শনিবার, ২৬ মে, ২০১৮

গণতন্ত্রের রংরুট - শ্রীশুভ্র



গণতন্ত্রের রংরুট!
শ্রীশুভ্র

সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ বেশ কয়েকটি সত্যকে খুব দৃঢ় ভাবেই প্রতিষ্ঠিত করে গেল। যদিও কয়েকটি মামলা এখনো সুপ্রীম কোর্টে ঝুলে রয়েছে। সেগুলির শেষ রায় না জানা অব্দি শেষ কথা বলাও যায় না। তবে ধরে নেওয়া যাক এবারের এই নির্বাচনী ফলাফল যদি সত্যই সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েই যায়, তাহলে বেশ কয়েকটি সত্য কিন্তু দিনের আলোর মতোই সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমতঃ, বিরোধী রাজনৈতিক প্রার্থীদেরকে মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে না দেওয়ার মতো অসাংবিধানিক কাজও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সাংবিধানিক বৈধতা লাভ করতে পারে, যদি শাসকদল সরকার ও নির্বাচন কমিশন সম্মত হয়। দ্বিতীয়তঃ কোন নির্বাচনের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে শাসকদলের দুষ্কৃতিদের বোমা বন্দুক গুলির কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিরোধী প্রার্থীদের নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারার বিষয়টিও সাংবিধানিক পরিসরে অসম্ভব কিছুই নয়। তৃতীয়তঃ এক তৃতীয়াংশের বেশি আসনের ফলাফল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্থির হয়ে যাওয়াও সাংবিধানিক ভাবে বৈধ হতে পারে। চতুর্থতঃ মাত্র দুই তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হলেও সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা অক্ষুণণ্ণই থাকে।

এরপরেও যে কয়েকটি বিষয় এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বৈধতা পেয়ে গেল, সেগুলির মধ্যে সকলের আগেই থাকবে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যত বেশি মানুষই খুন হোক জখম হোক না কেন, সহিংস নির্বাচন প্রক্রিয়া সাংবিধানিক ভাবেই আর অবৈধ কোন বিষয় নয়। সংবিধানের সাংবিধানিক পরিসরেই নির্বাচন আর মৃত্যুমিছিলের পারস্পরিক সহাবস্থান সংবিধান স্বীকৃত। অনেকেই তীব্র প্রতিবাদ করে উঠবে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মানুষের মৃত্যুমিছিল ভারতীয় গণতন্ত্রে নতুন কোন ঘটনা নয়। কম বেশি সকল নির্বাচনেই এটি ঘটে থাকে। অনেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনগুলির মৃত্যুর খতিয়ান মেলে ধরে প্রমাণ করতে চাইবেন, কোন নির্বাচনে কত বেশি সংখ্যক মানুষ মারা গিয়েছিল কোন সরকারের শাসনে। খুবই সত্য কথা। কেউই সেসব তথ্য নিয়ে অযথা বিতর্ক তুলবেন না নিশ্চয়। কারণ তথ্যগুলি সত্যমূলক। কিন্তু সেটি কি এই কথাই প্রমাণ করে না, ভারতীয় সাংবিধানিক পরিসরেই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মানুষের মৃত্যুও অত্যন্ত একটি স্বাভাবিক ঘটনা। অর্থাৎ বিগত যে সকল নির্বাচনে এইরকম ভাবেই মানুষের মৃত্যমিছিল সংঘটিত হয়েছে, সেই সব নির্বাচনের কোনটিই অবৈধ বলে ঘোষিত হয় নি। এই তথ্যও তো সত্য। কে অস্বীকার করতে পারেন? অর্থাৎ ঠিক যে কথা আগে বলা হয়েছে, সহিংস নির্বাচন প্রক্রিয়া সাংবিধানিক ভাবেই আর অবৈধ কোন বিষয় নয়। সংবিধানের সাংবিধানিক পরিসরেই নির্বাচন আর মৃত্যুমিছিলের পারস্পরিক সহাবস্থান সংবিধান স্বীকৃত। ফলে ক্ষেত্র বিশেষে নির্বাচন আর নরমেধ যজ্ঞের মধ্যে ফারাক খুব সামান্যই। ঠিক যেটা এবারের সাম্প্রতিক এই নির্বাচনে দেখা গেল।

এবারের এই পঞ্চায়েত নির্বাচন আরও যে বিষয়টির উপর আলোকপাত করে গেল, সেটি হলো, প্রশাসনের মদতে দুষ্কৃতিদের সহিংস তাণ্ডবে পরিচালিত নির্বাচনও সাংবিধানিক বৈধতা লাভ করতে পারে। পারে যদি সরকার ও নির্বাচন কমিশন শাসকদলের সাথে জোট বাঁধে। সংবিধানের পরিসরেই এই ধরণের জোটের সহায়তা নিয়েই দুষ্কৃতিদের তাণ্ডবে নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব। অনেকে এরপরেও বলবেন, আমাদের দেশে এ আর নতুন কথা কি। অনেকে পাল্টা যুক্তি দেবেন, আগে টিভি ক্যামেরার চল ছিল না, তাই প্রমাণ ছিল না। ফলে এসব আদৌ নতুন কোন ঘটনা নয়। সত্যই নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু নয় বলেই তো রোগটা আরও ভয়বহ। আরও গভীরের। নতুন ঘটনা হলে তো বিষয়টির গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত লঘু হতে পারতোঅবস্থা কিন্তু তেমন নয়। সারা দেশের মানুষে টিভির পর্দায় লাইভ দেখতে পেল, কিভাবে রাজনৈতিক দুষ্কৃতিরা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে বুথের পর বুথ দখল করে ভোটারদেরকে সন্ত্রস্ত করলো, কিভাবে বুথের পর বুথে ছাপ্পা ভোট চলল অন ক্যামেরা। এমনকি এবারেই প্রথম দেখা গেল, ভোট গণনাকেন্দ্ররও দখল নিয়ে অন ক্যামেরা কিভাবে ছাপ্পা ভোট দিয়ে গেল শাসকদলের রাজনৈতিক কর্মীসমর্থকরাই। এবং তারপরেও সেই ভোটের ফলাফল সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েও গেল নির্বাচন কমিশন কর্তৃক। অনেকেই প্রতিবাদ করবেন, কেন অনেক বুথেই তো রিপোল হয়েছে। হয়েছে, কিন্তু কতশতাংশ বুথে? মোট ছাপ্পাভোট দেওয়া হয়েছে কত শতাংশ বুথে, আর মোট রিপোল হয়েছে কতশতাংশ বুথে। সেই অনুপাতটা কে প্রমাণ করবে? সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়ই নয়। অর্থাৎ এইসমস্ত অসাংবিধানিক কাজই ঘটানো সম্ভব ভারতবর্ষের সাংবিধানিক পরিসরেই। মূল সত্যটুকু কিন্তু এইখানেই। যতক্ষণ না এইসব নির্বাচন অবৈধ বলে ঘোষিত হচ্ছে, ততক্ষণ এই বৈধতাই সত্বসিদ্ধঃ।

মানুষের ভোট না হলেও, দুষ্কৃতিদের ভোটও নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি মোতাবেক সাংবিধানিক বৈধতা পেয়ে যেতে পারে। সেই সত্যই নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলো সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনে। মনোনয়ন আটকানো, বুথ দখল, ভোটারদের সন্ত্রস্ত করা, ছাপ্পা ভোট দেওয়া, প্রার্থীদের উপর জুলুমবাজি করা, ব্যালট বক্স লুঠ করা। প্রিসাইডিং অফিসারকে অপহরণ ও খুন করা, না এসবের কোনটারই কিন্তু কোন আইনি স্বীকৃতি নাই। থাকা উচিতও নয়। কিন্তু তারপরেও যদি সেই ভোটের ফলাফলই আইনী স্বীকৃতি পেয়ে যায়, তবে বলতেই হবে মৃত্যু হয়েছে প্রকৃত গণতন্ত্রের। এবং আইনের ফাঁকফোঁকরগুলি দিনে দিনে এমনই চওড়া হয়ে উঠেছে যে সংবিধানও বস্তুত ঠুঁটো জগন্নাথে পর্যবসিত হয়েছে। বিরেধী রাজনৈতিক দলগুলির বারবার আইনের চৌকাঠে মাথাঠোকা নিয়ে যারা ব্যঙ্গবিদ্রুপ করছেন, তারা আজ আইনের চওড়া ফাঁকফোঁকরের হাত ধরে যেসব অনৈতিক সুযোগের সদ্ব্যাবহার করছেন, একদিন কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, তাদেরকেও মাথা ঠুকতে হতে পারে ঐ আইনের চৌকাঠেই। আর জনগণের যে অংশ বিরোধীদলগুলির বারংবার আদালতের দারস্থ হওয়া দেখে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁরা হয়তো শাসন ক্ষমতায় থাকাকালীন এইসব বিরোধীদলগুলির আগের ইতিহাসগুলি মনে রাখতে পারছেন না ততটা।

যে কোন গণতান্ত্রিক শাসন প্রণালীর রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই এই পরিস্থিতি এই পরিণতি স্বৈরতন্ত্রের অশনি সংকেত বয়ে নিয়ে আসে। এই পথ যে গণতন্ত্রের পক্ষে রংরুট, আমাদের বুঝতে হবে সেই কথাই। এই পথেরই পরবর্তী স্টেশন স্বৈরতন্ত্র। বিরোধীশূন্য নির্বাচন, বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত কোনভাবেই গণতন্ত্রের পরিসর হতে পারে নাএটাই স্বৈরতন্ত্রের পদধ্বনি। এখন প্রশ্ন দুটি। ভারতীয় সংবিধান কিভাবে তার গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে সুদৃঢ় করে তুলবে, কিভাবে তার সাংবিধানিক বিধিবিধানের দুর্বলতর অংশগুলিকে চিহ্নিত করে মেরামত করবে। এবং জনগণ কিভাবে এই অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রের পদধ্বনি থেকে রক্ষা করার যুদ্ধে অগ্রসর হবে সেইটিই। এখন দেখার আরও কতদিন চলতে থাকবে গণতন্ত্রের এই রংরুট।

অনিবার্য কারণবশতঃ রংরুটের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশে অনভিপ্রেত বিলম্বের কারণে আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। সংখ্যাটি প্রকাশের কথা ছিল পঁচিশে বৈশাখ। অবশেষে নজরুল জয়ন্তীতে সংখ্যাটি প্রকাশ করতে পারার জন্যে সংশ্লিষ্ট সকল লেখক বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীর প্রতি রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা। এবারের সংখ্যায় প্রচ্ছদকাহিনীতে চিরবিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অপর্ণ করেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শ্রী ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। এই সংখ্যায় আমরা মুখোমুখি পেয়েছি দুইজন বিশিষ্ট বাঙালিকে। তাঁদের সাথে আলাপে উঠে এসেছে সমাজ ও সমকাল বিষয়ে তাঁদের গভীরতর চিন্তাভাবনার বিষয়গুলি। তার জন্যে তাঁদের দুজনের কাছেই রইল আমাদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা। সংখ্যাটিকে গল্প ও অন্যান্য প্রবন্ধ দিয়ে সমৃদ্ধ করলেন যাঁরা তাঁদের প্রতিও রইল আমাদের আন্তরিক ভালোবাসা

  শ্রীশুভ্র