মন কুঠুরী
জয়তী রায়
------------------------------
৪/ ৪/২০১১ সাল।
---------------------
সারাদিনের মধ্যে বিকেল চারটে বাজলেই, মেজাজ খারাপ হয়ে যায় হিনার। ওই সময় কেমন এক হাওয়া বইবে! আকাশ গোমড়া চোখে তাকাবে!
বারান্দার তারে ঝোলানো খাঁচাতে পাখি ঝিমোবে। রাস্তা দিয়ে টানা সুরে বলতে বলতে যাবে
ফেরিওয়ালা। ঠাকুমা সারাদিন চিল চেঁচান চেঁচালেও চারটের সময় থম মেরে যান। ঘরের
কোনায় একলা, ঝুল পড়া মায়ের ছবি মিট মিট করে অসহায়ের মতো তাকাবে। কি বিচ্ছিরী। কি বিচ্ছিরী এই চারটের
সময়! সে রোজ দুটোর সময় স্কুল থেকে আসে।
বাস নামিয়ে দিতেই মালা মাসীর গজগজানো শুরু---" পারিনা বাপু। এই মেয়ে রেখে
বৌদি পগার পার, দাবাবু ক্ষেপা, ঠাকুমা পাগল, আমি
মরিচি এই মেয়ে নিয়ে। আয়েই মেয়ে। জ্বালাবে না বলে দিলুম। মুরগি ভাত খাও, নখখি মেয়ের মতো শুয়ে পড়ো। চারটেয় তোমার মাষ্টার আসবে। তবে
এট্টু গড়াবো আমি।"
--- আমি আজ পড়বো না মাসী। আমার খুব কষ্ট
হয়।"
---" এই চুপ করো বজ্জাত ম্যেয়ে। কষ্ট হয়। কিসের কষ্ট? ওমন ভালো মাষ্টার। " চোখ পাকিয়ে ধমকে ওঠে।
হিনা ঠাকুমার কাছে দৌড়ে যায়। ঠাকুমা
বসে বসে চিল্লান --- " ওরে এখনো খেতে দিলি না রে? ওরে ও মালা, তুই মরিস না কেন রে? " লাফিয়ে তেড়ে আসে মালা মাসী
" সকাল থেকে চারবার খেলে। লজ্জা নেই ধুমসি বুড়ী? আমি
মর্ব? আমি মলে বেঁচে যেতাম। যেমন বাপ, তেমনি এই বুড়ী তেমনি এই মেয়ে। বলে মাষ্টার খারাপ। পড়বো না। কেলাস ফাইভের বজ্জাত মেয়ে।
চলো শিগগিরি।" হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যায় বাথরুমের দিকে। ঠাকুমার
তোবড়ানো গাল ঝুলে পড়ে,নিঃশব্দ হয়ে যায়। গোটা
বাড়িটাই ক্রমশ চুপ হয়ে যেতে থাকে। গুমোট এক কান্না ঘুরে বেড়ায়। ঘড়ির কাঁটা চার ছুঁই ছুঁই। কোনো আততায়ী সন্তর্পণে
এগোতে থাকে হিনার ঘরের দিকে। চা দিয়ে, হাই হাই তুলতে তুলতে মালা কোথায়
চলে যায়। তার বয়স হয়েছে। মোটা শরীর। অনেক
টাকা মাইনে পায় বলে সে সামলায় সংসার। দুপুরে হিনার মাষ্টার এলে নিশ্চিন্তে ঘুম দেয়
সে।
ভয়ে নীল হয়ে যাওয়া হিনার দিকে তাকায়
আততায়ী। দু হাতে তাকে কোলে তুলে নিয়ে গাল টেপে। নরম শরীরের ঘ্রাণ
নেয়। হিস হিস করে আততায়ী বলে ---- "
আজ কি কি হোমওয়ার্ক আছে দেখি সোনা মনি?" বুনো বিচ্ছিরী গন্ধে বমি আসে, হাত পা ছুঁড়ে কাঁদে। বড়ো বড়ো লাল চোখ ভয় দেখায়--" মেরে
ফেলবো চুপ একদম। ঠাকুমা কে মেরে ফেলবো।"
*
হিনা খুব বমি করেছে আজ। উদাসীন বাবা একটু নাড়া খান। তার মনে হয় অনেক দিন
মেয়েটাকে দেখেন নি ভালো করে। কস্তুরীর মতো সুন্দরী তার মেয়ে। কস্তুরী কি মানুষ ছিল? না পরী? মেঘ দিয়ে বৃষ্টি দিয়ে ফুল দিয়ে
বানানো এক অপরূপা। রোজ রাতে তারার চুমকি বসানো হাল্কা পোশাক ভাসিয়ে উড়ে আসতো তার
বুকের মধ্যে কস্তুরী। থমকে যেতো রাত। সুগন্ধী বাতাস বইতো চারিদিকে। তুমুল
ভালোবাসায় ডুবে যেতে যেতে অনির্বানের মনে হতো কস্তুরী রক্ত মাংসের কেউ নয় এক অলীক
স্বপ্ন। আর আজকাল রোজ রাতে ড্রিংক করতে করতে পাগলের মতো চেষ্টা করেন সেই মায়াকে ছুঁতে।
তখন মাতাল হয়ে থাকতেন প্রেমে আজ মদে মাতাল
না হওয়া পর্যন্ত বোতল ছাড়েন না।
হিনা আজ বমি করছে। হিনাকে ফেলে চলে
গেছে কস্তুরী। সে আর থাকতে চায়না অনির্বানের সঙ্গে। কেমন অনায়াসে বলে দিলো মুখের
ওপর--" অসহ্য লাগে তোমাকে। " বারো বছর বিবাহিত জীবন, হঠাৎ অসহ্য লাগলো? কেমন করে? মানছে কাজের চাপে সময় কম দিতো
বাড়িতে, কস্তুরীর অভিমানকে বুঝতে
পারেনি- আসলে ওই জায়গাটা বিশাল আশ্বাসের জায়গা ছিলো যে। দুর্গের মতো সুরক্ষিত এক
ভালোবাসায় নিজেকে পরম নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলো,সেখানে ফাটল ধরেছে ধীরে ধীরে টের পেল না কেন অনির্বান? ফ্ল্যাটের বারান্দার গোলাপ গাছে
সতেজ ফুল, হিনার রোজ স্কুল যাওয়া, মালার সঙ্গে কাজ নিয়ে খিচ খিচ
--- এ সব দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে কাজে ডুবে যেতো। আর আজকে? বোকা
অপদার্থ ছাগল এই " আমি" টাকে ঘৃণা করে, করুণা করে, দাঁত কিড়মিড় করে রাগ করেও কোনো
সমাধান খুঁজে না পেয়ে মদের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে অনির্বান।
হিনা বমি করছে। " কি হলো
বলোতো মালা দি?"
অসহায় ঘোলাটে চোখ তুলে তাকায় অনির্বান।
--" কি করে জানবো দা বাবু। মা নেই। দশ বছরের মেয়ে,কথা শোনে না মোটে। পড়তে চায়না মাষ্টারের কাছে। বায়না বায়না
আর বায়না। বৌদিকে ফোন করো দা বাবু।" অবুঝ গোঁয়ারের মতো ঘাড় বাঁকায় সে।
অনেক টাকা পায়, পায় অনেক স্বাধীনতা তবু মালার রাগ হয়।
মনে হয় সে কেন সব সামলাবে? মা কই?
দুহাতে মাথার রগ টিপে ধরে অনির্বান।
সন্ধ্যের হাওয়া বারান্দার মরা গোলাপ গাছ দুলিয়ে উড়িয়ে দেয় শুকনো পাতা। হিনা বমি করে। তার প্রেমিক দশ বছরের মেয়ে রাখবে না।
কস্তুরীও নবীন প্রেমিকার মতো গদ গদ নতুন কুঞ্জে উড়ে গেলো। মেয়ের বমির আওয়াজ পৌঁছয় না সেখানে!
*
২০১৭ জুলাই।
--------------------
রাত বারোটায় একটা ফোন এলো আমার কাছে।
অন্য প্রান্তে স্যার রমাকান্ত আচার্য --" আরে সরি, মুনিয়া। অনেক রাতে ফোন করলাম নাকি?"
--" কিছু হবে না স্যার বলুন।"
---" আরে না না। ছি ছি। আমার যে কেন ঘড়ির কথা খেয়াল থাকে
না।"
---" ভাগ্যিস থাকে না।
কিছু ভালো জিনিস রাতেই ভালো শোনা যায়। বলুন স্যার।"
-----" মুনিয়া, একটা কেস এসেছে। পনেরো বছর বয়স মেয়েটির। খুব ঠান্ডা মাথায়
মা কে খুন করেছে বলে পুলিশকে বলেছে।
সমস্যা হলো, তদন্তে
নেমে পুলিশ বলছে মেয়েটি দোষী নয়। একটু কাউন্সিলিং করলে আসল কারণ বেরোবে। মেয়ে তো
মুখ খুলছে না। আমরা জানতে চাই কারণ কি?"
---" স্যার আমি কাল সকালেই আপনার চেম্বারে চলে আসছি। "
*
মা মেরীর ছবি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ঘরে কেন টাঙ্গানো এ প্রশ্নের জবাব স্যারের
কাছে পাইনি আর এক দৃষ্টে ছবি দেখছে যে গোলাপী কিশোরী সে যে হিনা,সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
---" মুনিয়া আয়। " স্যার একেবারে শিশুর মতো। সত্তরের
কাছাকাছি বয়েস, মাথা ভরা সাদা চুল,শরীরের পোশাক অগোছালো। কিন্তু মোটা চশমার আড়ালে স্নেহময় চোখ দুটো এক্স রে মেশিনের মতো ঢুকে যেতে পারে
মানুষের মনের গভীরে।
স্যারের গলার আওয়াজ শুনে ফিরে
তাকালো আমার দিকে হিনা। দৃষ্টি তো নয় যেন ছুরির ফলা। আমূল বিঁধে যায় শরীরে। চাপা
ঠোঁট, চ্যাপ্টা নাক, একমাথা কোঁকড়া চুল সাপের ফনার মতো দুলে দুলে ঘিরে আছে
পদ্মের কলির মতো সুকুমার মুখটিকে। মুখ সুকুমার সন্দেহ নেই, কিন্তু সমস্ত অবয়ব জুড়ে খেলা করছে
সতর্কতা, তাচ্ছিল্য, উপেক্ষা আবার সেই সঙ্গে এক মিষ্টি করুণ অসহায় ভাব।
শরীর হলো মনের আয়না। মাথার চুল
থেকে পায়ের আঙ্গুল জানান দেয় মন কি বলছে তার আভাস। ওই আভাসের রাস্তাটুকু ধরে খুঁজে
আনা যায় মানুষের সমস্যা।
" এনিম্যাল
ইন্সটিংক্ট " বলে একটা কথা আছে। বিপদসংকুল পরিবেশে যারা বড়ো হয় তাদের মধ্যে
বিপদে পড়লে এক ধরনের সহজাত আক্রমণাত্মক মনোভাব বা বুদ্ধি দেখা যায়, যা নিরাপদ আশ্রয়ে বড়ো হওয়া ব্যক্তিত্বের মধ্যে দেখা যায় না।
হিনার চকিত হয়ে ফিরে তাকানোর মধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠে ছিলো এক ধরণের আত্মরক্ষার
আক্রমণাত্মক ভঙ্গী। দরকার হলে খুন করা
অসম্ভব নয়, এমন
চরিত্রের পক্ষে।
হিনাকে নিয়ে ছোটো চেম্বারে ঢুকে দরজা বন্ধ
করতে শীতল এক জোড়া চোখে আমাকে মেপে নিয়ে হিনা বললো--" হাই দিদি।"
-----" হিনা। কি পড়ো?
টেবিলে রাখা পেপার ওয়েট নাড়াচাড়া করে
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে হিনা বললো--" কাম টু দি পয়েন্ট দিদি। " পনেরো
বছরের আত্মবিশাস দেখে, চমকে
গেলেও মিষ্টি হেসে বললাম, --" হিনা পাহাড় দ ভালোবাসো না সমুদ্র?"
--" কোনোটাই নয়। জঙ্গল। "
----" বাঃ। জঙ্গল আমারো প্রিয়। কেমন সবুজ গাছ।
পাতাঝরা রাস্তা। "
ঠান্ডা গলাতে উত্তর এলো---" বড়ো বড়ো গাছ। অন্ধকার। আলো ঢোকেনা। থমথমে।
হিংস্র। কামড়ে দেবার ভয়, ঘাড়ে
লাফিয়ে পড়ার ভয় তবু জঙ্গল ভালো দিদি। লুকিয়ে থাকা যায়। পাহাড় সমুদ্র খোলা মেলা।
আমার ভালো লাগেনা। "
অন্ধকার পছন্দ। লুকিয়ে থাকা পছন্দ।
জঙ্গল পছন্দ। যৌন আক্রমণ হয়েছে কখনো। হয়তো ছোট বেলায়। এখনি তো মোটে পনেরোষোলো। কিন্তু মা কেন খুন হলো তার জন্য? স্যার আর পুলিশ সকলের সন্দেহ, খুনী অন্য কেউ। অথচ মেয়ে ধরা দিয়েছে নিজে থেকে, মেয়েটির বাবা কেমন ভীতু টাইপের
মিন মিন করে বলার চেষ্টা করেছে খুনের জন্য তিনি দায়ী। যে চায়ের কাপে বিষ ছিলো তাতে
শুধু মেয়ের হাতের ছাপ। মায়ের বাবার কারো ছাপ নেই। কাজের মাসী বাড়ি ছিলো না। ডিভোর্সি
মা, প্রায়ই
আসতেন পুরোনো সংসারে। স্যার বলছেন ---" মুনিয়া। এমন ভাবে প্রশ্ন করো, যাতে মেয়ের নিজের কথাতেই সত্য বেরিয়ে আসে।"
--/----" হিনা! জঙ্গলে এক ছোট্ট বাড়ি বানাতে পারি আমরা। লাল টালি। সবুজ রঙের জানালা।
জানালায় পরী। বারান্দায় গোলাপ আর পাখি। তোমার ঘরে ছবি বই। " কথা শেষ হবার
আগেই এক জান্তব আর্তনাদ করে উঠলো হিনা-----" ঘর না। ঘর চাই না। বই না। জঙ্গলে
লুকিয়ে থাকা যায়। ঘরে সবাই ঢুকে পড়ে, ঘর চাইনা।"
----" আচ্ছা আচ্ছা, জঙ্গল ই ভালো। জঙ্গলে মা বাবা তুমি সকলে মিলে থাকবে।"
----" দিদি? কেন বোর করছো? বার
বার বলছি খুন আমি করেছি। ওই মা ছিলো ডাইনি। যদি না মারতাম সবাইকে শেষ করে দিতো।
জঙ্গলের কানুন আলাদা হয় দিদি। মারো নয়তো মরো।"
আমি স্তম্ভিত।। মানুষ সভ্য হয়েছে বহু বছর আগে। বেশিরভাগ জীবন
ছকে বাঁধা। খাদ্য, রমণ, ইত্যাদি। কিন্তু
একসময় মানুষ ছিলো অরণ্য চারী। রক্তে মাঝে মাঝে বেজে ওঠে অরণ্য মাদল।
-----" হিনা। জল খাও। চকলেট আছে। বলো, ঘর কেন
চাইনা? কে ঢুকতো ঘরে? কে তোমাকে ব্যাথা দিতো? আর যে ব্যাথা দিতো, লুকিয়ে
হাত দিতো শরীরে, তাকে কেন মারলে না? মা কে মারলে কেন?"
আলোর কমা বাড়ার সঙ্গে মনের
ভাবনার রকমফের হয়। টেবিলের নীচে বিশেষ সুইচ আছে, আলোর জন্য, রেকর্ডিংয়ের জন্য। হাত বাড়িয়ে
আলো কমিয়ে দিলাম। হলুদ বৃত্ত ছড়িয়ে পড়লো ঘরে। কেমন এক ঘোরের
মধ্যে হিনা বলে চললো---
"দিদি
তখন আমি কতো ছোটো। ফাইভে পড়ি। তখন স্কুল থেকে ঘরে এসে দেখতাম মা বসে আছে পরীর মতো।
তখন ঘর ছিলো যেন এক নদী। মার আদর খেয়ে ফ্রেশ হয়ে পার্থ কাকুর কাছে পড়তে বসতাম। মা, বাবা ঠাকুমা, মালা
মাসি সব নদীর পাড়ে বসে গল্প করতাম,হাসতাম।
সুন্দর হাওয়া বইতো। আমরা গল্প করতাম। "
হিনার চোখ দিয়ে জল পড়লে ভালো হতো।
চোখের জল পড়া মানে, মনের
কথা বার করবে সহজে। উল্টে ওর চোখ দুটো
জ্বলছে বনবিড়ালির মতো। স্যারের মেসেজ ফুটে উঠলো মোবাইলে--
" আজ
বন্ধ রাখো। কাল আবার!" মোবাইল অফ করে দিলাম। হিনার সঙ্গে আগামীকালের খেলা
রিস্কি হয়ে যাবে। মুখ বন্ধ করে ফেলতে পারে একদম। আমি আবার সূত্র ধরিয়ে দিলাম
----"মালা মাসী ভালো বাসত না তোমাকে?"
--------" কালো, বিশ্রী ছিলো। খসখসে হাত। মা নরম ফর্সা সুন্দর। "
----" তুমিও
সুন্দর হিনা। নরম, ফর্সা।"
----" মা চলে গেলে, পার্থ কাকু তাই বলতো। আর মিনতি মাসী খসখসে হাতে গায়ে জল
ঢালতো।"
-----" মা চলে গেলে সব বদলে গেলো নাকি?"
----" সব বদল। নদীর পারে জঙ্গল হয়ে গেলো। বাঘ সিংহ
ঘুরে বেড়াতো। ঠাকুমা ছিল লোভী শিয়াল। কেবল খেতে চাইতো। মালা মাসি একটা জংলী কুকুর। লাল রাগী চোখ। বাবা গর্তে ঢুকে
থাকা ইঁদুর। ভীতু। আর পার্থ কাকু? পার্থ
কাকু একটা সাপ। বিষ ছড়িয়ে দিতো আমার সারা শরীরে" হাঁফাতে থাকে হিনার স্বর। গরগর রাগী গলাতে বলে
---" জঙ্গলে একলা ঘুরে বেড়াতাম, সাপ পেছনে দৌড়োতে থাকতো। পরী মা কোথাও নেই। "
উত্তেজনায় টান টান আমি।
হিনার জীবন জঙ্গলে পার্থকাকুর বিষাক্ত ছোবল, মালার কর্কশ হাত,রক্ষাকর্তা বাবা নিজেই
ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে ইঁদুরের মতো গর্তে। দোষী তো সবাই। তবে মা কেন টার্গেট?
" মা চলে গেলো বলে সব বদলে গেলো হিনা?"
" মা পরী হয়ে উড়ে গেলো বলেই তো জঙ্গল হয়ে গেল বাড়িটা। আমাকে
পার্থ কাকুর কাছে ছেড়ে দিয়ে মালা মাসী ঘুমিয়ে পড়তো। বাবা অনেক রাতে বাড়ি ফিরে মদ
খেতে খেতে কাঁদতো। একদিন খুব বমি হলো আমার। পরের দিন পিরিয়ড হলো। প্রথম নিজের রক্ত
দেখে মালা মাসীকে জড়িয়ে ধরতে এক ধাক্কা দিয়ে গজ গজ করতে করতে শিখিয়ে দিলো সব।
সেদিন পার্থকাকু এসে আমার ওই জায়গায় হাত দিয়ে সাপের মতো হিস হিস করে বললো--
"তুই
বড়ো হয়ে গেলি হিনা। এবার সত্যিকারের বর বউ খেলবো আমরা।" জঙ্গল শিখিয়ে দেয় কি
করে আত্মরক্ষা করতে হয়! জ্যামিতির কম্পাস তুলে এলোপাথাড়ি মারলাম সাপটাকে। চিৎকার
শুনে মালা মাসী এসে দাঁড়াতে খুব চেঁচিয়ে বললাম---
-"খবরদার
যদি কাছে আসো। পার্থ কাকু কাল থেকে আর আসবে না। তাহলে আবার মারবো!"
--""সাপ তাহলে জব্দ হলো?"
----" সাপ জব্দ হয়ে ডাইনি এলো ঘরে। বাবা ওই রাতে
মা কে ফোন করেছিলো। তারপর থেকে মা বাড়ি আসা শুরু করে দিলো যখন তখন, প্রচুর টাকা চাই তার, মার প্রেমিক আসল রঙ দেখাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছি, প্রেমিক আর মা মিলে আমার বাবাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। আমি বড়ো হচ্ছিলাম, স্কুলেও যাচ্ছিলাম। সেখানে আমার বন্ধু অতসী।"
থেমে একটু দম নিলো হিনা। এখন ওর উৎস মুখ খুলে গেছে। বলবে কথা। আমাকে শুধু
সূত্র গুলো ধরিয়ে দিতে হবে। লক্ষ্য করলাম, অতসী নামটা নিতেই মুখে এক নরম আভা ছড়িয়ে পড়লো কি? চকিত এক হাসির রামধনু? চট করে হিসেব করে নিলাম। দশ বছর বয়সে মা চলে যাওয়া, এবং যৌণ আক্রমণ, তেরো থেকে ষোলো একলা লড়াই,এখন
জীবনে অতসী এক স্নিগ্ধ প্রলেপ। অথবা হিনা
পুরুষ বিদ্বেষী। নারীর প্রতি আকর্ষণ?
----" অতসী আর আমার কোনো বয় ফ্রেন্ড নেই। ছেলেরা
হয় সাপ না হয় ইঁদুর। ওদের ঘেন্না করি। আমরা লেখাপড়া তেমন করিনা
কিন্তু খুব আনন্দে থাকি। " উজ্জ্বল
মুখে বল্ললো হিনা।
" মা কেন ডাইনি হিনা? সেটা শুনি। আমাকে সব খুলে না বললে,পুলিশ তোমার বাবাকে ধরবে,বুঝতে পারছ?"
" দিদি, রোজ
বিকেল চারটে বাজলে মাএসে ডাইনিপনা করতো।
তার টাকা চাই। আমাকে মন্ত্রণা দিত---" বাবাকে ছেড়ে চলে আয়। বাবার অনেক টাকা। দেদার ফুর্তি করব দুজনে।"
আমি স্তম্ভিত। মা না ডাইনি? ফ্যাকাসে গলায় বললাম
---"তারপর?"
কঠিন গলায় বলে কিশোরী -- বাবাকে
ভালবাসায় ভরিয়ে তুলে নতুন দিশা দেখাচ্ছিলাম, পার্থ কাকুকে ভাগিয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসছিলো, ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছিল বাড়ী। সেই
হারিয়ে যাওয়া নদীর কুলকুল শব্দ ভেসে আসছিলো।
এই সময় ডাইনি বেরলো তার গুহা থেকে।
"
"তুমি খুব ভয় পেলে হিনা?"
" একদমই নয়। অতসী আর আমি মিলে ঠিক করলাম, ডাইনী মারতে হবে। অতসীর বাবা কেমিস্ট।
বিষ জোগাড় করা হল। বিকেল চারটের সময় মা এসে রোজ ঘ্যান ঘ্যান করে। ওই সময়
দিতে হবে বিষ। ব্যাস। ডাইনি খতম।" খুব হাল্কা চালে হাত উলটে বললো হিনা।
ঠান্ডা বটে মাথা। দেখি কি করা
যায়!
পাল্টা চাল দিয়ে বল্লাম---" হিনা। তোমার বাবা দোষ স্বীকার করেছেন। তুমি
বাবাকে বাঁচাতে মিথ্যে বলছো!"
আমার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে আছে কে? এক কিশোরী না এক লড়াকু সেনা? অসহায় বাবাকে বাঁচাতে
যে মরীয়া?
---"হিনা,পরশু
রবিবার, বিকেল চারটের সময় তোমার
বাবার সাথে দেখা করতেই মা এসেছিলো। তুমি
বাড়ি ছিলে না। সেই সময় চায়ের মধ্যে বিষ
মিশিয়ে দেয় বাবা। তুমি আর অতসী যখন এলে মা মারা গেছেন। বাবাকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে
হাতের ছাপ মুছে ফেলে বাবার জায়গায় নিজেকে দাঁড় করালে। মুশকিল কি জানো হিনা,অতসী তোমার মতো শক্ত নয়, বলে দিলো সব। এবার সত্যি বলো।"
হতবাক হিনার দিকে তাকিয়ে মন
খারাপ হয়ে গেল। হিনার মা মারা গেছেন, আর বাবা মেয়ে দুজনেই হত্যার দায় নিতে চায়। পুলিশ ধরেছে বাবাই খুনী। কিন্তু
হিনা পাকা মাথায় কাজ করেছে। একমাত্র সাক্ষী অতসীও সহজে নরম হয়নি। সবথেকে দরকার ছিল, হিনার স্বীকারক্তি।
---" দিদি, বাবার
ভালো থাকা খুব জরুরী। ঠাকুমা, ঘর বাড়ি -- বাবা না থাকলে সব আবার জংগল। আমাকে মার হাত থেকে বাঁচাতে খুন টা করলেন বাবা।
দিদি,আমি না থাকলে কারো কোনো যায় আসে
না। "
মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো এক অসহায় প্রাণ।
শরীর বলে মনের কথা। স্যারের
চেম্বারে ঢুকে হিনাকে মা মেরীর ছবির সামনে মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বুঝেছিলাম, এই মেয়ের মনে মায়ের জন্যআছে হাহাকার। যতই রাগ থাক, মাকে খুন করতে পারবে না।
হিনার বাবার যা সাজা হবার পুলিশ বুঝবে, তবে এমন বাবা মার জন্য আমার কোন অনুতাপ নেই। মেয়ের জীবন শেষ করে যে বাবা মা তাকে ছেড়ে দেয় জংগলের অন্ধকারে, তাদের
এমন শাস্তিই প্রাপ্য।
আর হিনা? যারা লড়তে জানে পৃথিবীতে তারা
ঠিক জায়গা করে নেয়। হিনাও বাঁচবে। একলাই বাঁচবে।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
জয়তী
রায়
অসাধারণ । গায়ে কাঁটা দিল ।
উত্তরমুছুন