মুখোমুখি শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার



মুখোমুখি শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার


সম্পাদক রংরুট: সকলের আগে ত্রৈমাসিক রংরুটের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। রংরুটের এই বিশেষ সংখ্যায় আপনাকে স্বাগতম। আপনার লেখালেখির সূত্রপাত সম্বন্ধে যদি আলোকপাত করেন। সময়ের পরিধিতে এবং পরিবেশের প্রেক্ষাপটে। জীবনের বিভিন্ন পর্বে কোন কোন বিশেষ ব্যক্তিত্ব আপনার জীবনদর্শনের গড়ে ওঠায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই রংরুট পত্রিকাকে। লেখালেখির সূত্রপাত বলতে গেলে অনেকটাই পিছনে চলে যেতে হবে। কিছুটা খেলাচ্ছলে, কিছুটা নিজেকে প্রকাশের তাগিদে শুরু হয়েছিল ছন্দে কথা লেখা। লেখাই বলব, যেহেতু ছোটবেলা থেকেই নিজের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছি, তাই কথা বলার চাইতে কথা লেখা আমার অনেক বেশি। যদিও পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠানো পারিবারিক পটভূমিরও কিছু ভূমিকা ছিল। আমার দাদু কবিতা লিখতেন। সেইসময়ে তাঁর শ্যামাসংগীত বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। মায়ের দাদু ছিলেন সুরেশ চন্দ্র নন্দী। ওমর খৈয়াম এবং শেখ সাদির ওপর লিখিত তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থদুটি এখনও সমাদৃত। মায়ের কাছে শুনেছি, মা’র দাদুর বাড়িতে তৎকালীন কবি সাহিত্যিকদের নিত্য আনাগোনা ছিল। কল্লোল পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দীনেশরঞ্জন দাশ, শনিবারের চিঠির সজনীকান্ত দাস সুরেশ চন্দ্র নন্দীর বিশিষ্ট এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ভারতবর্ষ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক জলধর সেন ছিলেন সুরেশ্চন্দ্র নন্দীর স্নেহশীল অগ্রজপ্রতিম। অতএব দাদুর বাড়িতে, মায়ের ওপরে এসবের একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল।


জীবনদর্শনের কথা বলতে গেলে বাবা, মা এবং দাদু এবং ঠাকুমার কথা প্রথমেই বলতে হয়। আমার দাদুর বাড়িটি আমার কাছে ছিল রহস্যপুরী। বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ, কোরান, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্রের পাশাপাশি, শেক্সপিয়ার, এলিয়ট, ডিকেন্স, মঁপাসা। দেশ পত্রিকার সঙ্গে নিবিড় পরিচয়ও সেখানেই। যেকোনো বই দেখলেই তাতে ডুব দেওয়ার অভ্যাস আমার ছোটবেলা থকেই। মা তাই খুব বেছেবেছে বই পড়তেন। অমর চিত্রকথা, চাঁদমামা, আনন্দমেলার পাশাপাশি ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ এবং ‘কাঁহা গেলে তোমা পাই’এর মতো গবেষনামূলক গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্য হয়েছে খুব ছোটবেলাতেই। মিশনারি স্কুলে পড়তাম। তার একটা প্রভাব তো আছেই। মাধ্যমিক পাশ করার পর জেঠু বিবেকানন্দের চিঠি উপহার দিয়েছিলেন। গভীর আগ্রহে আটটি খণ্ডই দ্রুত পড়ে ফেলেছিলাম। যদিও এইসব সমুদ্রে বারবার আবগাহন করেও তল পাওয়া একজন্মের কাজ নয়। অতএব আমার জীবনদর্শন গড়ে ওঠায় সাহিত্যের পাশাপাশি বিবেকানন্দের প্রচ্ছন্ন প্রভাব আছে।  


সম্পাদক রংরুট: বাংলা কাব্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্ব এবং আপনার জীবন  সাহিত্যসাধনার যাত্রাপথে বিশ্বকবির ভূমিকা ঠিক কি রকম?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  রবীন্দ্রনাথের রচনা এতটাই ব্যপ্ত, তাঁর কবিতা, নাটক, ছোটগল্প, গান এবং সর্বোপরি তাঁর দর্শন মানুষকে প্রভাবিত করবেই। তাঁর ছবিও আমার কাছে অপার কবিতা। কিছু গান কবিতার কাছাকাছি, কিছু কবিতা গানের। চাওয়া এবং না পাওয়ার এক আশ্চর্য বেদনা ছড়িয়ে আছে তাঁর গানে, কবিতায় এবং ছবিতে। আংশিক বা খণ্ডিত নয়, সামগ্রিকভাবেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের সত্ত্বার ওপরে প্রভাব বিস্তার করেন। পৌঁছে দেন আলোর কাছে। বাংলা কাব্যসাহিত্যে তাঁর আলো এখনও ভাস্বর, আগামীতেও থাকবে। উত্তর আধুনিক চোখ দিয়ে দেখলে তাঁর কিছু কবিতাতে অতিকথন পাওয়া যাবে, একথা ঠিক। তবু তাঁর কবিতায় এখনও আশ্চর্য আলোকচ্ছটা, অবগাহনের প্রশান্তি। ছোটবেলায় আমার অবসরের অন্যতম প্রধান সঙ্গী ছিল তিনটি। ছবি আঁকা, রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং অভিধান। রবীন্দ্রনাথের কবিতার চাইতেও তাঁর গান যে কেবল মাত্র কোনো সাহিত্যপ্রিয় কবিতাপ্রিয় মানুষেরই নয়, অস্তাচলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া কোনো মানুষের বা একটি শিশুর কাছেও আত্মলোকের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে, এই বিস্তার অবশ্যই তাঁকে অপ্রতিরোধ্য এবং অনিবার্য করে তোলে।   


সম্পাদক রংরুট: রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ’; একজন সাহিত্যিকের প্রত্যয়ে মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখাটা কতটা জরুরী বলে আপনার মনে হয়? আর বিশ্বাসভঙ্গেরর দহন তার প্রতিভাকে কি ভাবে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে? বা আদৌ পারে কি?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  মানুষের ওপর বিশ্বাস হারালে আর থাকল কী? মানুষর জন্যেই লেখা, মানুষকে নিয়েই লেখা। বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ, যিশুখ্রিস্ট থেকে বিবেকানন্দ, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি থেকে পিকাসো, সমস্ত গান, কবিতা, ছবিই তো মানুষকে নিয়ে , তার দেখাটুকু, বোঝাটুকু নিয়ে। অবিশ্বাসও আসলে একরকমের বিশ্বাস। যে মানুষকে আপনি বিশ্বাস করছেন না, আদতে আপনি তার অনির্ভরযোগ্যতাকে বিশ্বাস করছেন। একজনকে অবিশ্বাস করে আপনি অন্য আরেকজনের ওপর ভরসা করবেন, করতেই হবে। পারস্পরিক ভরসা ও বিশ্বাসের ওপরেই তো আমাদের জীবন দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বাসভঙ্গের দহন অনুভূতিকে সাময়িক তীব্রতা দেয়। কোনো প্রতিভাই তার ওপর সার্বিক ভাবে ভিত্তি করে বিকশিত হয় না। সেক্ষেত্রে সে বেশিদূর এগোতে পারবে না। বরং একটি আবর্তে পড়ে ঘুরপাক খাবে। নতুন করে কিছু খোঁজার থাকবে না তার, লেখার থাকবে না। বিশ্বাসভঙ্গ একটি বিশেষ ধরণের অভিজ্ঞতা, যেটি মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তার চাইতে আরও অনেক বেশি উদ্বেলিত করতে পারে মানুষের জন্য মানুষের আবেগ এবং অনুভূতি।


সম্পাদক রংরুট:  রবীন্দ্রনাথের যুগের পর আমরা বহুদূর এগিয়ে এসেছি! জীবন ও সাহিত্যের ভিতর ও বাইরে ঘটে গিয়েছে বিপুল পরিবর্ত্তন! আজকের দিনে  সাহিত্যে আধুনিকতা বিস্তর পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে কোথাও কি একটা আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বলে মনে করেন আপনি? নাকি বাংলাসাহিত্য আরও বেগবান হয়ে আধুনিকতার পরিসরটিরই আরও বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে বলে মনে হয় আপনার?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  সাহিত্য, বিশেষত কবিতার জগতে সবসময়েই পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়ে চলেছে। সারা বিশ্ব জুড়েই হয়ে চলেছে। এখন বিশ্ব সাহিত্য এবং কাব্য আন্দোলনের নাগাল পাওয়া অনেক বেশি সহজসাধ্য। অতএব বাংলা কবিতা এইমুহূর্তে কোনো আবর্তের মধ্যে পড়ে আছে বলে আমার মনে হয় না । মানুষের নিজেকে খোঁজা শেষ হয়ে যায়নি এখনও। নতুন প্রকাশভঙ্গি খোঁজাও শেষ হয়নি। আধুনিকতা থেকে উত্তর আধুনিকতার দিকেই তার যাত্রা। বর্তমানের ওপরে অতীতের সবসময়েই একটা প্রভাব থাকে, তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নতুন কিছু হয় বলে আমার মনে হয় না। অতএব একে আবর্ত না বলে আমি বরং জমি বা দাঁড়াবার জায়গা বলব, যার ওপর পা রেখে আমরা নতুনের দিকে পা বাড়াচ্ছি।  


সম্পাদক রংরুট: সামাজিক দায়বদ্ধতার নিরিখে, একজন সাহিত্যেকের   সমাজসচেতনতা কতটা জরুরী বলে মনে হয় আপনার? এবং এই সমাজসচেতনতার
প্রসঙ্গে সাহিত্যিকের দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক মতাদর্শ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  সাহিত্যকে ব্যক্তিগত এবং সামাজিকের সমন্বয় বলা যেতে পারে। সমাজকে উপেক্ষা করে সাহিত্য হয় না। আপনি ‘আনা কারেনিনা’ বা ‘ফাদার্স এন্ড সন্স’ এর কথাই বলুন, কিম্বা ‘কাফকা অন দ্য শোর’ এর কথাই বলুন, সমাজ তো সেখানে অবশ্যই আছে। প্রকট ভাবে আছে। সমাজ লেখার মধ্যে দিয়ে উঠে আসবেই, প্রকট ভাবে হোক বা প্রচ্ছন্ন ভাবে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ থেকে শুরু করে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মন্ত্র’ পর্যন্ত সমাজ একটি প্রখর ও  প্রভাবশালী চরিত্র হিসাবে বর্তমান। দেশপ্রেম বা রাজনৈতিক মতাদর্শ মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সাহিত্যিক বা কবির লেখায় সেটা ফুটে ওঠা স্বাভাবিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো সেই লেখা বৈপ্লবিক ভূমিকাও পালন করতে পারে। সুতরাং গুরুত্ব তো আছেই। এই ধরণের লেখা সেই সময়ের ইতিহাসকে বুঝতে সাহায্য করে। পরবর্তীকালেও কোনো সময়ে সেই লেখা আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। যেমন পল রোবসনের প্রবন্ধগুলি সবসময়েই প্রাসঙ্গিক ছিল। এখন জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুকালীন পরিস্থিতিতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। তবে অরাজনৈতিক লেখার গুরুত্ব তাতে কমে যায় না। 

সম্পাদক রংরুট: সাহিত্যসাধনা বা কাব্যচর্চার প্রসঙ্গে কবি  জীবনানন্দ পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান ও সুস্পষ্ট ইতিহাসচেতনার উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।  তাই এই সমাজসচেতনতার ভিত্তি সুদৃঢ় ইতিহাসবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়াকে কতটা জরুরী বলে মনে করেন আপনি, এবং কেন?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  আগের প্রশ্নের প্রসঙ্গও কিছুটা জড়িয়ে আছে এই প্রশ্নে। পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান এবং সমাজসচেতনতার দৃঢ় ভিত্তি সবসময়েই কবি বা সাহিত্যিককে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপরে দাঁড় করিয়ে দেয়। কবিতা অনেকের ক্ষেত্রেই অবচেতনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ। সেই অবচেতন যত সমৃদ্ধ হবে, তত অন্যান্য ভাষার কবিতা ও সাহিত্যের ভেতর প্রবেশ করা সহজ হবে। যদি মনে করেন, অন্য ভাষা বা অন্য দেশের কবিতা পড়ার কী প্রয়োজন, তার উত্তর জীবনানন্দই দিয়ে গেছেন। যত বেশি ধরণের কবিতা পড়ব, তত বেশি করে বোধ তৈরি হবে। সমালোচকের ক্ষেত্রে তো বটেই, স্বয়ং কবির ক্ষেত্রেও সেই ঋদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসবোধ সুদৃঢ় হলে নিজের সময়কে অতিক্রম করে অন্য সময়েও নিজেকে স্বচ্ছন্দ স্থাপন করা সম্ভব। অন্য যুগের কবিতা নিয়ে চর্চা করতে গেলে সেই যুগ সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা গড়ে তোলা অবশ্যই প্রয়োজন। তা না হলে তার প্রকৃত রসাস্বাদন অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হবে না। 


সম্পাদক রংরুট:  স্বদেশপ্রেম, নিজের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর প্রতি দায়বদ্ধতা- নিজের চারপাশের প্রবাহমান সময়ের সাথে আত্মসংলগ্নতা এগুলি একজন সাহিত্যিককে কি আন্তর্জাতিকতার প্রেক্ষিতে  সীমাবদ্ধ করে তোলে বলে মনে করেন আপনি?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  দেশপ্রম, নিজের দেশের ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের চারপাশের প্রবহমান সময়ের সঙ্গে আত্মসংলগ্নতার সঙ্গে সাহিত্যের কোনো বিরোধ আছে বলে আমার মনে হয় না। একজন কবি বা সাহিত্যিকের দৃষ্টি তাঁর নিজের স্থান বা কালের সীমাকে অতিক্রম করে প্রসারিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃত শিল্প এবং সাহিত্য সবসময়েই আন্তর্জাতিক। আপনি যখন পার্ল বাকের রিফিউজি পড়েন, তখন তার সঙ্গে অনায়াসে রিলেট করতে পারেন। যদিও সেটি একটি অন্য দেশের প্রেক্ষাপটে লেখা। মানুষের চিরন্তন সমস্যাগুলি একই থাকে, অনুভূতি বা দুঃখ যন্ত্রণাগুলি একই থাকে। একজন চাকমা শরণার্থীর সঙ্গে একজন সিরিয়ান শরণার্থীর বেসিক প্রয়োজনের কোনো তফাত নেই। কবিতা বা সাহিত্য যখন সেসব তুলে ধরতে চায়, তখন তা অনায়াসেই আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। 


সম্পাদক রংরুট:  আধুনিক জীবনেরর গতি সর্বস্বতা ও ভোগবাদী সংস্কৃতি সাহিত্যকে কি ক্রমেই কোণঠাসা করে দিয়ে ভবিষ্যতের জন্যে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে বলে মনে করেন আপনি? গত এক দশকে, গোটা বিশ্বে ইনটারনেট বিপ্লবে আপনি বাংলাসাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কতটা আশাবাদী?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  আমার তা মনে হয় না। একটি দেশের একশো শতাংশ মানুষই সাহিত্যমনস্ক হবে, এমনটি কোনোদিনই ছিল না। সাহিত্য এখনও পড়া হচ্ছে, ভবিষ্যতেও পড়া হবে। যেটা প্রয়োজন , সেটা হল মাতৃভাষার প্রতি সচেতনতা বাড়িয়ে তোলা। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যখন নতুন প্রজন্মকে আমরা বিদেশি ভাষাকে দেশীয় ভাষার চাইতে অভিজাত বলে ভাবতে শেখাচ্ছি। এর সমাধানও আমাদের হাতেই আছে।  শিশু কিশোরেরা যদি হ্যারি পটার পড়তে উৎসাহিত হতে পারে, তবে বাংলা সাহিত্য পড়তেও আগ্রহী হবে। আগ্রহী করে তোলার দায় আমাদের। ইন্টারনেট বিপ্লবে বাংলা সাহিত্যের উপকার হবে বলেই মনে হয়। প্রচুর নতুন কলম উঠে আসছে। হয়তো অনেকেই দীর্ঘস্থায়ী হবে না, তবু চর্চা যে বাড়ছে এও তো কম পাওয়া নয়। ২০২০ বইমেলায় গিল্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী য পরিমান বই বিক্রি হয়েছে, তাতে তো নিরাশার কারণ দেখি না। বরং প্রচুর বইপত্র এখন অনলাইনে কেনা যাচ্ছে। বিদেশি বইগুলোও সহজে নাগালের মধ্যে পাচ্ছি। প্রিন্টেডের পাশাপাশি অনলাইন ম্যাগাজিনেও ভালো ভালো লেখার সন্ধান পাচ্ছি আমরা। দরজাটা প্রশস্ত হয়ে খুলে যাচ্ছে।


সম্পাদক রংরুট: আমাদের সমাজসংসারে নারীর অবস্থান আপনাকে কতটা ও কিভাবে বিচলিত করে? আপনার ব্যক্তিজীবনের দৈনন্দিন ছন্দে এর প্রতিফলনের স্বরূপ সম্বন্ধে একটু বিস্তৃত ভাবেই জানতে চাইছি।

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  এই একটি ভাবনা আমাকে কাঁপিয়ে দেয়। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু যদি বর্ণবিদ্বেষ হয়, নারীর পরিস্থিতি তার চাইতে আলাদা কিছু নয়। এবং হ্যাঁ। সুশান্ত সিং রাজপুতের অবসাদজনিত মৃত্যুর কারণও সেই একই। এক শ্রেণীর মানুষের আরেক শ্রেণীর মানুষকে ক্রমাগত দাবিয়ে রাখতে চাওয়া। ডেমোসাইড কথাটি জানেন নিশ্চয়। রাষ্ট্র যখন কোনো মানুষের শরীর নয়, সত্তাকে হত্যা করে- তাকেই আমরা ডেমোসাইড বলে থাকি। একটি মানুষের হাঁটাচলা, পোশাকআশাক, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, অধিকার, প্রতিভা, মেধা, চিন্তা, চেতনাকে যদি আজন্ম শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়, তার চাইতে নিদারুণ নির্যাতন আর কী হতে পারে?
আপনি বলতে পারেন, মেয়েরা অনেকসময় মেয়েদের আটকাতে চায়। সেটাই তো স্বাভাবিক। আপনি যদি পাঁচটি পাখিকে দীর্ঘকাল পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাখেন, তবে হঠাত করে ছাড়া পেলে হয়তো দু’একটি পাখি ওড়ার চেষ্টা করবে। অন্যেরা ভয় পাবে। কারন এই অভ্যাস তাদের স্বাধীনতার বোধ নষ্ট করে দিয়েছে। অন্ধমানুষ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলে প্রথমেই তীব্র আলো সহ্য করতে পারেন কি? সাদা, কালো, নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ ইত্যাদি বৈষম্যমূলক ভাবনাগুলি যেদিন আমরা বাতিল করতে শিখব, সেদিন ধর্ষণ, জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু, সুজয় প্রসাদের মতো মানুষের প্রতি অমানবিক আচরণও বন্ধ হবে আশা রাখি। 


সম্পাদক রংরুট: তথাকথিত একাডেমিক  নারীবাদের চর্চা আমাদের তৃতীয়বিশ্বের  এই আর্থসামাজিক পরিসরে কতটা ফলদায়ী ও আশাব্যঞ্জক বল  মনে করেন?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  যদিও আমি নারীবাদের চাইতে মানবতাবাদে অনেক বেশি আস্থাশীল, তবুও নারীবাদের প্রয়োজন আছে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন নারীর সাফল্য দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। এখনও যখন কন্যাভ্রূণ হত্যা হয়ে চলেছে, ধর্ষণ হয়ে চলেছে, গার্হস্থ্য হিংসা হয়ে চলেছে, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়াও বন্ধ হয়নি, এই পরিস্থিতিতে নারীবাদের চর্চার প্রয়োজন আছে। একাডেমিক স্তরে এর চর্চা নাহলে রাজনৈতিক স্তরে তার প্রভাব ততটা হবে বলে মন হয় না। বরং আরও বেশি করে চর্চা প্রয়োজন এবং সামাজিক স্তরে তার প্রয়োগের প্রয়োজন আছে। গতবছর ‘অথ মানুশী কথা’ বলে একটি কবিতা লিখেছিলাম। সেখানে আখ চাষ করতে আসা মেয়েদের দুরবস্থার কথা বলার চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশে যেখানে আমরা দেবীপূজায় বিশ্বাসী, মায়ের সম্মানের কথা বলি, সেখানেই কাজ দেবার শর্ত হিসাবে কুড়ি একুশ বছরের মেয়েদের জরায়ু বাদ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ভাবতে পারেন? তাদের কথা তো বলতে হবে। চর্চায় তুলে আনতে হবে।


সম্পাদক রংরুট: আর ঠিক এই প্রসঙ্গেই জানতে ইচ্ছে করছে, বিশেষত একজন লেখিকার দৃষ্টিকোণ থেকে; আমাদের পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ সভ্যতায় একজন লেখিকার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার মনে হয়? আপনার নিজের লেখালেখির সূত্র ধরেই যদি বলেন!

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার: নারীর কথা কেবল নারীই বলেন, তা তো নয়। বহু পুরুষ লেখক নারীর সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তবুও একজন নারী যেভাবে সমস্যাগুলি প্রত্যক্ষ করেন বা অনুভব করেন, তাতে তাঁর লেখা অবশ্যই প্রয়োজন। ‘কথামানবী’ বা ,সীতায়ন’ লিখতে একজন মল্লিকা সেনগুপ্তকেই প্রয়োজন হয়। একজন নারী কীভাবে পুরুষকে , পৃথিবী, সমাজ বা নারীর পরিস্থিতিকে দেখেন, সেকথা একজন নারীর চাইতে ভালো ভাবে অন্য কে বোঝাবে? শুধু নারীর কথাই কেন , তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কথা বলতে গেলে একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকেই কলম ধরতে হবে। অবশ্য ব্যক্তিগত ভাবে এই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বলে দাগিয়ে দেওয়াকে আমি সমর্থন করি না। 


সম্পাদক রংরুট: ভবিষ্যত প্রজন্মের সাহিত্যের কাছে আপনার প্রত্যশা ও দাবী কি?

শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার:  ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমার অনেক প্রত্যাশা। বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের পূর্বসূরীরা যথেষ্ট প্রয়াসী ছিলেন। উত্তরসূরীদের দায়িত্ব আরও অনেক বেশি। শুধু সাহিত্যে নতুন ধারা প্রণয়নের চেষ্টাই নয়, পূর্বসূরীদের রেখে যাওয়া অমূল্য ভাণ্ডার বিশ্বের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরার দায়ও উত্তরসূরীদের ওপরেই বর্তায়। এ বিষয়ে আমাদের সকলকেই প্রয়াসী হতে হবে।


শ্যামাশ্রী রায় কর্মকার: মূলত কবি। এছাড়াও গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখা ও কবিতা অনুবাদে আগ্রহ। লেখালেখি দেশ, কবিসম্মেলন, মাসিক কৃত্তিবাস, ভাষানগর, সাপ্তাহিক বর্তমান, যুগশঙ্খ ইত্যাদি পত্রিকায়। এছাড়া লন্ডন ও বাংলাদেশের বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরোজা রঙের ঘুম’। প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থ বব ডিলানঃ অন্তহীন যাত্রা, বিটলসঃ বদলের তালে তালে, পল রোবসন। নতুন কৃত্তিবাস মাসিক কৃত্তিবাস পুরস্কার, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্মৃতি পুরস্কার, অভিজয় সাহিত্য সম্মান, সাতকাহন সাহিত্য সম্মান প্রভৃতি পুরস্কারে সম্মানিত ।

কপিরাইট রংরুট কর্তৃক সংরক্ষিত


 

1 টি মন্তব্য:

  1. শ্যামাশ্রী , আপনার লেখাটি পড়লাম। ভালো লাগলো। লেখার মধ্যে 'ডেমোসাইড' শব্দটি বিদ্যুতপ্রবাহের মতো কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনাকে ছুঁয়ে গেলো। শুভেচ্ছা রইলো!

    উত্তরমুছুন