শনিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

সম্পাদকের কলমে : শ্রীশুভ্র



সম্পাদকের কলমে
শ্রীশুভ্র

যাই যাই শীতের আমেজে জমে উঠেছে ৪৩তম আন্তর্জাতিক কলিকাতা পুস্তকমেলা। মরশুমটা উৎসবের। সেই উৎসবের আরও একটি পার্বণ এই বইমেলা। এবং গ্রন্থ প্রকাশ। যদিও গ্রন্থ প্রকাশের বেশির ভাগটাই দখলে নিয়ে রেখেছে স্বনির্বাচিত কবিতার বই। প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে প্রচুর কবিতার বই। কবিতা সংকলনের এই সুনামিতে সকলেরই হাসি হাসি মুখের ছবি সোশ্যাল নেটওয়ার্কের নানান সাইট জুড়ে। আনন্দ আর তৃপ্তির পরিবেশে জমে উঠেছে উৎসব। সেই উৎসবের মধ্যেই প্রকাশিত হচ্ছে রংরুট দ্বিতীয় বর্ষের চতুর্থ তথা অন্তিম সংখ্যা মাঘ ১৪২৫। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথেই জানাতে বাধ্য হচ্ছি এই সংখ্যায় আমরা লেখকদের উৎসাহ আগ্রহ থেকে সম্পূ্র্ণ বঞ্চিত হয়েছি। হয়তো সকলেই এইসময় বইমেলা নিয়ে অতীব ব্যস্ত বলেই সময় মতো লেখা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন নি। অনেকেরই এই সময় বই প্রকাশের ব্যস্ততা রয়েছে। অনেকেই বইমেলা নিয়েও ব্যস্ত। ফলত সময় মতো লেখা না পাওয়ায় রংরুটের বর্তমান সংখ্যাটি ক্ষীণ কলেবরেই প্রকাশিত করতে বাধ্য হলাম আমরা।

এখানে আরও একটি কথা বোধহয় প্রাসঙ্গিক ভাবেই উঠে আসে। যেহেতু রংরুট একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা, সেই কারণেই অনেক আগে থেকেই আমরা লেখা পাঠানোর আমন্ত্রণ পাঠিয়ে ছিলাম প্রত্যেকের কাছে। হ্যাঁ, বইমেলা শুরুর অনেক আগে থেকেই। আমাদের আশা ছিল, মাস কয়েক আগেই আমরা যথেষ্ট সংখ্যক লেখা পেয়ে যাবো। সেই মতোই প্রস্তুতি নিয়েছিল রংরুট। দুর্ভাগ্য আমাদের সেটিও ফলপ্রসূ হয় নি। তাই প্রাসঙ্গিকক্রমেই মনে হওয়া স্বাভাবিক, হয় রংরুট সম্পর্কে লেখকদের আগ্রহের অভাব ঘটেছে নয়ত মূলত প্রবন্ধধর্মী গদ্য লেখার মতো লেখকদের সংখ্যা দিনে দিনে ক্রমহ্রাসমান। অনেকেই কবিতা লেখাতেই অধিকতর স্বচ্ছন্দ হয়তো। তাই রংরুটে কবিতা প্রকাশের পরিসর থাকলে হয়তো এমনটি নাও হতে পারতো এই একই সময় সীমায়। জানি না রংরুটের মতো একই অভিজ্ঞতার শরিক অন্যান্য গদ্যধর্মী পত্রিকাও কিনা। তবে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থেকে দুটি বিষয় পরিস্কার। প্রথমত আমাদের সমকালে বিষয়ধর্মী মৌলিক প্রবন্ধ বা গদ্য লেখকের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। উল্টোদিকে কবিতা লেখায় উৎসাহী ও আগ্রহীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনলাইন পত্রিকাগুলি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেই সেটি বোঝা যায়। দ্বিতীয়ত হয়ত ত্রৈমাসিক পত্রিকা হওয়ার কারণেই লেখকরা রংরুট সম্পর্কে আগ্রহও হারিয়ে ফেলছেন। তাই তাঁরা আর আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার মতো উৎসাহ বোধ করছেন না। একটি লেখা পাঠিয়ে মাসাধিক কাল অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য্য হয়তো অনেকেরই নাই। যেখানে মাসিক অনলাইন পত্রিকার কোন অভাব নাই চারপাশে। রংরুটের পক্ষে এই দুটি কারণই একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে সন্দেহ নাই। ঠিক এইরকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই রংরুটের মাঘ ১৪২৫ সংখ্যাটি প্রকাশ করতে হলো আমাদের।

ত্রৈমাসিক রংরুটের আত্মপ্রকাশের পেছনে সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য ছিল। আমাদের চারপাশের সমাজ, রাষ্ট্র অর্থনীতি শিল্প বাণিজ্য ও রাজনীতির আবর্তে কিভাবে আবর্তিত হচ্ছে। সেই আবর্তনের পরিসরে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন সাধ সাধনা কিভাবে সংকটাপন্ন হচ্ছে। সেই সব বিষয়গুলি নিয়ে নিরন্তর যুক্তি তর্কের ভিতর দিয়ে সদর্থক আলাপ আলোচনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল রংরুটের অভিপ্রায়। সেই অভিপ্রায় নিয়েই আমরা পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের সাথে যোগাযোগ করি, বর্তমান সময়ের রংরুটে চলা সামজ সংসার নিয়ে তাঁদের চিন্তা ভাবনার প্রতিফলনকে একত্রিত করে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে। আমাদের মনে হয়েছিল আজকের সময়ে অনলাইনের সুযোগ ও সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যের অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে আমাদের চিন্তা ভাবনার অভিমুখকে মৌলিক শক্তিতে শক্তিশালী করে তোলার। মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত সময়ে মৌলিক চিন্তাভাবনার পরিসর দিনে দিনে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। মানুষ সেটাই ভাবতে ও বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে, মিডিয়া তাকে যেটা ভাবতে ও বিশ্বাস করতে বলছে। মানুষের সমাজ ও সভ্যতায় মিডিয়ার এমন সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ এক চরমতম অভিশাপ বলেই আমাদের বিশ্বাস। মিডিয়ার এই সার্বিক নিয়ন্ত্রণ শাসক ও বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলির স্বার্থরক্ষার কাজে যতটাই আশীর্বাদস্বরূপ, সাধারণ মানুষ ও সমাজের পক্ষে ততটাই অভিশাপ বয়ে নিয়ে আসে। আসবে। সেইখানে দাঁড়িয়ে বর্তমান সময়ে রংরুটের মতো পত্রিকার প্রয়োজন বেশি করেই দেখা দেওয়া উচিৎ। হ্যাঁ সেই প্রয়োজন একটিমাত্র পত্রিকার পক্ষে কখনোই মেটানো সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের আশা ছিল, রংরুটের এই প্রয়াসে অন্যান্য অনেকেই উৎসাহী হয়ে উঠবেন। এবং এই পথে সামিল হবেন নিজেদের মতো করে।

সেই আশাতেই আমরা বিগত দুটি বছর ধরে ত্রৈমাসিক রংরুটকে এগিয়ে নিয়ে চলার একটা চেষ্টা করেছি। আমরা জানি, যে কোন পথেই এগিয়ে চলা সহজ সাধ্য নয়। অনেক বাধা বিঘ্ন পার হয়েই এগোনোর পথ তৈরী করে নিতে হয়। কোন পথই এগিয়ে চলার জন্য আগে থেকে তৈরী থাকে না। আর ঝাঁ ঝকঝকে তৈরী পথের ঠিকানা অধিকাংশ সময়েই গোলকধাঁধায় গিয়ে শেষ হয়। ফলে রংরুটের পথও নয় মসৃণ। কিন্তু তবুও আমাদের ভেবে দেখার দরকার, চারিদিকে মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত এই যে একটি উৎসবের আবহাওয়া, মনে হয় সকলেই বেশ তো আছে। সমাজ সংসার তো ঠিকই এগিয়ে চলেছে নিজের মতো। সেই চিত্রের ভিতর আসল সত্য কতটুকু। আর কতখানি বানিয়ে তোলা গল্প। সেই গল্পটুকুই সঠিক ভাবে ধরার মতো মৌলিক চিন্তাশক্তিকে নিরন্তর ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য স্বচেষ্ট আমাদের রাষ্ট্র, অর্থনীতি, শিল্প বাণিজ্য, রাজনীতি। তার বিপ্রতীপে গিয়ে স্পষ্ট চোখে তাকানোর জন্য যে হিম্মত লাগে, দুঃখের বিষয়, সেইটুকুই আমরা হারিয়ে ফেলছি দিনে দিনে। আমাদের সকলেরই চোখে আত্মপ্রসাদী চশমা। যে যার মতো যতটুকু গুছিয়ে নিতে পেরেছি, পারছি ও পারার চেষ্টা করছি,  ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থেকে তাকিয়ে দেখছি আমাদেরই চারপাশ নেলসন আইয়ের মতো করেই। কথায় বলে চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। প্রতিদিনকার আমিটুকু নিয়ে আমরা প্রায় প্রত্যেকেই প্রতিদিনই ভুলে থাকে সেই সত্য। এখানেই আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের সঠিক পথের দিশা। সেই সঠিক পথের দিশার অভিমুখেই স্পর্ধিত পা রাখার চেষ্টা করেছিল রংরুট। দরকার ছিল শুধু সমমনের চিন্তাশীল লেখকদের আন্তরিক সহযোগিতার।

বাণিজ্য নিয়ন্ত্রীত রাজনীতির যে অভিমুখে আমাদের বর্তমান অবস্থান, সেখানে ওয়েলফেয়ার স্টেটের বাস্তব কোন অস্তিত্বই আজ আর নাই। সরকারের প্রধান কাজ বাণিজ্যগোষ্ঠীগুলির মুনাফার স্বার্থ রক্ষা করা। আর জনগণের দৃষ্টিকে ঘুলিয়ে দিয়ে অন্য দিকে ব্যস্ত রাখার জন্যে নিত্য দিনের নানান রকমের সরকারী বেসরকারী পরিকল্পনা। তার প্রচার ও প্রসারের ভার মিডিয়ার উপর ন্যাস্ত। এই যে জনসাধারণের দৃষ্টিকে ঘুলিয়ে দিয়ে অন্য অনেক কিছুতে ব্যস্ত রাখার সংস্কৃতি, এরই গালভরা নাম গণতন্ত্র। ভোট যার মানদণ্ড। দিকভ্রান্ত জনগণকে বেকুব ও মূক করে রাখতে সত্যই গণতন্ত্রের জুড়ি মেলা ভার। আর ঠিক এই কারণেই বিগত এক শতক বিশ্বব্যাপি গণতন্ত্রের এমন রমরমা। না গণতন্ত্রের থেকে ভালো কোন বিকল্প পথের হদিশ আছে কিনা জানা নাই। তবু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে গণতন্ত্রের বেআব্রু চেহাড়া দেখলে সত্যই মাথা ঘোরে। ঠিক সেই কারণেই আরও বেশি করে মানুষের সংঘবদ্ধ হয়ে বাস্তব পরিস্থির বাস্তবচিত পর্যবেক্ষেণ করার অভ্যাস তৈরী করা বেশি করে জরুরী। আজও যদি আমরা সেটি না করতে পারি, তবে আগামী শতক কখনোই ক্ষমা করবে না আমাদের। অনেকেই আমরা ভুলতে বসেছি সহজ এই সত্যটুকুই। আর সেখানেই থেমে গিয়েছি আমরা। আর তাই এগিয়ে চলার পথটা তখনই আর আমাদের হাতে নাই। সে পথের নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছে অন্যের হাতে। এগিয়ে চলেছি আমরা সেই নিয়ন্ত্রীত পথরেখা ধরেই সম্পূর্ণ রংরুটে।

শ্রীশুভ্র