নাসির ওয়াদেন : সাহিত্য নদীর ধারা, বাঁক ভেঙে চলেছে সমুখ পানে




সাহিত্য নদীর ধারা, বাঁক ভেঙে চলেছে সমুখ পানে
              

যেকোনো ভাষায় সাহিত্য রচিত হয়ে থাকে সেই এলাকার নিজ ভাষাভাষী অধিবাসীদের নাগরিকদের কৃষ্টি,কালচার,আচার,আচরণ ভাব, ভালোবাসা ও তাদের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা প্রবাহ থেকে। তার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায় সেই ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ও সামাজিক তথা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।যুগের ও সময়ের প্রেক্ষিতে মনন চর্চা ও সৃষ্টির প্রকরণের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের সুললিত ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়ে চলে এঁকেবেঁকে গতিপথ পাল্টিয়।এই পরিবর্তন বাঁক বদল কালের প্রেক্ষিতে শুধু নয়,মানুষের রুচিবোধ,চিন্তাবোধ,পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া সামাজিক কার্যকলাপ এবং ভাবনার উদ্রেকে পুষ্টতা লাভ করে।যুগের একটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সেই সাহিত্যের অঙ্গনে সূর্যোদয়ের আভার মত উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে থাকে‌।

   
ভারতীয় সভ্যতা দীর্ঘদিনের,দীর্ঘ জীবনের সেই আদিকাল থেকেই সাম সংগীত,মানুষের মনের ভেতর চর্চিত মনন চর্চার শুরু।সেই সময় থেকে কালের প্রবাহ স্রোতে পাখির কুজনের তালে তালে উন্মত্ত বর্ষাতি নদীর ঘোলা তরঙ্গের অফুরান আবেগ আর আকুতি নিয়ে ভেসে যায় জীবন ও কার্যকলাপে।সেই মননভূমিতে সুর ও স্বরের দ্যোতনা শিশির-ঝরা ভোররাতের স্নিগ্ধতা আনে বয়ে।
  
বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি অনেকদিনের।প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি সাহিত্য বিদগ্ধ গুরুগম্ভীর কিছু জ্ঞানী ব্যক্তির মধ্যে সীমায়িত ছিল,যা পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পাথর নি:সৃত ঝর্ণাধারার শীতল আবেগ নিয়ে বয়ে চলেছে দিগন্তে নতুন অধ্যায় দিকে।দশম-দ্বাদশ শতকে চর্যাপদাবলী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি সূত্রপাত ঘটে।সাহিত্যরস নানারকম স্বাদ নিয়ে উপস্থাপিত হলেও সকল শিক্ষিত ও সুধীজনের,অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সর্বস্তরের গ্রহণযোগ্য না হলেও রাজানুগ্রহ পুষ্টি ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এবং রাজন্যবর্গ সংস্কৃত ভাষাকে গ্রহণ করে এবং সংস্কৃত সাহিত্যের উদ্ভব ঘটে।ভাব প্রকাশে বাহন রূপে সংস্কৃত সাহিত্য একটা দখল করে।মৌর্য,গুপ্ত,বর্মন,পাল ও সেন যুগে ভাষার কদর ও অভিজাত্ত ছিল।বাঙালি লেখকদের প্রথম ভাষা ছিল সংস্কৃত।তখনো আঞ্চলিক স্তরে মানুষ নিজেদের তৈরি ভাষা দিয়ে কথাবার্তা,আচার-আচরণ,অনুষ্ঠান,ক্রিয়াকলাপাদি সম্পন্ন করত।সেই কথ্য ভাষা কোন স্বীকৃতি বা সাহিত্য রূপ ছিল না বলেই সেই ভাষা যথাযথ মর্যাদা পায়নি।এছাড়া,পূর্বভারতে খৃষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত শৌরসেনী প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ছিল ব্যবহার্য ভাষা।কিছু কিছু কবি এই ভাষাতেও কাব্য চর্চা করেছেন।এই ভাষার ভেতর দিয়ে বাঙালির মানস,সামাজ জীবন,প্রেম ভাবনা, প্রকৃতি চেতনা সাহিত্যে ঠাঁই পায়।পরবর্তীতে গীতিকবিতা,রাধাকৃষ্ণ লীলা,রামকথা, নাট পালা গীতি ও মঙ্গলকাব্যে সামাজিক,অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক চিত্রের খোঁজ মেলে,যার মধ্যে সাহিত্যরস পরিপূর্ণ থাকায় প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্য আহরণ করা হয় না।ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতক বাঙালির সাহিত্যের আকাশে এক অন্ধকার যুগ। বঙ্গে তুর্কি আক্রমণ ও তুর্কি শাসনের ফলে বাংলা সাহিত্য স্থিমিত হয়ে পড়ে।পঞ্চদশ শতকের ঊষালগ্নে নতুন আলো উদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমাজ জীবনে। দুর্ভার আলো এসে পড়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রভূমিতে,'শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন' 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' কাব্যের সাথে সাথে ইসলামী প্রণয়কাব্য ইউসুফ জোলেখার প্রকাশ ঘটে।ফলে হিন্দু মুসলমান দ্বৈতজাতির প্রেম-প্রণয় ঘটিত কাহিনী সন্নিবেশে মিলন সেতু রচিত হয়।
    
শিলালিপি,তাম্রলিপি,রাজানুশাসন,পত্রাবলী ইত্যাদির মাধ্যমে মৌর্যযুগ থেকেই আর্যভাষা সংস্কৃত এদেশে প্রবেশ করে।খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সংস্কৃত,প্রাকৃতে রচনার সন্ধান পাওয়া যায়,পরবর্তী শতকে বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়ে মহারাজ চন্দ্রবর্মার শিলালিপি থেকে কিছু তথ্য মেলে।সাধারণত ঈশ্বর বন্দনা,দেবদেবীর প্রেম কাহিনী, মাহাত্ম্য বর্ণনার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের গতিপথ প্রবাহিত হয়ে এসেছে। লক্ষ্মণসেনের সভাকবি হিসেবে জয়দেব,উমাপতি ধর,সরণ,ধোয়ী ও গোবর্ধন আচার্য কবিগণ রাজ্যসভা অলংকৃত করেছিলেন।কবি জয়দেবের 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যকে সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।এই সময়কালে 'চর্চা পদাবলী'র সাথে সাথে সরহ পাদ ও কাহ্নপাদ অপভ্রংশ বা শৌরসেনী অবহটঠে দোহা রচনা করেন।গাহা মত্ত সঈ ও প্রাকৃত পৈঙ্গল ভাষায় রচিত পদও বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে।মধ্যযুগকে অন্ধকার যুগ বলা হলেও সেই অন্ধকার আকাশে স্তিমিত তারকারাজির ভেতরে জীবিত তারার উদয় ঘটেছে।চর্চার পরবর্তী সময়কালে বাংলাসাহিত্য নিজস্ব গঠন ও শৈলী ধারণ করে।শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর লেখক বড়ু চন্ডীদাস সাহিত্যের নতুন উন্মেষ ঘটায়। কাব্যে প্রেমলীলা,ঈশ্বরমহিমাএকত্রে সন্নিবিষ্ট হয়ে এক নতুন মাত্রা এনে স্বাদের পরিবর্তন ঘটায়। ডঃ সুকুমার সেন ভাষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই কাব্যে পশ্চিম বাংলা আঞ্চলিক ভাষার উপাদান খুঁজে পান,সেই সঙ্গে বাংলা দক্ষিণ-পশ্চিম প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাষার বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছেন।লোকায়ত জীবন চর্চার মরমী দৃশ্যও তার মধ্যে সন্নিবিষ্ট।

পরবর্তী সময়ে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের জীবিকা ও জীবিকা বহির্ভূত মানসিক ঐতিহ্যের সমস্ত পর্য়ায়ের সাথে কৃত্তিবাসী রামায়ণ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রামায়ণের চরিত্রে বাঙালি জাতির চরিত্রগুলি মিলেমিশে একাকার।কাশীরাম দাসের মহাভারত থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্যের প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য ধীরে ধীরে তার পলিমাটিকে শক্ত মাটিতে রূপান্তরিত করে।বাংলামাটির অন্যতম সম্পদ মঙ্গলকাব্য, যেগুলির মধ্য দিয়ে বাঙালির জীবনচর্চা,আচার-অনুষ্ঠান,কৃষ্টির অভূতপূর্ব নিদর্শন মেলে।আর্যদের আগমনের ফলে আর্য সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি ঘটে,আদিবাসী জনজাতির কৃষ্টি-কালচারে অনুপ্রবেশ ঘটে এবং নতুন সমীকরণ দেখা যায়।আর্যসমাজের সংস্কারে দীক্ষিত মানুষ ধর্মের প্রতি আসক্ত ছিল,রক্ষণশীল সমাজ স্ত্রী সমাজে লৌকিক দেবদেবীর পূজার প্রচলন ঘটায়। সেই ধারা অনুসরণ করে নানাপ্রকার ব্রত,প্রজনন শক্তির উপাসনা ও ব্রত নির্ভর হয়ে পড়ে।লোকসংস্কৃতি জনজীবনের উপাদান থেকে সংগৃহীত মননের ফসল।
    
ভারতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার সময়ে তাদের অভিযান ও অধিকারের ফলে ভারতীয় সমাজ,সংস্কৃতি ও ধর্মের উপর প্রভাব ও পরিবর্তন সূচিত হয়।ইসলামী শাসনের ফলে সমাজজীবনে মুসলিমীকরণ ঘটে।ধর্মান্তরবাদ সমাজে বিপুল সাড়া ফেলে, নানান কারণে অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ইসলামের উদার সৌভাত্বের আহবানে সাড়া দিয়ে উচ্চবর্ণ থেকে নির্মিত নিম্নবর্গের মানুষ মিলিত হয়ে নয়া উপাদান গ্রহণ করে।  আমের ইসলামের উদার সৌভ্রাতৃত্বের আহবানে সাড়া দিয়ে উচ্চ হিন্দু থেকে ঘৃণিত নিম্নবর্গের মানুষ মিলিত হয়ে নয়া উপাদান গ্রহণ করে,নতুন ভাবধারা তৈরি হয় সমাজে।উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে উলেমা,ফকির,গাজী শহীদ,দরবেশ,মুর্শিদ ইসলামী ধর্মসাধকরা বাংলায় এসে বসবাস শুরু করে।তাদের ধর্মীয় আচরণ,মানবপ্রেম, প্রেমভজনা, ভাষা, কথাবার্তা, পোশাক-পরিচ্ছদ আচারকৃষ্টিতে সামাজিক পরিবর্তন সূচিত হয়।দৌলত কাজী ও সৈয়দ আলাওল ও মুসলমান বৈষ্ণব কবিগণের সৃষ্ট সাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করে।আব্দুল হাকিম'ইউসুফ জুলেখা'নোওয়াজিম খানের 'গুলেবকাওলী' মহম্মদ খানের 'মুক্তার হোসেন' সৈয়দ মোহাম্মদ 'জেবল মুলক শামারোখ' এক রোমান্টিক উদার অসাম্প্রদায়িক কাব্য এবং অভেদ দর্শন তাতে বিদ্যমান। মোহাম্মদ খানের 'সত্যকলি বিষাদ সংবাদ' এক রূপক কাব্য। সত্যের জয়,অসত্যের ও পাপীর বিনাশ উল্লেখিত।
   
এরমধ্যে আরাকান সাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে।বিশেষত এই রাজসভাকে কেন্দ্র করে এক শক্তিশালী কবিগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা বাংলা ভাষাকে সৃষ্টির অন্যতম বাহন হিসাবে গ্রহণ করে, আর যেহেতু বাংলা সাহিত্য ছিল ধর্মীয় আচরণে সম্পৃক্ত,দেবদেবীর আরাধনা ছিল মুখ্য লক্ষ্য তখন মঙ্গলকাব্যে দেবদেবীর মাহাত্ম প্রচারের আড়াল-আবডালের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের সুখদুঃখের কথার ভেতর দিয়ে মূল উদ্দেশ্য ছিল দেবদেবীর মাহাত্মপ্রচার।আরাকান সাহিত্য ধর্মীয় ভাবধারাকে পরিহার করে মানবজীবনের সুখদুঃখ,বিরহমিলন,ব্যথাআনন্দকে মুখ্য করে তুলে ধরে, বাংলা সাহিত্যের রূপান্তর ঘটে।
    
অষ্টাদশ শতকে বাংলা সাহিত্যে কবিয়ালদের কবিগান,লোকায়ত সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে শাক্ত পদাবলীতে মাতৃকাশক্তির প্রাধান্য দৃষ্ট হয়। শাক্তসঙ্গীত সাধনসঙ্গীত হলেও এগুলো বাঙালির হৃদয়ে‌ প্রাণের সরল বাঙালিত্ব লক্ষ্য করা যায়। শাক্তপদাবলী বাঙালির নিজস্ব সম্পদ নিঃসন্দেহে,আগমনী,বিজয়া ও ভক্তের আকুতি তিন পর্যায়ে পদগুলো সন্নিবিষ্ট।
 
"শরতের বায়ু যখন লাগে গায় /উমার স্পর্শ পাই,প্রাণ রাখা দায়/যাও যাও গিরি আন যে উমায়/উমা ছেড়ে আমি কেমন করে রই"।
 
এই সময়কালে বাংলা সাহিত্যে টপ্পাগানেরও উদ্ভব ঘটে। এই গান উনবিংশ শতকের দ্বিতীয় তৃতীয় দশকে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এই গানের বিষয়বস্তু ও সুর সম্পূর্ণ সেকুলার। নায়ক-নায়িকার প্রেমের আবেগকে সাহিত্যে রূপ দেওয়া হয়েছে।

   'সখি মোর স্বপ্নের কারণ প্রিয়সি
    সদা উল্লসিত ভেরি মুখশশী।'

'ময়মনসিংহ গীতিকা' ' পূর্ববঙ্গ গীতিকা' বাংলাসাহিত্যের ভেতর অনুরণন তোলে। নাথ সাহিত্যও লোকসাহিত্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে বাংলা সাহিত্যের গতিস্রোতে তীব্রতা বৃদ্ধি করে।এতে উচ্চাঙ্গের আদর্শ আছে,প্রবৃত্তির বন্ধন ও মোহপাশ থেকে মুক্ত হয়ে আত্মচেতনায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নানা উত্থান-পতনের আদর্শ কাহিনী।আধ্যাত্বিক মহিমা কীর্তিত হলেও মানব জীবনের চিরন্তন দুর্বলতা,নারী মোহ ও ভোগ তৃষ্ণার কথাও অকপটে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তত্ত্বকথা নির্ভর সাহিত্য হলেও সমসাময়িক জীবনের নানা ছবি ও ঘটনাবলীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
  
মুসলমান সমাজের নানান চিত্র ও ঘটনাকেও অবলোকন করে কিছু কিছু মুসলিম কবি তাদের কাব্য রচনার ভেতর দিয়ে সপ্তদশ শতকে এক বৈপ্লবিক সূচনা ঘটায়। আব্দুল হাকিমের 'ইউসুফ জোলেখা' 'লালমতী সয়ফুল মুলক', মীর মোহাম্মদ সফীর'নূরনামা'শেখ চান্দের 'রসূলবিজয়','হরগৌরী সংবাদ',সাদেক আলী 'রামচন্দ্রের বনবাস',শেখ মোহাম্মদ হোসেনের চাণক্য শ্লোক এর অনুবাদ কবিদের ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার পরিচয়,,

ঐতিহাসিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কোরেশী মাগনের ' চন্দ্রাবতী'উল্লেখযোগ্য কাব্য। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত অনুসন্ধান করতে গিয়ে ঐতিহাসিকগণ যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, তার বৈশিষ্ট্যগুলো বাংলাসাহিত্যকে পুষ্ট করেছে। Edward Sapir ,'Language is a purely human and non instinctive method of communicating ideas, emotions and desires by means of a system of voluntarily produced symbols'.
   
গল্প কবিতা নদীর গতিপথের মত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে,এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে।আধুনিক যুগে সাহিত্যের বাঁক বদল হয়েছে বহুবার। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,রামমোহন রায়, মধুসূদন দত্ত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,নজরুল ইসলাম এক নতুন পর্বের সূচনা করেন।পরবর্তীতে রবীন্দ্রোত্তর কবিতা রচনার ক্ষেত্রে কবি জীবনানন্দ দাশ নতুন পথের সন্ধান দেয়, সিম্বলিজম,সুরিয়ালিজম,ইমেজিজম বিভিন্ন নামকরণ করে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা প্রকাশ করে থাকেন।ফরাসি কবি বোদলেয়ারে প্রভাবিত হয়েছেন প্রতীকীবাদকে নিজের কবিতার ভেতর স্থান দিয়ে প্রতীকী কবি হয়ে উঠেছেন।পরবর্তীতে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত,বুদ্ধদেব বসু তারই অনুসারী‌। পরবর্তী সময়ে অলোক সরকার,আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রভৃতি লেখকদের লেখায় আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন সীমানার মধ্যে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, লোক সাহিত্যে,লোকায়ত ধর্মকে কেন্দ্র করে নানান ছবি প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়।
   
বাংলার বুকে খ্রিস্টান মিশনারীদের ছাপাখানা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের নতুন রূপরেখা চিহ্নিত হয়ে যায়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত থেকে শুরু করে আধুনিক কালের জয় গোস্বামী,সুবোধ সরকার প্রমূখ লেখকগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন নানান ভাবে। বিভিন্ন কবি ও লেখকগণ এই সময়ের মধ্যে তাঁদের সৃষ্টি ও সৃজনশীলতা দিয়ে নতুন নতুন ভাবনার মোড়কে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছে নিজ নিজ কর্ম ক্ষেত্রে। উপন্যাসের ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মহেশ্বেতা দেবী প্রমূখ সাহিত্যিকগণের সাহিত্য ভাবনা ও রচনা বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে নতুন নতুন রসদ যুগিয়েছে।
  
আধুনিকতার পথ ধরে উত্তরাধুনিকতা চিন্তা ভাবনার সময়রেখা কিছু কিছু দার্শনিক ও সাহিত্যিকগণ কল্পনায় এনেছেন, যদিও বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের অবকাশে সমাজ ও জাতীয় জীবনে ধর্মীয় অনুপ্রবেশ ঘটে, ফলে রাজনৈতিক অন্দরমহলে নতুন সমীকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মধ্যযুগীয় চেতনা,ধর্মীয় প্রভাবও বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে  রাজানুশাসনের ক্রিয়াকলাপের দৃশ্য দৃষ্টে। সাহিত্য গতিপথে ঝরনা স্রোতের মত বিভিন্ন সময়ে সাময়িকী পত্র-পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সংবাদ প্রভাকর,বঙ্গদর্শন,দিকদর্শন,চতুরঙ্গ বঙ্গসাহিত্য,কালিকলম ,তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, শনিবারের চিঠি, কাফেলা ইত্যাদি পত্রিকা থেকে শুরু করে বর্তমানের দেশ, কৃত্তিবাস ,মাসিক কৃত্তিবাস,নন্দন,কবি সম্মেলন,কবিতা পাক্ষিক ইত্যাদি নানান পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টির বাহন হিসাবে এগুলো চিহ্নিত। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে দ্বিজাতিতত্ত্ব আজও সুকৌশলে সুগভীরে প্রোত্থিত। এক শ্রেণীর সাম্প্রদায়িক ভাবে দেখার কৃতিত্ব বিদ্যমান। মধ্যযুগে মুসলমান সাহিত্যের যে অবদান ছিল, বর্তমানে তাকে লঘু ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতে একশ্রেণীর সম্পাদক অভ্যস্থ। এক সম্পাদক বন্ধু ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে আজও  বাংলার এক শ্রেণীর এলিট সম্প্রদায়, দাড়িওয়ালা লেখক ও সম্পাদকদের অবজ্ঞার চোখে দেখে থাকেন, তাঁদের পত্রিকায় ভালো লেখা প্রকাশ হলেও তা অর্থহীন ও লঘু করে দেখা হয়। এলিট সম্প্রদায়ের সাময়িকী পত্রিকায় মুসলিম কবিদের লেখা প্রকাশ করা হয় না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দোষ এড়ানোর জন্য মুষ্টিমেয় কিছু কবির স্বল্প পরিমাণের কবিতা ছাপিয়ে দায় এড়িয়ে যেতে চান।  কেবলমাত্র শ্রেণীবিভাজনকে সামনে রেখে সুকৌশলে যে কাজ করে যাচ্ছে তা অনেকের চোখে অবলীলাক্রমে দৃষ্ট হচ্ছে।‌ এটাই বাঙালির অপসংস্কৃতি বলে অনেকের ধারণা।
   
এই ক্ষীন দৃষ্টিভঙ্গি, ভাবনা ও বিভেদচিন্তাকে দূরে ঠেলে প্রতিষ্ঠিত পত্রপত্রিকার মুখে আঘাত দিতে ই-ম্যাগাজিন এর আর্বিভাব। বহু প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা যাদের ভাল লেখা প্রকাশ করে না,তারা অতি সহজেই অন্তর্জাল সাহিত্য জগতে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিতে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে চলেছে। কবিতার অপমৃত্যুও ঘটে চলেছে অবিরত। বহু প্রতিষ্ঠিত কবির কবিতা ও গল্প, উপন্যাস আজ মৃতপ্রায়। পাঠকের আকাশ থেকে অন্ধকার রাতের মতো গুটিয়ে যাচ্ছে তাঁদের সৃষ্টি, কবিতা হারিয়ে যাচ্ছে পাঠকের মনের জানালা দিয়ে। প্রতিষ্ঠিত কবির কবিতাও মনের জগতে বিচরণ করতে অক্ষম হচ্ছে ডানাহীন হয়ে। পঠিত হচ্ছে কবির নাম দেখে। অন্তর্জাল সাহিত্যে বহুকবি তার কবিতা,অকবিতা, না-কবিতা প্রকাশ করে মানসিক সান্ত্বনা পাচ্ছে।
 
তাঁরা বাহবা দিক বা না দিক, তাঁদের  কবিতা নিয়ে কেউ দুচার লাইন মন্তব্য না লিখুক, একটা লাইক পড়লে বুক ভরে যায়। তাঁদের কবিতা ক্ষণজন্মা হলেও তাঁদের কোনো দুঃখ হয় না। অন্তর্জাল সাহিত্যে বহুকবি তাঁরা কবি হোন বা না হোন, তাঁদের মনন ভাবনা বিশ্বময় হয়ে উঠছে। মনবল বৃদ্ধি পাচ্ছে বলাবাহুল্য।
  
বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যও এভাবেই গড়িয়ে যাচ্ছে অন্তর্জালের শৈত্যপ্রবাহের মধ্য দিয়ে। সাহিত্য নদীরধারা, নানান বাঁক ভেঙে ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে মহাসমুদ্রের পথে, উসর-ধূসর জঙ্গলকে অতিক্রম করে, মানুষের দুই হাতের আশীর্বাদ নিয়ে এগিয়ে যাবে মহাসাগরে রূপের গভীরতা,জলের সীমারেখাকে ছুঁয়ে । কবিকে নয়,কুর্ণিশ করি কবিতাকে। কবিতা আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করে, মরা গাঙে বান ডেকে আনে, উষর ক্ষেত্রভূমিতে শ্যামল বৃষ্টি ঝরায়।

   "ঝরুক শিশির,পড়ুক স্নিগ্ধতা, হৃদয় যাক ছুঁয়ে
   রানী কবি কবিতা মনি মনকে রাখুক বাঁচিয়ে,,"

    
সাহিত্য নতুন পথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাবে নতুন নতুন তত্ত্ব নিয়ে শূন্য দশকের কবিতা, নতুন দার্শনিক চেতনায় সমৃদ্ধ হবে। শূন্য চিন্তা থেকে নানান মতবাদের উদ্ভব ঘটতে চলেছে আগামীতে।  বিশ্বে মহামারী যেভাবে স্তব্ধ ও স্তিমিত করে তুলেছে সামাজিক,অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক জীবনকে, কবিতাও সাহিত্য ক্ষেত্রেও তেমনি নতুন আলোর ঝরনাধারা ঝরিয়ে দেবে বুকের মাঝারে। কবির প্রত্যাশা কেউ স্বীকৃতি দিক না দিক,

    "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
     তবে একলা চলো রে ",,,

কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত ধরে সুবিশাল কবিতাধ্বজাকে কাঁধে উচ্চে তুলে এগিয়ে চলেছে একশ্রেণীর দুর্বল অকবির দল নতুন জয়ের প্রত্যাশায়।

কপিরাইট নাসির ওয়াদেন কর্তৃক সংরক্ষিত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন