক্ত শ্রমজীবীরা, কৃষিশ্রমিকেরা এবং আর্ন্তদেশীয় ও অর্ন্তদেশীয় পরিযায়ী শ্রমিকেরা –এঁরা মুখ্যত অসংগঠিত। ফলে শ্রমিক আন্দোলনের চাপে নিওলিবরেল অর্থনীতি রাষ্ট্রনির্ভর ওয়েলফেয়ার অর্থনীতি হয়ে যাবে, এ সম্ভাবনা কম। বাকি থাকে যুক্তির ও ন্যায়ের কথা। করোনায় পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, ব্যবস্থাগত সঙ্কট তৈরি হচ্ছে, ঠিক। কিন্তু ব্যবস্থাটা তো সঙ্কটের মধ্যে ছিলোই। বিশ্বব্যাপী খোলা বাজার আর অবাধ মুক্ত বাণিজ্যের দর্শনকে চ্যালেঞ্জ করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো ক্রমশ ফ্যাসিবাদ অভিমুখী ডানপন্থী পরিচয়ের রাজনীতির দিকে ঝুঁকছিলো। পুঁজিতন্ত্র কিভাবে চলবে, রাষ্ট্র কী আচরণ করবে, তার সাথে যুক্তি বা ন্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। করোনায় আক্রান্ত হয়ে হোক, করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সঙ্কটের অভিঘাতে হোক, জাতিরাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী আক্রমণে হোক, কি বন্যায় দাবানলে ঘূর্ণিঝড়ে দুর্ভিক্ষে এখানে ওখানে দু-দশ লাখ লোক মরলেও তাতে ব্যবস্থাটা আরো যৌক্তিক বা ন্যায়পরায়ন হয়ে উঠবে না। যেটা বোঝা দরকার, সেটা হচ্ছে, পুঁজিতন্ত্রের যে গূঢ় চলন, রাষ্ট্র সেখানে ঐতিহাসিকভাবেই পরজীবী। গত তিরিশ-চল্লিশ বছরে পৃথিবীতে মোট যে পরিমাণ পুঁজি সঞ্চালিত হয়, তাতে আমাদের চেনা তথাকথিত উৎপাদন ক্ষেত্রের(প্রোডাক্টিভ সেক্টর) ভাগ কমছে। বাড়ছে তুলনায় অচেনা অর্থপুঁজি বা ফিন্যান্স ক্যাপিটাল। আজকের পৃথিবীতে কি শেয়ারবাজার কি ফিন্যান্স বাজারে নতুন লগ্নি, তার প্রায় সবটাই ফাটকা। রাষ্ট্রের হাতে কত পুঁজি থাকে? রাষ্ট্র ব্যাংকের হাতে তরল পুঁজি মাখাতেই থাকবে, এবং একইসঙ্গে, বেকার শ্রমিককে মজুরিও দেবে, লোকের খাদ্য-শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ব্যবস্থাও করবে? ধরুন ভারতের কথা – সরকারের কাছে কি এত পুঁজি আছে? অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দরকার হলে টাকা ছাপাও। প্রশ্ন, কত টাকা ছাপানো হবে? কতদিন ধরে? ছাপানোর পর কী? ছাপানো টাকায় মূল্য সংযোজন হবে কী করে? উৎপাদন পুরো বন্ধ হয়ে থাকলে বা হঠাৎ করে অনেকটা কমে গেলে শেয়ারবাজার চাঙ্গা থাকবে কী করে? কতদিন?


তাহলে এই সংকট মোকাবিলায় কী করণীয়?


চাই চিকিৎসা ব্যবস্থার পুনর্নবীকরণ ও স্বাস্থ্য কর্মীদের পুনরুজ্জীবন :


বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে প্রতিটি দেশে যে সুদক্ষ স্বাস্থ্য কর্মী রয়েছেন যাঁরা পোলিও বা অন্যান্য সামাজিক স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার সাথে যুক্ত থেকে প্রান্তিক এবং সমানা সামনি ভাবে বিভিন্ন রোগ মোকাবিলা ও উন্নততর স্বাস্থ্য বিধান কর্মসূচী রূপায়িত করে চলেছেন তাদের কোভিড ভাইরাস বা এই ধরনের মহামারী সম্পর্কিত কোনো প্রশিক্ষণ না থাকার কারনে কোভিড ভাইরাসের সার্বিক সংক্রমণ ও বিশ্বব্যাপী প্রসার চলতে থাকা এই সাবেকি ব্যবস্থাপনার অন্তঃসার শূন্যতাকে সামনে নিয়ে এসেছে কোভিড ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রশাসনিক ভন্ডুরতা প্রকাশ করেছে। সঠিক সময়ে এই সংস্থার দেওয়া পরামর্শ বিশ্বের কোনো দেশ সার্বিক ভাবে গ্রহণ করেনি যেহেতু এই সংস্থাটির অস্তিত্ব প্রতিটি দেশের অনুদানের উপর চালিত হয় সেক্ষেত্রে তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মতপ্রকাশ ও সেটি প্রতিটি দেশের মেনে নেওয়া ও তার প্রয়োগ সেই দেশের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে আগামীতে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করা মানব জাতির নিজের স্বার্থেই করা উচিতবর্তমানে বিশ্বের সমস্ত স্থানেই one valve technique এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান করা হয়। স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার সাথে যুক্ত সমস্ত স্তরের উপর্তলার কর্মকর্তাদের অন্তঃসার শূন্য জ্ঞান সংক্রমণ কে ত্বরান্বিত করেছে মহামারীর পরবর্তী সময়ে সংক্রামক রোগ ও তার মোকাবিলার জন্য সঠিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ পেশাদার শিক্ষার পাঠ্যক্রম কে পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত করা মহামারী মোকাবিলার জন্য Task Force গঠন, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে ও প্রান্তিক কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক ধারণার উপর ভিত্তি করে কার্যাবলী ও নিয়মাবলী গ্রহণ করা উচিত


চাই সবার জন্য ভ্যাকসিন :


নভেল করোনা ভাইরাসের আগমন এবং এই জন্য ভ্যাকসিন তৈরির প্রয়োজন এমন এক সময়ে হলো যখন বিশ্ব ব্যাপী বিভিন্ন কম্পানি ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যাস্ত। লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ এবং মহামারী রোগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ডেভিড হেইম্যান বলেছেন স্বাভাবিক সময়ের মত একই গতিতে যদি ইনফ্লুয়েঞ্জা,হাম, রুবেল ও অন্য রোগের ভ্যাকসিন তৈরি অব্যাহত থাকে তাহলে একই সময়ে যদি করোনা ভাইরাসের জন্য 100 কোটি ডোজের চাহিদা তৈরি হয় তাহলে নিসন্দেহে প্রোডাকশনের ঘাটতি পড়বে খুব দ্রুততম সময়ের ভেতর খুব বেশি পরিমাণ ভ্যাকসিন তৈরি করে দেওয়াটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মানবদেহে কোন জীবাণু প্রবেশ করলে এর বিরুদ্ধে ইম্যুনিটি(নিরাপত্তা) সৃষ্টি করার জন্য কৃত্রিমভাবে যা প্রদান করা হয় তাই ভ্যাকসিনপৃথিবীজুড়ে Smallpox রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল এবং পোলিও,হাম, ধনুষ্টংকার এর মত রোগের প্রায় নির্মূলকরণ সম্ভব হয়েছে ভ্যাকসিনেশন বা টিকাপ্রদানের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্যমতে ২৫ টি রোগ আছে যাদেরকে ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্যমতে প্রতিবছর ভ্যাকসিনেশন ফলে আড়াই মিলিয়ন মৃত্যু প্রতিরোধ হয়। ভ্যাক্সিনেশনের পরিপূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি কম্যুনিটির বেশীরভাগ (মোটামুটি ৮০-৮৫%) মানুষকে ভ্যাকসিনেশন করা গেলে ঐ কম্যুনিটির প্রায় সব সদস্য একই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভ করে (Herd immunity/Community immunity)। এই প্রক্রিয়ায় ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম ইত্যাদি রোগের প্রতিরোধ করা যায়। জীবাণু থেকেই তার দ্বারা সৃষ্ট রোগের ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করা হয়। যেকোন জীবাণুর আছে দুইটি বৈশিষ্ট্য- একটি হল রোগ সৃষ্টি করা (Pathogenecity)। অন্যটি দেহের অভ্যন্তরে ঐ একই রোগের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য কিছু পদার্থ (Antibody) তৈরী করা। রোগ সৃষ্টির ক্ষমতাহীন জীবাণুকেই ভ্যাক্সিন হিসেবে দেহে প্রবেশ করানো হয়। ফলশ্রুতিতে এই জীবাণু দেহে রোগের কারণ হয় না, উল্টো রোগটি যেন না হয় তার জন্য বিশেষ পদার্থ(Antibody) তৈরী করতে থাকে। আরেকটি সুবিধা হল এই জীবাণুগুলো মেমরি সেল গঠন করে ফলে পরবর্তীতে একই জীবাণু পুনরায় প্রবেশ করলে সহজে সনাক্ত করতে পারে। এভাবে ভ্যাক্সিন শরীরের ইম্যুনিটি-কে বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবী জুড়ে ভ্যাকসিন গবেষণাও গত কয়েক দশক ধরে তহবিলের দীর্ঘস্থায়ী অভাবের কারণে ভুগেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং উন্নত দেশের সরকারগুলি তার গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ভাবে অর্থের সংস্থান থেকে দূরে সরে গেছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন গবেষণা বিভিন্ন ফিলান্থ্রপিক গোষ্ঠীর অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে। প্রতিটি দেশ তার বার্ষিক বাজেটে যে পরিমান অর্থ তার সমরাস্ত্র আধুনিকিকরনে ব্যয় করে তার কয়েক ভগ্নাংশ ব্যয় করে মানব মান উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক গবেষণায়


কিছু ভাইরোলজিস্ট বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে একটি সতর্কবার্তা হিসাবে দেখেছে এবং বলেছে যে বর্ধিত পরিবেশগত চাপ মানব-মানব ট্রান্সমিসিবিলিটি আরও এই জাতীয় ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। সরকারী ভাবে ভ্যাকসিন গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করার জন্য প্রতিটি সরকারগুলি সক্রিয় হতে হবে এবং টিকা গবেষণায় প্রয়োজনীয় মেধা ও ব্যাবস্থাপনা সম্পুর্ন করতে হবে। গ্লোবাল হেলথ কমিউনিটি বদ্ধমূল বৌদ্ধিক সম্পত্তি নিয়মনীতি সম্পর্কেও চিন্তাভাবনা করবে যা উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ভ্যাকসিনগুলিতে অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার রোধ করতে পারে। যা পরবর্তী পৃথিবীতে স্বাস্থ্য অসাম্য নিয়ে আসতে পারে


চাই অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যের মজুত কৌশল :


1973 সালের Cold War এর টানটান স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকেই পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশ তার প্রয়োজনীয় ও অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য সামগ্রী এবং চিকিৎসা সামগ্রী মজুত রাখতে শুরু করে। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে মুক্ত বাণিজ্য নীতি চালু হওয়ার পরে সহজলভ্য কাঁচামাল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি Stock Pilling বা মজুত করার প্রবণতা থেকে বিশ্বের বহু দেশ পিছিয়ে আসে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফিনল্যান্ড তার নিজস্ব ভান্ডারে ঘাটতি হতে দেয় নি। Covid 19 প্রাদুর্ভাব উচ্চতর বিশ্বায়নের বিশ্বে স্টক রক্ষণাবেক্ষণের সাথে জড়িত অর্থনীতির বেহাল অবস্থা ও পরিচালন ব্যবস্থার চূড়ান্ত অদক্ষতার দিক নির্দেশ করছে। সরকারি ক্ষেত্র এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে সর্বক্ষেত্রেই ওষুধ উৎপাদন ও মজুতিকরনের এর ব্যাপারে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বেশিরভাগ ওষুধ নির্মাতা কোম্পানি গুলি অল্প লাভের ওষুধের চেয়ে বেশি লাভজনক ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক উৎপাদনে বেশি আগ্রহী হয় এর ফলে প্রয়োজনীয় সহজলভ্য ওষুধের অকাল পরিলক্ষিত হয়সারা বিশ্ব জুড়ে সরবরাহ চেন বিপর্যস্ত। সরবরাহ চেন গুলির স্বাভাবিক হওয়ার জন্য আরও সময় লাগবে এর ফলে আমরা কৃত্রিম ভাবে সৃষ্ট এক সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ব। এই সংকট উন্নততর বিশ্বের কোনও বাণিজ্য কৌশল কি না এ ব্যাপারে নিশ্চিত না হলেও Covid19 পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগে যে কোনও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আরও বেশি বেশি Warehouse নির্মাণ ও জীবন উপযোগী অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যের মজুতিকরনের মাধ্যমে এক নতুন অর্থনীতি সার্কেলের সূচনা করতে পারবে। আজকে যখন আমরা উন্নততর অর্থনীতির অন্তঃসার শুন্য শব্দনিনাদ করছি প্রচার সর্বস্যঃ রাজনীতির গান গাইছি এবং ব্যাপক বেসরকারিকরণের মাধ্যমে প্রগতির জং ধরা চাককে ঘোরানোর চেষ্টা করছি সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক ভাবে সরকারি করণ ও সরকারী নিয়ন্ত্রণই এই মুমুর্ষ অর্থনীতি, দেশ সহ মানবজাতির পতনকে রক্ষা করতে পারবে


চাই সর্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজ :


শেষ অবধি, আমরা দেখেছি যে দেশগুলির একটি কার্যকর প্রাথমিক যত্ন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে তারা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে লড়াই করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সমস্ত আর্থিক দক্ষতা এবং সুপরিচিত পরিচালিত হাসপাতাল ব্যবস্থা সহ এখনও একটি বড় মামলার বোঝা নিয়ে লড়াই করছে। ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) সিস্টেমের অভাবে বিষয়গুলি স্বাস্থ্যসেবা অ্যাক্সেসের অভাব দ্বারা উদ্বেগিত হয়েছে।যদিও ইউএইচসি চলমান রাষ্ট্রপতি প্রাথমিকগুলিতে বিশিষ্টভাবে বৈশিষ্ট্যযুক্ত করেছে, তবে এটি এখনও পুরো জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। গত দশকে ইউএন জেনারেল অ্যাসেম্বলি এবং ডাব্লুএইচও-এর গৃহীত পদক্ষেপের কারণে ইউএইচসি দৃঢ় ভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে স্থান পেয়েছে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উচ্চতর বিনিয়োগ এবং একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউএইচসি অর্জন করতে হবে যে বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে। বিশ্বকে এই দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত কারণ সমাজের স্বাস্থ্যের উন্নতির মূল ভিত্তি হ'ল স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকার।বৈশ্বিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে আমরা একই ধরণের প্রকোপ থেকে ক্রমাগত হুমকির মধ্যে আছি এবং প্রস্তুতিই আমাদের একমাত্র ঢাল।  আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে একই ভুলগুলি আবার না ঘটতে রোধ করতে কঠোর পরিবর্তন করতে হবে।


এতো গেল একতরফা চাই এর ফর্দ কিন্তু বাস্তব কি?


উদারনীতির মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজির সমৃদ্ধির দানবীয় তাণ্ডবের ফসল শুধু রোগ-মহামারী ও সেসব সামাল দিতে ব্যর্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। যথেচ্ছ বিনিয়োগ, করপোরেটের ব্যাপ্তির আত্মঘাতী প্রবণতা ধ্বংস করছে জীববৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে বরফ গলছে মেরুঅঞ্চলে-গলছে হিমালয়। অ্যামাজন জ্বলে, অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থামে না, সুন্দরবন ধ্বংসের সব আয়োজন সম্পন্ন, সারা পৃথিবীময় বনাঞ্চল-পাহাড়-নদী-জলাশয়-কৃষিজমি বিনষ্ট হচ্ছে। দূষণের নির্মমতা আকাশচুম্বী। নগরায়ণের ফলে নীলাকাশ অদৃশ্যপ্রায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। সব জেনেও বৃহত্ শক্তির রাষ্ট্রগুলো তাদের মিত্র ও লেজুড়রা পৃথিবীর সম্ভাব্য ধ্বংস ডেকে আনছে। তারা জানে, মানুষকে সঠিক পথ দেখালে তাদের বাগাড়ম্বর-জারিজুরি অসাড় হয়ে যাবে।


তাহলে করণীয় কী? 


রুশ সাহিত্যিক ‘ফিওদোর দস্তয়েভেস্কির উক্তি—‘হোক তা ভুল বা ঠিক মাঝেমধ্যে ভেঙেচুরে ফেলা আনন্দের’ চাই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণে গণশক্তির উত্থান। ভেঙেচুরে নিঃশেষ হয়ে যাক বিদ্যমান অন্যায্য ব্যবস্থা। গড়ে উঠুক বাসযোগ্য, নতুন, ভবিষ্যত্ পৃথিবী। আপাতত, লকডাউন কবে উঠবে বলা যাচ্ছে না। লকডাউন উঠলেও যে ঠিক কী হবে জানা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-র প্রধান জানিয়ে দিয়েছেন, ভাইরাস নিয়ে ঘর করাটা অভ্যেস করে ফেলতে হবে। ফলে, অবস্থাটা দ্রুত বদলাবে, এ আশা নেই বললেই চলে। কোভিড প্রতিষেধক টিকা যতক্ষণ না বেরুচ্ছে, অর্থাৎ যতদিন পর্যন্ত তা বাজারজাত ও সহজলভ্য হচ্ছে, অবস্থাবদল ঘটবে না, একরকম নিশ্চিত। তাঁরা যাঁদের কথা সকালসন্ধ্যা ভাবেন, ভেবে আকুল হন, সেই মেহনতি সাবঅল্টার্ন দিন-আনি-দিন-খাই মজুরচাষী, তাঁদের অবস্থাটা ঠিক কী দাঁড়াচ্ছে? করোনা পরিস্থিতিতে কিছু সরকারি সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে, কিছু খাদ্যসামগ্রী, সামান্য অর্থ, এইরকম। কিন্তু সে সাহায্য দেশের সর্বত্র সব মানুষের কাছে একভাবে পৌঁছচ্ছে না। রেশনে যা পাওয়া যাচ্ছে, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। রেশন সবাই পাচ্ছেনও না। রাজ্য সরকার বলছেন, কার্ড না থাকলেও রেশন পাওয়া যাবে। কার্যত তা ঘটছে না। কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠানো চাল গম, যা কিনা ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া বা এফসিআই-এর জিম্মায় ঠাসগুদাম মজুদ থাকে  সরকারি কার্ড না থাকলে তা পাবার জো নেই। উপরন্তু রাজ্য সরকার বলছেন, এফসিআই ঠিকঠাক মাল দিচ্ছে না, লোকে খায় সেদ্ধ চাল, দেওয়া হচ্ছে আতপ, তাও যতটা দেবার কথা ততটা নয়। রাজ্য সরকার এও বলছেন, তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত চাল মজুদ, দরকারমতো লোকের কাছে পৌঁছে যাবে, এফসিআই দিক না দিক থোড়াই পরোয়া। তাহলে গণ্ডগোলটা কোথায়? লোকে উপযুক্ত মাত্রায় পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছেন না কেন? শুধু এ রাজ্যে নয়, দেশের অন্যত্র থেকেও খাদ্যাভাবের খবর আসছে শহরের গরীব, গ্রামের ভূমিহীন বা প্রান্তিক চাষী, গ্রামীণ শ্রমজীবী, সমুদ্রপারের মৎস্যজীবী, বনে থাকা আদিবাসী বনবাসী, কেউ নিরাপদ নন। কেন নন? কেন খাবারের অভাব ঘটছে? বিষয়টা তলিয়ে বোঝা দরকার।


তাহলে কি বোঝা উচিত!!!


রাষ্ট্র এবং পুঁজিবাজার, কারুর কাছেই এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। তারপরেও, বিপর্যস্ত ও তালগোল পাকানো অবস্থায় পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা বেঁচে থাকতে পারে, অনিবার্য আত্মধ্বংস অর্থাৎ ইমপ্লসনের দিকেও এগিয়ে যেতে পারে। এই সঙ্কটদীর্ণ, গোলমেলে অবস্থাটাকে পড়ার, বোঝার, চেষ্টা করছেন কি? করোনা সঙ্কটে বিপর্যস্ত আক্রান্ত যে শ্রমজীবী মানুষ, যথা পথে প্রান্তরে হঠাৎ আবিষ্কৃত পরিযায়ী শ্রমিকের ঢেউ, তাঁদের পাশে থেকে, মধ্যে ঢুকে পুঁজিতন্ত্রের অর্থনৈতিক সঙ্কটকে রাজনৈতিক সঙ্কটে বদলে দেবার কোন পরিকল্পনা আছে কি? মানুষ কী করবেন, কীভাবে ভাববেন, আদৌ ভাববেন কিনা, এসব প্রশ্ন ক্রমেই আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই নতুন অবস্থাটাকে বুঝতে ও ব্যবহার করতে মানুষ যদি ব্যর্থ হন, ফ্যাসিবাদছায়া স্পষ্টতর হয়ে উঠবে, উঠতে বাধ্য। অনেক আগে জাঁ পল সার্ত্ৰ বলেছিলেন, পুঁজিতান্ত্রিক সঙ্কটের সময় জনগণ যদি আন্দোলনে না থাকেন, ফ্যাসিবাদ আসবেই, ঠেকানো যাবে না।


কপিরাইট ভাস্কর পাল কর্তৃক সংরক্ষিত