মুখোমুখি জিনিয়া রায়



মুখোমুখি জিনিয়া রায়


সম্পাদক রংরুট: সকলের আগে ত্রৈমাসিক রংরুটের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। রংরুটের এই বিশেষ সংখ্যায় আপনাকে স্বাগতম। প্রথমেই যে বিষয়টি জানতে চাইবো সেটি হলো, কাব্য সাহিত্যই বা কেন? অর্থাৎ সাহিত্য ছাড়া আরও তো অনেক বিষয় রয়েছে। সেখানে সাহিত্য নিয়ে আপনার আগ্রহের উৎস কি? এবং মোটামুটি ভাবে জীবনের কোন পর্যায় থেকে সাহিত্য বিষয়ে এই আগ্রহের সূত্রপাত। এবং এই বিষয়ে বিশেষ কারুর প্রভাব যদি থেকে থাকে আপনার জীবনে।

জিনিয়া রায়:  প্রথমেই বলি যে আমার ব্যাবহারিক জীবনে পঠন পাঠনের সূত্র ধরেই অনিবার্য ভাবে সাহিত্য এসেছে। পঠন পাঠনের সময় থেকেই কাব্য সাহিত্যের ব্যান্জনাধর্মীতা আমায় আকৃষ্ট করত। কাব্য সাহিত্যের মাধ্যমে অনেক না বলা বানী উচ্চারণ করা যায়। এটা বেশ বুঝে গেছিলাম। আর আমার ছোট বেলায় যখন "আনন্দবাজার" এবং "দেশ" পত্রিকা বাড়ীতে আসতো তখন নিষিদ্ধ পত্রিকা হিসেবে  এদের প্রতি আকর্ষন জন্মেছিলো এবং তার কবিতা গুলি না বুঝলেও পড়ার চেষ্টা করতাম। গুরুজনেরা দেখে ফেলার আগেই চট্ করে একটা ছোটো কবিতা পড়ে ফেলতাম, হয়তো আমার অজান্তেই সেই থেকেই কবিতা আমার জীবনে সুবাতাস বইযে দিল, সে হয়ে উঠলো আমার প্রথম প্রেম। প্রভাবের কথা বলতে গেলে পাঠ্য বইয়ের বাইরে জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শঙ্খ ঘোষ এঁদের কবিতা ভালো লাগতো। প্রারম্ভিক পর্যায়ে  তাঁদের কবিতা আমায় লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে।



সম্পাদক রংরুট: এবারে আসি প্রথম লেখার বিষয়ে। লেখালেখির ভিতরে যে অপার আনন্দ, সেই আনন্দের প্রথম অভিজ্ঞতা কেমন ছিল আপনার? একটু বিস্তারিত ভাবে বলেন যদি।

জিনিয়া রায়:  হাতের লেখা ভালো ছিলো বলে স্কুলের দিদিরা দেয়াল পত্রিকার ভার আমার উপর ন্যস্ত করেছিলেন। সাদা আর্ট পেপারের উপর অধুনালুপ্ত ঝর্না কলমের সেই মিষ্টি আঁচড়ে অক্ষরের অবয়ব ফুটিয়ে তোলার যে উন্মাদনা তা আজও ভুলিনি। পরবর্তীতে কলেজে পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম। অনেক অপ্রাপ্তির বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছিলো এই ভালো লাগা।


সম্পাদক রংরুট: ব্যক্তিগত জীবনে আপনার বড়ো হয়ে ওঠা, লেখাপড়ার সাথে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা কখনো কি কোন সমস্যার সৃষ্টি করেছিল? বিশেষ করে পেশাগত জীবনে প্রবেশের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার পর্যায়ে?

জিনিয়া রায়: না এরকম কোনো সমস্যার মুখামুখি হতে হয়নি কেননা আমার লেখাপড়াই ছিল সাহিত্য কেন্দ্রীক। তবে যেহেতু আমি একটি কর্পোরেট সংস্থায় কাজ করি সেই জন্য কবিতা লেখার সময় বড় কম। একমাত্র এটিকে যদি সমস্যা বলেন তাহলে তাই।


সম্পাদক রংরুট: সাহিত্যের প্রতি আপনার এই ভালোবাসার প্রথম দিকে কোন ধরণের সাহিত্যের প্রতি আপনার অধিকতর আগ্রহ ছিল? অর্থাৎ গল্প কবিতা উপন্যাস। নাটক প্রবন্ধ ইত্যাদি। এবং এই প্রথম পর্যায়ে কোন কোন লেখকের লেখা আপনাকে বেশি করে টানতো?

জিনিয়া রায়:  আগেই বলেছি উপন্যাস ও কবিতা। খুব ছোটোবেলায় অনেক উপন্যাস ও শারদীয় সংখ্যার পত্রিকা আমাদের কাছে নিষিদ্ধ ফলের মতো ছিলো বলে আরো আগ্রহ জন্মে ছিলোশীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় রমাপদ চৌধুরী, সুনীল গাঙ্গুলি, বাণী বসু, আরো অনেকেই রোজকার জীবনের অঙ্গ হয়ে ছিলেন / আছেন।


সম্পাদক রংরুট: আপনার নিজের লেখার বিষয়ে, কোন বিশেষ লেখকের প্রভাব সম্বন্ধে আপনি কি সচেতন? যেমন, অনেকেই আমরা আমাদের খুব প্রিয় লেখকের দ্বারা মনের অজান্তেই প্রভাবিত হয়ে পড়তে পারি। আবার অত্যন্ত সচেতন ভাবে প্রিয়তম লেখকের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার প্রয়াসও করতে পারি। আপনার নিজের  লেখালেখির ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক কি রকম?

জিনিয়া রায়:  কবিতার ক্ষেত্রে অবচেতনে জীবনানন্দের প্রভাব তো আছেই, এছাড়াও সুনীল, শক্তি , সুভাষ  বাবু আমাকে কবিতার ক্ষেত্রে অনেক টাই শক্তি যুগিয়েছেন ।


সম্পাদক রংরুট: লেখালেখির সাথে নিরন্তর বই পড়ার একটা গভীর সংযোগ রয়েছে। বর্তমানের গতিময় জীবনে হয়তো সবসময় সেই সম্পর্ক অটুট রাখা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও এই সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি কোন ধরণের বই পড়তে বেশি আগ্রহী। এবং কোন কোন লেখক আপনাকে এই সময়ে বেশি করে কাছে টানেন তাঁদের লেখার গুণে।

জিনিয়া রায়: নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী থেকে শুরু করে  শঙ্খ ঘোষ, সুবোধ সরকার ও অনেক নামী অনামী অনেক আধুনিক কবির কবিতা পাঠেই আগ্রহ বেশী।মহিলা কবিদের মধ্যে মল্লিকাদি, শ্বেতা চক্রবর্তী এদের কবিতা ভালো লাগে। এছাড়া নবনীতা দেবসেন তো আমার All time favouriteবিশ্ব সাহিত্যে লোরকা সবসময়েই পছন্দ। বর্তমানের ইংরেজী সাহিত্যের মহিলা কবিদের মধ্যে Rupy Kaur আর Megan Falley  তো খুবই ভালো-।


সম্পাদক রংরুট: আপনার নিজের লেখা কয়টি ও কি কি বই প্রকাশিত হয়েছে যদি বলেন। এবং বইগুলির বিষয়বস্তু ও সেই সম্বন্ধে আপনার ভালোলাগা তৃপ্তির দিকগুলিকে আমাদের পাঠকের সামনে একটি যদি বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেণ।

জিনিয়া রায়:  এখন পর্যন্ত আমার একটিই বই প্রকাশিত হয়েছে। সপ্তর্ষি প্রকাশনীর “মনের আগের স্টেশন।প্র থম বই প্রকাশ তো অনেকটা প্রথম সন্তানের জন্ম দানের মতো! অবিস্মরণীয় অনুভূতি! তবে আমার সময়াভাব ও আলসেমি মিলেমিশে পরবর্তী বই ভূমিষ্ঠ হবার সম্ভাবনাকে বিলম্বিত করছে। হয়তো আগামী বইমেলা আমার পরবর্তী বই প্রকাশের সাক্ষী থাকবে ।


সম্পাদক রংরুট: বর্তমান সময়ে একটি বই প্রকাশ করতে গিয়ে একজন লেখককে সাধারণত কি কি ধরণের সমস্যায় পড়তে হয়। আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এই বিষয়ে যদি আলোকপাত করেন।

জিনিয়া রায়: প্রথম সমস্যা টি অবশ্যই অর্থকরী। প্রায় সব নতুন কবিকেই নিজের খরচে বই প্রকাশ করতে হয়। তারপরের সমস্যা হলো বিপণন। অনেকে বাচিক শিল্পীদের দিয়ে নিজের কবিতা পাঠ করিয়ে করিয়ে নিজেদের মুখ/ লেখা পরিচিত করেন বলেও শুনেছি। যদিও অবশ্য আমি আমার কবিতা স্বকন্ঠে পাঠ করি।


সম্পাদক রংরুট: আপনার নিজের লেখার বিষয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, একটি গণ্ডীর ভিতরেই আটকিয়ে যাচ্ছে আপনার যাবতীয় লেখালেখি। সাধারণত আমাদের অধিকাংশই কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে আত্মনির্মিত নিজস্ব গন্ডীর ভিতরেই আটকিয়ে যাই। অনেকেই হয়তো খেয়াল করি না। আবার অনেকেই হয়তো সচেতন ভাবে সেই গণ্ডীর ভিতর থেকে নিজেকে মুক্ত করতে প্রয়াসী হন। আপনার লেখালেখি ও আপনার ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত যদি করেন।

জিনিয়া রায়:  আগে তো নিজস্ব গন্ডী হোক তারপরে অতিক্রমের কথা ভাববো—!


সম্পাদক রংরুট: সবশেষে জানতে চাইবো, বর্তমান সমাজ সভ্যতায় দাঁড়িয়ে আজকের বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন। এবং বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আপনি কতটা আশাবাদী ও কেন?

জিনিয়া রায়: বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমি তুরীয় রকম আশাবাদী। সাহিত্য সংস্কৃতি এমনই একটা বিষয় যা স্বত: উৎসারিত। তা পাঠক/দর্শক/ শ্রোতা নিরপেক্ষ। পাঠক পেলে ভালো। পরের স্টেশনে পৌঁছে যাবো। না পেলে “মনের আগের স্টেশনেই" থেমে থাকবো।

জিনিয়া রায়: কর্পোরেট সংস্থায় চাকুরীরতা। স্বরচিত কাব্যগ্রন্থ  মনের আগের স্টেশন নিম্নলিখিত বই, পত্রিকা গুলিতে প্রকাশিত হয় নিয়মিত কবিতা। সমধারা, বাংলাদেশ ভোরের আলো, বাংলাদেশ  যুগসাগ্নিক, কলকাতা সংকেত, কলকাতা একদিন সংবাদ পত্র কলকাতা আবেক্ষন, কলকাতা অন্য নিষাদ, কলকাতা পূর্ব পশ্চিম, ভারত বাংলাদেশ।

কপিরাইট রংরুট কর্তৃক সংরক্ষিত


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন