মুখোমুখি বিতস্তা ঘোষাল



মুখোমুখি বিতস্তা ঘোষাল


সম্পাদক: সকলের আগে ত্রৈমাসিক রংরুটের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। রংরুটের এই বিশেষ সংখ্যায় আপনাকে স্বাগতম। প্রথমেই যে বিষয়টি জানতে চাইবো সেটি হলো, কবিতাই বা কেন? অর্থাৎ কবিতা ছাড়া আরও তো অনেক বিষয় রয়েছে সাহিত্যের। সেখানে কবিতা নিয়ে আপনার আগ্রহের উৎস কি? এবং মোটামুটি ভাবে জীবনের কোন পর্যায় থেকে এই আগ্রহের সূত্রপাত।

বিতস্তা ঘোষাল: প্রথমেই জানাই ধন্যবাদ। তারপর আসি প্রশ্নের উত্তরে। আমি কবিতা লিখি ঠিকই, কিন্তু যদি কেউ জানতে চান আমার আগ্রহের বিষয় কোনটা, তাহলে একমাত্র কবিতাই-এ কথা বলতে পারব না।বরং আমার লেখার জগতে প্রবেশ গল্প লেখা দিয়ে। তারপর ঘটনাচক্রে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় কেতকী পত্রিকার সম্পাদক, কবি ও অনুবাদক মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের। জ্যেঠু দীর্ঘকাল ধরে আমার বাবা শ্রী বৈশম্পায়ন ঘোষালের সম্পাদিত অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা অনুবাদ পত্রিকায় অনুবাদ করতেন। তাঁর মনে হয়েছিল, বৈশম্পায়ন বাবুর মেয়ে যখন তখন কবিতা তাঁর রক্তে থাকবেই। বাবা খুব ভালো কবিতা লিখতেন, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না, কিন্তু আমি ছোটো থেকে কখনোই কবিতা লিখিনি, এবং কোনোদিন লিখব এটাও ভাবিনি।এমনকি কখনো সাহিত্য জগতের সঙ্গে যুক্ত হব এটাও কল্পনা করিনি। আমি ছিলাম একনিষ্ঠ পাঠক, যা পেতাম তাই গোগ্রাসে গিলতাম। গল্প, উপন্যাসই বেশি। তার সঙ্গে কবিতা। 


পড়াশোনা শেষ করে কলেজে অধ্যাপনা, পাশাপাশি অনুবাদ পত্রিকার দপ্তরে যাতায়াত। লেখার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না। কিন্তু মানুষ যা ভাবে তা তো হয় না। কিছু কিছু জিনিস পূর্ব নির্ধারিত থাকে।আমার ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। বাবা আমার জন্মের আগেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, আমি লেখক হব। আর আমি তা এড়োবার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেছি। কিন্তু ওই যে একটা ক্ষেত্র থাকে, যাকে নিয়তি বলে, সেই যোগটা ছিলেন মোহিনীমোহন জ্যেঠু। তিনি দিন রাত ফোন আর চিঠি দিয়ে দিয়ে আমাকে বাধ্য করলেন কবিতা লিখতে। সালটা ২০০৩। সেই শুরু।তবে আমি আজও বিশ্বাস করি আমার একটি কবিতাও কবিতা হয় না।          


সম্পাদক: এবারে আসি আপনার নিজের লেখার বিষয়ে, কোন বিশেষ লেখকের প্রভাব সম্বন্ধে আপনি কি সচেতন? যেমন, অনেকেই আমরা আমাদের খুব প্রিয় লেখকের দ্বারা মনের অজান্তেই প্রভাবিত হয়ে পড়তে পারি। আবার অত্যন্ত সচেতন ভাবে প্রিয়তম লেখকের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার প্রয়াসও করতে পারি। আপনার নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক কি রকম?

বিতস্তা ঘোষাল: যেহেতু লিখব এই ভাবনাটাই ছিল না, তাই লিখতে শুরু করার পর বা অজান্তেও কারোর প্রভাব পড়েনি। আর কবিতা একটা নদীর মতো। সে নিজস্ব ছন্দে বয়। তাকে যদি কারোর মতো চলতে হয় তবে তা আর যাই হোক কিছু শব্দ হয় হয়তো, কিন্তু কবিতা হয় কিনা আমি জানি না। এখন আমার জানা নেই কেউ না চাইতেও কারোর প্রভাব পড়েছে কিনা! সেটা পাঠক বলতে পারবেন। অবশ্য আদৌ আমার কবিতা কেউ পড়েন কিনা তাও আমি জানি না।   


সম্পাদক: কবিত লেখার বিষয়ে, আপনি কি আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশেই বিশ্বাসী, নাকি মহাকবি টি এস এলিয়টের সেই বিখ্যাত উক্তির মতো আপনিও বিশ্বাস করেন, “Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the expression of personality, but an escape from personality. But, of course, only those who have personality and emotions know what it means to want to escape from these things.”  এলিয়ট কথিত এই যে ব্যক্তিগত আবেগ ও আপন ব্যক্তিত্বের বদ্ধ আবহাওয়া থেকে মুক্তির আনন্দই কবিতা, আপনার কবিজীবনের পর্বে এরকম অভিজ্ঞতা ঘটেছে কি কখনো?

বিতস্তা ঘোষাল: সাধারণ ভাবে কবিতার যদি সংজ্ঞা দিতে বসি, তবে কবিতা হল কবির উপলব্ধিজাত এক বিশেষ শিল্পভাবনা বা  সৃষ্টি। মনের  জগতে, যা আগে ভাবের মধ্যে ছিল, বস্তু হিসেবে ছিল না, কবি তাকেই নতুন রূপ দেন। ইংরেজিতে একটা প্রবচন আছে, ‘কবিরা তাদের নিজেদেরই সঙ্গে কথা বলেন, আর আমরা, পাঠকেরা আড়াল থেকে সেই কথাগুলো শুনে ফেলি। অর্থাৎ কবিতা আর কিছুই নয়, কবিদের স্বগত-সংলাপ মাত্র’। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এই বিষয়ে একটা অসাধারণ বই আছে। কবিতা কি ও কেন?, এই গ্রন্থে এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘কবিতা এই বস্তুপৃথিবীর গোপন সৌন্দর্যকে গুণ্ঠনমুক্ত করে দেখায়, এবং এমন ভাবে দেখায় যে, যেসব বস্তুকে আমরা চিনি তাদের ও যেন অচেনা ঠেকতে থাকে’। কবিতা আসলে শব্দ নিয়ে খেলা করা।  তা কোনো শব্দ নির্বাচন ও কোন বিশেষ ভাষা বা বিশেষ ভাবনা কিংবা বিশেষ বিষয়বস্তুর মধ্যে আটকে থাকবার ব্যাপার নয়। কবিতা তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, যায়ও। বস্তুত, কোন কবিতার মধ্যে কোন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ যখন আড়ষ্ট, অপ্রতিভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এবং কবিতাটিকে তার লক্ষে পৌঁছে দিতে বিন্দুমাত্র সাহায্য করে না, তখন মনে হয়, শব্দ নির্বাচনে অন্তত সেই কবিতাটিকে নির্মাণ করবার সময় কবির খামতি আছে। জীবনানন্দ দাশের লেখা ‘কবিতার কথা’ গ্রন্থ থেকে  উদ্ধৃতি ব্যবহার করে বলা যায়-“কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মরমে থাকবে পরিচ্ছন্ন কাল জ্ঞান”। কবি এলিয়টের যে উক্তিটি এখানে ব্যবহৃত করা হয়েছে সেই এলিয়ট কিন্তু পাশাপাশি এও বলেছেন, ‘কবিতা রচনা হলো রক্তকে কালিতে রূপান্তর করার যন্ত্রণা।’ যেমন কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভাষায়, ‘কবিতা সব জ্ঞানের শ্বাস-প্রশ্বাস আর সূক্ষ্ম আত্মা।’ আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, আবেগ ও অনুভূতির সংমিশ্রণ না হলে কবিতা কেন, কোনও লেখাই হয় না। তবে কবিতার ক্ষেত্রে আবেগটা বেশি কাজ করে। অন্তত আমার করে। যখন কিছু মাথার উপর চলতে থাকে, বিভ্রান্ত হই, কষ্ট পাই, বা ধরা যাক দারুণ একটা আকাশ, সূর্য যাবার আগে তার সমস্ত রং দিয়ে তাকে সাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, অথবা বৃষ্টিতে একটা মেয়ে ফুটপাথে বসে, তার মা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে কিভাবে মেয়ের মাথা বাঁচাবে, সমাজের কোনও যন্ত্রণাদায়ক ঘটনা, যার জন্য আমি মোমবাতি মিছিলে হাঁটতে পারলাম না, কিন্তু বুকের মধ্যে তা অহরহ ধাক্কা মারছে, কিংবা কাউকে দেখে, কিছু দেখে মুগ্ধ হলাম, প্রেমে পড়ে গেলাম,অথচ জানি সেই প্রেম কখনো হবে না তখন হয়তো গল্প লিখতে পারলাম না। তা কেবল কবিতার মত ধোঁয়া ধোঁয়া শব্দের ভান্ডার দিয়ে বন্দী রাখলাম। আমার অধিকাংশ লেখাই এভবাবেই উঠে আসে।তা তাই কখনোই খাতায় কলমে লেখা হয় না। মোবাইলে লেখা হয়। সেখানেই তার শুরু সেখানেই তার শেষ। তবে এর যথার্থ উত্তর অবশ্য  নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী দিয়েছেন, অম্তত আমার মনে হয়েছে এটা এক্ষেত্রে  প্রযোজ্য। সব কবিরই কবিতা লেখার পিছনেই হয়তো এমন কিছু কাজ করে। তিনি বলেছেন- ‘কীভাবে তৈরি হয়ে ওঠে কবিতা? অর্থাৎ একটি শব্দের আহ্বানে কিভাবে আরেকটি শব্দ তার পাশে এসে দাঁড়ায়, কোনও দৃশ্য উক্তি পরিস্থিতি কিংবা ঘটনা সম্পর্কে কবির অনুভুতি কিংবা মানস প্রতিক্রিয়া কীভাবে পরস্পরের-সঙ্গে-অবিচ্ছেদ্যভাবে-আবদ্ধ শব্দমালার মধ্য দিয়ে উন্মীলিত হতে থাকে, সেই শব্দমালা কিভাবে- ভেতর থেকে ঠেলা খেয়ে - একটি পঙতি থেকে আর একটি পঙতিতে গড়িয়ে যায়, দশ বিশ তিরিশ কি পঞ্চাশটি পঙতির সমবায়ে কীভাবে গড়ে ওঠে একটি ফ্রেম, এবং সেই ফ্রেমের মধ্যে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবনার মুখশ্রী কীভাবে উঁকি দেয়- এই প্রশ্নের উত্তর জানা কি একান্তই জরুরী’?


সম্পাদক: এলিয়টের প্রসঙ্গই যখন উঠল, উনি কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, “Honest criticism and sensitive appreciation is directed not upon the poet but upon the poetry.”  আপনার কবিতা লেখালেখির জীবনপর্বের অভিজ্ঞতায় আপনিও কি এলিয়টের সাথে একমত। কবি নয়, কবিতাই হোক আলোচনা সমালোচনার বিষয়বস্তু। যদিও আমাদের সাহিত্য সমাজে কবিতা ছেড়ে কবিকেই সমালোচনার বিষয় করে তোলার ঐতিহ্য অনেক সুপ্রাচীন। একজন সংবেদনশীল কবি হিসাবে আপনার প্রতিক্রিয়া।

বিতস্তা ঘোষাল: আমি নিজেই যেখানে সন্দিহান আমার কবিতা নিয়ে, সেখানে সমালোচকরা তার কাটা ছেড়া করবে এটা স্বাভাবিক। অধিকাংশ সময় নিজের কবিতার মানে নিজেই বুঝে উঠতে পারি না। কেউ হয়তো কোথাও পড়ে জানালেন, দারুণ লেখা, আমি তখন নিজের মনেই হাসি, তার মানে দুর্বোধ্য একটা কিছু হয়েছে, যা তার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে, তাই ভালো বলছেন। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমি জানি আমার একটা কবিতাও আর যাই হোক কবিতা নয়। নিজেকে যেহেতু কবি বা কবিতা এসবের মধ্যে আটকে রাখতে চাই না, তাই সমালোচনা কি নিয়ে করল, কবি না কবিতা সেটা নিয়েও মাথা ঘামাই না। যদি সত্যি কখনো কেউ আমাকে বা আমার কবিতা নিয়ে তীব্র আক্রমণ করে তবে জানব, তিনি অন্তত পড়তে চেষ্টা করেছেন লেখাগুলো।তাতে একটু হলেও উর্ত্তীর্ণ হয়েছি, তাই এমন প্রতিক্রিয়া।না পড়লে তো কোনো প্রতিক্রিয়া আসতে পারে না।আমার জ্ঞানতো কোনো শত্রু নেই।     


সম্পাদক: আপনি বহুদিন ধরেই অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন। নিয়মিত অনুবাদ সাহিত্যের পত্রিকা প্রকাশ করছেন। এই বিষয়ে আপনার অনুপ্রেরণার উৎস কি?

বিতস্তা ঘোষাল: পত্রিকা শুরু করেছিলেন বাবা। তিনি চেয়েছিলেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংহতি বজায় রাখতে, আর তাই তাঁর হাতিয়ার ছিল অনুবাদ। কার তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশে দেশে রাজ্যে রাজ্যে ভাষায় ভাষায় বিরোধ দূর করতে পারে একমাত্র অনুবাদ। অনুবাদ ছাড়া আর কিছুই মানুষে সঙ্গে মানুষের মেল বন্ধন ঘটাতে পারে না। ১৯৭৫ সালে তিনি তাই অনুবাদ পত্রিকা শুরু করেন। পরবর্তীকালে বাবা অধ্যাত্ম সাধনায় মগ্ন হলেন, সব কিছু থেকে নিজেকে নির্বাসিত করে একটা ঘরে বাকি জীবন আবদ্ধ থাকলেন আলোর খোঁজে। সালটা ১৯৯০। এরপর বাবার অফিসের অন্যান্যরা পত্রিকা সামলেছেন। আমি প্রথমে দুহাজার দুই সালে অফিসে যাতায়াত শুরু করি এবং লক্ষ করি বাবার স্বপ্নটা কিভাবে ভেঙে যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই ধীরে ধীরে এই অনুবাদ সাহিত্যের বিশাল জগতটাকে আবিষ্কারের নেশায় মাতি। সম্পাদক হই ২০০৯ সালে। কাজেই বাবার কাজটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই আমাকে অনুপ্রেরণা বলুন, উৎসাহ বলুন, এই কাজে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিল।         


সম্পাদক: আমাদের বাংলা সাহিত্যে অনুবাদের দিকটি বিশেষ ভাবেই অবহেলিত বলেই মনে হয় সাধারণত। আমাদের অতিরিক্ত ইংরেজি নির্ভরতাই তার মূল কারণ। ইংরেজি অনুবাদেই আমরা ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের আস্বাদ পেয়ে যাই। ফলে সরাসরি বাংলায় অনুবাদের দিকটি মূলত উপেক্ষিতই থেকে যায়। বর্তমানে আপনারা যাঁরা সরাসরি বাংলায় অনুবাদের বিষয়ে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, এই বিষয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতার ছবিটি যদি তুলে ধরেন। এবং এই বিষয়ে বাঙালি পাঠকের এবং অনুবাদকদেরও আগ্রহ কতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনে দিনে?

বিতস্তা ঘোষাল: হ্যাঁ। এই বিষয় নিয়ে বাবা নিরন্তর পরিশ্রম করেছিলেন। বহু অনুবাদক তৈরি করেছেন, মূল ভাষা থেকে যাতে অনুবাদ হয় তার জন্য বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ করেছেন। মূল লেখক ও অনুবাদকের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে দিয়েছেন বারবার। কিন্তু তার পরেও তো পৃথিবীর এত ভাষা জানা কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। মানুষ সেই ভাষাটাই শিখতে চাইবে যা তাকে ভবিষ্যতে রুটি বা অর্থ দেবে। যে ভাষার চর্চা কেবল মনের তৃপ্তির জন্য তা ক’জন শিখবেন! আর ইংরেজি এমন একটা ভাষা যা আজকের পৃথিবীকে সহজেই কানেক্ট করে। তাই মানুষ নিজের সাহিত্য পিপাষা মেটাতে এর দ্বারস্থ হতে বাধ্য।  তবু আমি বলব, অনুবাদ যারা করেন তারা একেবারেই নিঃস্বার্থভাবে ভালোবসে করেন। আর এই সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে। পাঠকরাও এখন অনেক বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনুবাদ পাঠে। তবে অনুবাদ সাহিত্য কখনোই মৌলিক লেখার সমতুল্য জনপ্রিয়তা এদেশে পায়নি, কিন্তু আশা করতে তো অন্যায় নেই। একটা মানুষ দেশকে বাধবে এক সূত্রে অনুবাদের মাধ্যমে বলে একটা পত্রিকাই শুরু করলেন ১৯৭৫ সালে যখন দুনিয়া আমাদের মুঠোর মধ্যে ছিল না। তার সেই কাজটাকে ছড়িয়ে দেওয়াটাই আমার ধর্ম, যে যেখানে যাই অনুবাদ করুক না কেন স্বপ্ন তো সেটাই শেষ পর্যন্ত।       


সম্পাদক: একটি ভাষার সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ অন্য একটি ভাষার সাহিত্যে অনুবাদ কতটা দুরূহ বলে মনে করেন আপনি। কারণ ভাষা শুধুই যে ভাব বা তথ্য বহন করে, তা তো নয়। ভাষা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও বহন করে। বিশেষত সাহিত্যচর্চায়। সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অন্য একটি ভাষার সংস্কৃতিতে যথাযথ ভাবে তুলা ধরা সত্যিই কতটা সম্ভব?

বিতস্তা ঘোষাল: দেখুন অনুবাদ কখনোই মূল ভাষার যে সাহিত্য, তাতে বর্ণিত সংস্কৃতি, সমাজ, অর্থনীতি, বা যেদিক দিয়েই বলুন সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারে না। কার প্রতিটি মানুষের, সভ্যতার, সংস্কৃতির, জীবন ধারণের ইতিহাস আলাদা আলাদা। তাই হুবহু অনুবাদ করলে হয়তো জানা হল, কিন্তু মনের গভীরে ধাক্কা দিল কিনা সেটা ভাবার। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে সেই ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনুবাদ করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হয়। ধরা যাক, কোনও একটি বিশেষ ফুল বা ফল কেবল সেই দেশেই হয়, এখন আমি যদি সেই নামটাই রাখি পাঠক বুঝতে নাও পারে। কিন্তু যদি তার সঙ্গে মিল আছে এমন কোনো নাম আমি ব্যবহার করি বোঝাটা সহজ হবে। তবে অনুবাদ নিয়ে অনুবাদ কেমন হবে, আক্ষরিক না ভাবানুবাদ এই বিতর্ক যবে থেকে অনুবাদ সাহিত্যর সৃষ্টি তবে থেকেই। কাজেই এই প্রসঙ্গ যেমন উঠবে তেমনি অনুবাদের কাজটাও নিরন্তর করে যেতে হবে। কার একমাত্র অনুবাদই পারে পৃথিবীর সব ব্যবধান ঘুচিয়ে যোগসূত্র তৈরি করতে।      


সম্পাদক: কবিতায় অনেকেই দিন বদলের স্বপ্ন দেখেন। এবং দেখান। বিশ্ব কবিতার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে সেটি অনুভব করা যায়। এই সময়ের একজন কবি হিসাবে এই দিন বদলের স্বপ্ন দেখা ও দেখানোর বিষয়টি কিভাবে ধরা দেয় আপনার অন্তরে?

বিতস্তা ঘোষাল: কবিতায় দিন বদলের স্বপ্ন পৃথিবীর আদিমতম কবি বাল্মিকী থেকে শুরু করে ইলিয়াড ওডিসি, হোমার সকলেই দেখেছেন। মাও সে তুন, হিটলার, সম্রাট বাবর, তুকারাম,  রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত,সু ভাস মুখোপাধ্যায়, যাকেই দেখি না কেন তাঁরা সকলেই কবিতাকেই প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে তুলে নিয়েছেন। পরাধীন ভারতে মানুষের মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন বপনের ক্ষেত্রে গান আর কবিতাই ছিল সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। পৃথিবীর যে কোনও দেশে যেখানেই বিপ্লব এসেছে তার সুচনা করেছেন কবিরাই। এ জন্য বহু কবিকে হত্যা করা হয়েছে, আজও রাষ্ট্র সবচেয়ে ভয় পায় কবির কলমকেই। তাঁকে মেরে, হুমকি দিয়ে, জেলে পুড়ে স্তব্ধ করতে চায় যে কোন রাজনৈতিক দল। সে ক্ষমতায় থাক না থাক এই একটি বিষয়ে ব্যতিক্রম নেইকিন্তু কবির তো মৃত্যু নেই। আমি একবার একটা কবিতা লিখেছিলাম, গোত্রহীন জন্ম গাঁথা থেকে /তোমার সঙ্গে সহবাস।/তোমার কাছে রেখে আসি বিষাদ/যন্ত্রণার ভাষা ঠিক করে দাও তুমি/ কার কাছে যাব নির্বাপিত আলোর খোঁজে/ জ্বলে ওঠো অতল গহ্বরে,/পাতাল দেখো- কবিতাই অবিনশ্বর।

আরেকবার ব্রেখটের জীবনী পড়ার পর লিখলাম- বেয়াব্রু উঠোন ভেঙে /জ্যোৎস্না ছায়া খোঁজে/ঘূণ ধরা দেওয়াল নীরবে শব সাজায়/সেখানে শুয়ে কবিদের লাশ/ভাষাহীণ অশরীরী দেহ থেকে /চন্দন জলে রাখে পা/ প্রশ্ন করে- ভালো আছো তো! এখন এই প্রশ্নটাতেই আতংক। আর এখানেই কবির স্বপ্ন লুকিয়ে।

আমি খুব সামান্য লিখি। তাছাড়া আমার জন্মের পর এমন কোনো অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এখানে ঘটেনি যা থেকে আমি ভাবতে পারি আমার কবিতায় দিন বদল ঘটে যাবে। আপনি বলতে পারেন নন্দীগ্রাম বা সিঙুর...। তা মেনে নিয়েও বলব আমাদের নাগরিক জীবনে সেইভাবে প্রভাব পড়েনি। তাতে ক্ষমতার পালা বদল হতে পারে, কিন্তু অস্তিত্ববোধ বিলুপ্ত হয়নি। কিন্তু যাদের ঘটেছে তারা আমি নিশ্চিত কবিতাকেই হাতিয়ার করেছেন প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে।              


সম্পাদক: আপনার নিজের লেখার বিষয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, একটি গণ্ডীর ভিতরেই আটকিয়ে যাচ্ছে আপনার যাবতীয় লেখালেখি। সাধারণত আমাদের অধিকাংশই কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে আত্মনির্মিত নিজস্ব গন্ডীর ভিতরেই আটকিয়ে যাই। অনেকেই হয়তো খেয়াল করি না। আবার অনেকেই হয়তো সচেতন ভাবে সেই গণ্ডীর ভিতর থেকে নিজেকে মুক্ত করতে প্রয়াসী হন। আপনার লেখালেখি ও আপনার ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত যদি করেন।

বিতস্তা ঘোষাল: আসলে প্রতিটি মানুষ যারা লেখালিখি করেন আমার বিশ্বাস তারা সারা জীবন ধরে একটি লেখাই লিখে চলেন, তার নানা পর্ব গল্প, কবিতা, উপন্যাস এসব ফর্মে উঠে আসে। কিন্তু যদি খুব ভালভাবে দেখা যায় সেটা হয়ত আদতে একটাই। মার্কেজ নিঃসঙ্গতার একশো বছর লেখার পর এটা বলেছিলেন। আমরা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা আকর থেকেই চরিত্র নির্মান করি, ভাঙচুড়, কাটা ছেড়া চলে। এখন সেটা কতটা এক গন্ডীতেই আটকে থাকা সেটা লেখক বোধহয় বুঝতে পারেন না। আমার নিজের ক্ষেত্রে যেমন একজন মূল চরিত্র থাকেন যিনি লেখার বিশেষ করে উপন্যাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এটা যে আমি সবসময় সচেতন ভাবে করছি তা নয়, কিন্তু অলক্ষ্যে আমার দর্শন, জীবনবোধ, ভাবনা, এগুলো ‘তার’ দ্বারা প্রভাবিত। তাই সে আমাকে দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো লেখাচ্ছে। যদি দরকার না থাকে তবে আসবে না। এই ‘তার’ টা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না’। এই চেনাটার-জানাটার খোঁজ একজন লেখকের মনে সব সময় থাকবে। তাই জন্যেই হয়তো সে আসছে। তাকে অস্বীকার করব কী করে!       


সম্পাদক: সবশেষে এসে জানতে চাইবো আপনার ব্যক্তিগত সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি সমসাময়িক কার কার কবিতাচর্চা আপনাকে বিশেষ ভাবে উদ্বুদ্ধ করে, যেখান থেকে বাঙলা কাব্যসাহিত্যের অদূর ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আপনি প্রবল ভাবে আশাবাদী ভুমিতে অবস্থান করতে পারেন।

বিতস্তা ঘোষাল: অনেকেই ভালো লিখছেন। অন্তত চেষ্টা করছেন। কারোর নাম নেওয়াটা বোধহয় ঠিক নয়। কারন যদি নিজেকে লেখক ভাবি তবে আমারও কিছু দায় আছে সাহিত্যকে দেবার। আগে সেটা পূর করার যোগ্য হই, তবে কে থাকবে আর কে থাকবে না তার বিচার পাঠকের। প্রতিটি লেখকের এক এবং অতি অবশ্যই কর্তব্য তাঁর নিজের কাজটা যথাযথ ভাবে করে যাওয়া। বাকিটা ‘কর্ম করে যাও ফলের আশা কোরো না’।


বিতস্তা ঘোষাল:  প্রকাশক- ভাষা সংসদ, সম্পাদক- অনুবাদ পত্রিকা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, গবেষণামূলক লেখা - । গ্রন্থের সংখ্যা -২৮। দুই বাংলা থেকে পুরস্কারও একাধিক। বিতস্তা ঘোষালের জন্ম কলকাতায়। মনিপুরী ও রবীন্দ্র নৃত্য শিল্পী বিতস্তা কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম এ, রবীন্দ্র ভারতী থেকে বি লিস পাশ করে প্রভাস রায় পলিটেকনিক কলেজে অধ্যাপনা করেন বেশ কিছুদিন। ভাল না লাগায় ছেড়ে দিয়ে লেখালিখি ও সাংবাদিকতা। অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকার’ বর্তমান সম্পাদক। নিয়মিত অনুবাদ চর্চার পাশাপাশি মৌলিক লেখাও অব্যহত। দুই বাংলার একাধিক পত্রিকার নিয়মিত লেখিকা বিতস্তার কবিতা ও গল্প ইংরেজি, ওড়িয়া ও হিন্দিতেও অনূদিত হয়েছে। ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমির ‘ইন্ডিয়ান লিটেরেচার’তেও তার কবিতা অনূদিত। ৩টি গল্প গ্রন্থ, ৫টি উপন্যাস ও ৪টি কবিতাসলকলন সহ ৫টি অনুবাদ সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। পেয়েছেন একাধিক সাহিত্য পুরস্কার।

কপিরাইট রংরুট কর্তৃক সংরক্ষিত




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন