বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

জোবায়েন সন্ধি~রংরুট সাক্ষাৎকার

এখানকার বাম বলে পরিচিতরা আসলে বাম নয় এদের কোন কোন ধারা বাঙালির আত্মপরিচয় নামক যে জিনিশকে বিশেষত্ব দিতে পেরেছে বলে মনে করে, তা আসলে কোন বাঙালি আত্মপরিচয় নয় বস্তুত বাঙালিত্ব বলে এখানে কোনকালেই কোন কিছু ছিল না ওটা কতিপয় ইউরোপিয়ান ধ্যানধারণাজাত সুবিধাবাদী অভিজাতের ইউটোপিয়া বাম আন্দোলন বলে আর কোন জিনিশের পূণরাভূত্থান হচ্ছে না, হবার সম্ভাবনাও দেখিনা তবে জগৎ যেভাবে লেংচে লেংচে চলছে সেভাবেও আর বেশিদিন চলবে বলে মনে হয় না ভোগ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, এমনকী তার আকাঙ্ক্ষাও মুখে ঠুসি দিয়ে কুকুরকে বিষ্ঠা ভক্ষণ থেকে বিরত রাখা যায় না, সেটা করাটাও একটা অমানবিক  অনধিকার চর্চা ভোগ বস্তুত মানুষের অধিকারও তবে এটা ঠিক যে, একটা ভূল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পৃথিবী আগাচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয় কিন্তু আকাশ থেকে একটা দৈত্য এসে এটাকে শুধরিয়ে দিবে এই আশা ঘোরতর অলীক বিশ্বাসীও করেন না তো মানবিক মূল্যবোধ-এর মত জিনিশ কোথা থেকে কীভাবে আসবে?~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

রংরুট সাক্ষাৎকার
জোবায়েন সন্ধি

রংরুট: কখনো কি মনে হয়েছে ৭১-এর স্বাধীনতা রংরুট ধরেই এগিয়ে চলেছে? অন্তত বিগত চার দশকের নিরিখে। বিশেষ করে এই প্রশ্নটি দিয়েই আপনার সাথে আলাপটুকু শুরু করার কারণ আর কিছুই নয়, বিগত চার দশকের স্বাধীনতার প্রাপ্তি আর অভিজ্ঞতার বাটখারায় বাঙালির সার্বিক উন্নতির রেখাচিত্রটি কি অনেকটাই বেঢপ দেখায় না? আপনার মতামত

জোবায়েন সন্ধি: ধন্যবাদ রংরুটের সকল পাঠকদের জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, ৭১-এর স্বাধীনতা অবশ্যই রংরুট ধরে এগিয়েছে খুবই বেঢপ


রংরুট: একটি দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার বাতাবরণ কতটা জরুরী বলে মনে করেন আপনি? বাংলাদেশের সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনাটিকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে গেলে কিভাবে এগনো দরকার?  না কি জনমানসের মূল আবেগ যদি ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধেই থাকে তবে সেই আবেগকেই সম্মান জানানো জরুরী? আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপনার মতামত।

জোবায়েন সন্ধি: জরুরী নয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না জনমানসের আবেগকেই সম্মান জানানো উচিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে যে জিনিশ বাংলাদেশে গেলানোর চেষ্টা করা হয় তার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার কোন সম্পর্ক নেই যারা এদেশে এটা চর্চা করে তারা সব সুবিধাবাদী, রাবিশ এককথায়!


রংরুট: সুদীর্ঘ বাম আন্দোলনের ঐতিহ্য বাঙালির আত্মপরিচয়কে কতটা বিশেষত্ব দিতে পেরেছিল বলে আপনার ধারণা। এবং একই সাথে ক্ষমতা কেন্দ্রিক মানুষের ভোট কুক্ষিগত করে রাখার যে রাজনীতি তা কিভাবে বাম ঐতিহ্যকে ধুলিসাৎ করল শেষমেষ? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই বিশ্বে বাম আন্দোলনের পূনরাভ্যুত্থান কি আর সম্ভব আদৌ?

জোবায়েন সন্ধি:  প্রথমত: এখানকার বাম বলে পরিচিতরা আসলে বাম নয় এদের কোন কোন ধারা বাঙালির আত্মপরিচয় নামক যে জিনিশকে বিশেষত্ব দিতে পেরেছে বলে মনে করে, তা আসলে কোন বাঙালি আত্মপরিচয় নয় বস্তুত বাঙালিত্ব বলে এখানে কোনকালেই কোন কিছু ছিল না ওটা কতিপয় ইউরোপিয়ান ধ্যানধারণাজাত সুবিধাবাদী অভিজাতের ইউটোপিয়া বাম আন্দোলন বলে আর কোন জিনিশের পূণরাভূত্থান হচ্ছে না, হবার সম্ভাবনাও দেখিনা তবে জগৎ যেভাবে লেংচে লেংচে চলছে সেভাবেও আর বেশিদিন চলবে বলে মনে হয় না


রংরুট: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও পূর্বইউরোপের পটপরিবর্তনের হাত ধরে বর্তমানের একমেরু বিশ্ব মানুষের মৌলিক অধিকারগুলির পক্ষে কতটা বিপদসংকুল বলে আপনি মনে করেন? নাকি সমাজতন্ত্রের লৌহযবনিকার আড়াল উঠে যাওয়াতেই মানুষের মৌলিক অধিকার অধিকতর সুরক্ষিত এখন? আপানার অভিমত।

জোবায়েন সন্ধি: সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বা তার পতনের সাথে সমাজতন্ত্রেও বস্তুত কোন সম্পর্ক ছিল না বা নেই তবে সোভিয়েত শক্তি বৈশ্বিক ক্ষমতাকেন্দ্রে একটা ভারসাম্য রেখেছিল ওটা মানুষের জন্য, পৃথিবীর জন্য খারাপ হচ্ছিল না, কিন্তু যেভাবে চলছিল সেটা ভাঙতোই; ভেঙ্গেছেও এরপর থেকে মানুষের অধিকার সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে খারাপতম অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মানবসমাজ এতোটা ভণ্ডামীর মধ্য দিয়ে আগে কখনই যায় নি 


রংরুট: সারা বিশ্বের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির মধ্যে দিয়েই অনেকেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি চর্চার মধ্যে সুকৌশলী স্বৈরতন্ত্রের ক্রমবিকাশের অশনি সংকেত দেখছেন। এর পিছনে কি ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদেরই বলিষ্ঠ হাত রয়েছে? এই প্রসঙ্গে মুসোলিনির একটি উক্তি মনে পড়ছে, “Fascism should more appropriately be called corporatism because it is a merger of state and corporate power.’ -- Benito Mussolini” আপনার অভিমত।

জোবায়েন সন্ধি: কোন সন্দেহ নাই


রংরুট: আজকে একদিকে বিশ্বায়ন ও আর একদিকে ইনটারনেট বিপ্লবে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নতিতে আপনার কি মনে হয়, দেশীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার যে গণ্ডীবদ্ধতা তৈরী করে- যাতে মানুষে মানুষে অন্তত সাংস্কৃতিক ও মানসিক একটি বিভাজন রেখার দূরত্ব রয়েই যায়; অদূর ভবিষ্যতে মানুষ সেই দূরত্বের বিভাজন রেখা মুছে ফেলে বিশ্বমানবতায় পৌঁছাতে পারবে কি অনেক সহজেই?

জোবায়েন সন্ধি: প্রথমত বিশ্বায়ন আর ইন্টারনেট বিপ্লব একদিক আর একদিক নয়, দুটো আসলে একই দিক আর দেশীয় ঐতিহ্যের বিভাজন মুছে যে জিনিশ তৈরি হবে তা দিয়ে আর যাই হোক বিশ্বমানবতা হবে না আবার তা রক্ষারও কোন বাস্তব শর্ত এই বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান নেই, ফলে বিশ্ব মানবতা নামক যে ফেইক জিনিশের কথা এখানে না বলে উল্লেখ করেছেন তা হবার আপাতত কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না!


রংরুট: আধুনিক জীবনে ভোগবাদ মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিভুমিকেই টলিয়ে দিয়েছে এমানটাই যদি কেউ ভাবেন, সেই ভাবনাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? ভোগবাদের বিস্তারের সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সমানুপাতিক সম্পর্ক সেকথা মাথায় রেখেও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে ভোগবাদের ভুমিকাকে কি কোন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন আপনি?

জোবায়েন সন্ধি: ভোগ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, এমনকী তার আকাঙ্ক্ষাও মুখে ঠুসি দিয়ে কুকুরকে বিষ্ঠা ভক্ষণ থেকে বিরত রাখা যায় না, সেটা করাটাও একটা অমানবিক  অনধিকার চর্চা ভোগ বস্তুত মানুষের অধিকারও তবে এটা ঠিক যে, একটা ভূল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পৃথিবী আগাচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয় কিন্তু আকাশ থেকে একটা দৈত্য এসে এটাকে শুধরিয়ে দিবে এই আশা ঘোরতর অলীক বিশ্বাসীও করেন না তো মানবিক মূল্যবোধ-এর মত জিনিশ কোথা থেকে কীভাবে আসবে?


রংরুট: আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তার স্বাধীনতার পরিসর ও নাগরিক জীবনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এই দুইয়ের মধ্যে ফারাকই বা কতটা ও সামঞ্জস্য বিধানই বা কি ভাবে সম্ভব? অবশ্যই এই ফারাক ও সামঞ্জস্য বিধান এক এক অঞ্চলে এক এক সমাজ ও রাষ্ট্রে এক এক রকম হওয়ারই কথা। কিন্তু বিশ্বায়ন কি এই বিষয়ে সঠিক কোন দিশা দিতে পারবে বলে মনে হয়?

জোবায়েন সন্ধি: সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব নাহ আবার বিশ্বায়নও কোন সঠিক দিশা দিতে পারবে না


রংরুট: সাহিত্য দর্শন বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিবর্তনের পথে আমরা যে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি, সে কথা হয়তো বলাই যায়। কিন্তু সমাজ সংসার বিবর্তনের পথে বিগত দুই হাজার বছরের হিসাবটুকুই যদি ধরি খৃষ্টাব্দের সূত্রে- তাহলে সত্যই কতটুকু এগোলো মানুষের সমাজ সংসার সভ্যতা? আপনার মূল্যায়ন।

জোবায়েন সন্ধি: বিশ্বব্যাপী প্রেম, ভালোবাসা সমাজ চেতনাবোধের অসংখ্য নজির থাকলেও বস্তুত মানুষ সুখি নয় মানুষের ভেতরে ভালোবাসাহীন এক অতৃপ্ত হাহাকার সর্বদা বিরাজমান, সামাজিক অবক্ষয়ের ছড়াছড়ি এর কারণ হিসেবে বলা যায় আমাদের ভেতরে মানবিক বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার শিক্ষার অভাব রয়েছে আমরা যদি সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানবিক মূল্যবোধগুলি চর্চার পাশাপাশি তা আত্মস্থ করতে পারতাম তাহলে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির তুলনায় ভারতবর্ষের মানুষরাই হতো সবচেয়ে মানবিক সুখি মানুষ গড়ে উঠতো সবচেয়ে মানবিক সমাজ, সভ্যতা ইতিহাস


রংরুট: সবশেষে এসে শুরুর সেই সূত্রটুকুর স্মরণে জানতে চাইবো; রংরুটই বলুন আর অগ্রগতিই বলুন সাধারণ মানুষের জন্যে এই বিশ্ব কতটা নিরাপদ আজ, কারণ সেইখানেই বিশ্বমানবতার নোঙরটি ফেলতে হবে না কি আমাদের?

জোবায়েন সন্ধি: সাধারণ মানুষের জন্য এই বিশ্ব মোটেই নিরাপদ নয় আর আগেই বলেছি যেহেতু বিশ্বমানবতা নামক ফেইক জিনিশের প্রতিষ্ঠা পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, সেহেতু নোঙর ফেলার স্বপ্নেরও বাস্তবরূপ আশা করা অসম্ভব ব্যাপার

জোবায়েন সন্ধি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জার্মান প্রবাসী নির্বাসিত লেখক, কবি মুক্তমনা ব্লগার জার্মান সরকারের আর্থিক সহায়তায় লেখক সংগঠন জার্মান পেন সেন্টার- 'নির্বাসিত লেখক' হিসেবে বসবাস করছেন তিনি হানোভার ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে বাংলাদেশের ধর্মীয় উগ্রবাদ সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি বিষয়ে একাধিকবার গবেষণামূলক প্রবন্ধপাঠ করেছেন এবং সাহিত্য একাডেমি 'লিটারেচার হাউস হানোভার' 'সাহিত্যাঙ্গনে মুক্তচিন্তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা' বিষয়ে সম্প্রতি বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করে বক্তৃতা করেছেন এবছর ডর্টমুন্ড- জার্মান কবি সাহিত্যিকদের বাৎসরিক কংগ্রেসে বাংলাদেশের লেখক হিসেবে বাঙলায় কবিতাপাঠ করেছেন, যা জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে গতবছর জোসেফ হোসলিংগার ফ্রান্সিসকা স্পারের সম্পাদনায় ডয়েচভাষায় প্রকাশিত তাঁর লেখা নিবন্ধগ্রন্থ (Zuflucht in Deutschland: Texte verfolgter Autoren) জার্মান পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে লেখালেখির বাইরে তিনি মানবাধিকার, মুক্তচিন্তা মতপ্রকাশের অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুভমেন্টের সাথে যুক্ত জনাব সন্ধি মতপ্রকাশের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম নবযুগ ব্লগের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এছাড়াও 'অংশুমালি' নামক ত্রৈমাসিক সাহিত্য ম্যাগাজিনেরও তিনি সম্পাদক


রংরুট সম্পাদকমণ্ডলীর পক্ষে থেকে আপনার সহযোগিতার জন্যে আন্তরিক ধন্যবাদ।