বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

সুমেরু রায়চৌধুরী~রংরুট সাক্ষাৎকার

পশ্চিম বঙ্গে বামপন্থার প্রচলন প্রায় শত বর্ষের। তার মানে এই নয় বাঙ্গালীরা বামপন্থী। শতবর্ষ প্রাচীন যে বাম আদর্শ পশ্চিমবঙ্গ ধরে রাখতে পারল, তার ছিটেফোঁটাও পূর্ব বঙ্গ পেল না কেন? এর কারন ধর্মান্ধতা ও ধর্মান্ধতার অভাবের মধ্যে লুকিয়ে। পূর্ব বঙ্গে ধর্মান্ধতার আধিপত্য বামপন্থাকে রুখে দিয়েছে। সেদিকে পশ্চিম বঙ্গে বাম পন্থা চিন্তাধারার আধিপত্য থাকাতে ধর্মান্ধতা এতোকাল মাথা তুলতে পারেনি। বামপন্থার বাংলার বাইরে বিস্তারের অভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামতে এখন আমরা তার ফল ভগ করছি। গত কয়েক বছর পশ্চিম থেকে আগত দক্ষিনপন্থি ধর্মান্ধ শক্তি যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছে তাদেরকে বেড় করে না দিতে পারলে, বামপন্থিদের এ রাজ্যে ফেরা প্রায় অসম্ভব। এর জন্য দরকার সমস্ত দক্ষিনপন্থি ধর্মান্ধ বিরোধী শক্তিকে এক হওয়া। দক্ষিনপন্থি ধর্মান্ধ শক্তিকে বিতাড়নের পর-ই আমরা ঠিক করতে পারব বামপন্থা কোন রাস্তায় চলবে। ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
 
রংরুট সাক্ষাৎকার
সুমেরু রায়চৌধুরী

রংরুট: কখনো কি মনে হয়েছে ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা রংরুট ধরেই এগিয়ে চলেছে? অন্তত বিগত সাত দশকের নিরিখে। বিশেষ করে এই প্রশ্নটি দিয়েই আপনার সাথে আলাপটুকু শুরু করার কারণ আর কিছুই নয়, সাত দশকের স্বাধীনতার প্রাপ্তি আর অভিজ্ঞতার বাটখারায় মানুষের সার্বিক উন্নতির রেখাচিত্রটি কি অনেকটাই বেঢপ দেখায় না? আপনার মতামত।

সুমেরু রায়চৌধুরী: আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে স্বাধীনতার মানে কি। কেবল শাসন করার স্বাধীনতা? সেটা হলে সাধারন মানুষের কিছু যায় আসে না কে শাসন করছে। সাদা সাহেব হোক আর কালো সাহেব, ভোটে নির্বাচিত সরকার হোক বা একনায়ক হোক, তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, সহজ লভ্য হচ্ছে কি না সেটাই তাদের কাছে প্রধান। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা কেবল দেশীও উচ্চবিত্তদের জন্য, তারাই ঠিক করছে কিভাবে তাদের (অর্থাৎ দেশের) আর্থিক ও সামাজিক উন্নতি হবে, যেমনটি করত সাদা সাহেবরা। শিক্ষা, যার সর্বাগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ছিল, সে পেল কই? কেবল সই করাকে স্বাক্ষরতারমাপকাঠি দিয়ে দেখলে চলবে না।      


রংরুট: ভারতবর্ষের রাজনীতিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষতার বাতাবরণ, যেটি বৃটিশ আমল থেকেই কংগ্রেসি নেতৃত্ব দ্বারা সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল, স্বাধীনতার সাত দশক পেড়িয়ে এসে সেই বাতাবরণের ফানুশটিকে কি দিনে দিনে চুপসে যেতে দেখছেন না? না কি ভারতীয় জনমানসের মূল আবেগ সেই বাতাবরণটিকে আরও বহুদিনের জন্যে রক্ষা করতে পারবে। পারবে ভারতীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের বলেই? আপনার মতামত।

সুমেরু রায়চৌধুরী: আর্থিক দুরাবস্থাই হোল ধর্মান্ধতার উৎস। সোজা করে বললে ধর্মান্ধতা দিয়ে আর্থিক দুরাবস্থাকে ঢেকে রাখা যায় বা চেষ্টা করা যায়। এখন যা হচ্ছেযতদিন মধ্যপন্থি বা বামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির জোর ছিল দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার আশা ছিল, কিন্তু দক্ষিণপন্থিদের উত্থানে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রবল আঘাত পেয়েছে। আমাদের জানতে হবে দক্ষিণপন্থিদের কাছে বাম ও মধ্যপন্থিদের পরাজয় কেন হোল আসলে, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যর অভাব-ই ধর্মান্ধতার মুল কারন


রংরুট: আমাদের পশ্চিমবঙ্গে সুদীর্ঘ বাম আন্দোলনের ঐতিহ্য বাঙালির আত্মপরিচয়কে কতটা বিশেষত্ব দিতে পেরেছিল বলে আপনার ধারণা। এবং একই সাথে ক্ষমতা কেন্দ্রিক মানুষের ভোট কুক্ষিগত করে রাখার যে রাজনীতি তা কিভাবে বাম ঐতিহ্যকে ধুলিসাৎ করল শেষমেষ? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই রাজ্যে বাম আন্দোলনের পূনরাভ্যুত্থান কি আর সম্ভব আদৌ?

সুমেরু রায়চৌধুরী: পশ্চিম বঙ্গে বামপন্থার প্রচলন প্রায় শত বর্ষের। তার মানে এই নয় বাঙ্গালীরা বামপন্থী। শতবর্ষ প্রাচীন যে বাম আদর্শ পশ্চিমবঙ্গ ধরে রাখতে পারল, তার ছিটেফোঁটাও পূর্ব বঙ্গ পেল না কেন? এর কারন ধর্মান্ধতা ও ধর্মান্ধতার অভাবের মধ্যে লুকিয়ে। পূর্ব বঙ্গে ধর্মান্ধতার আধিপত্য বামপন্থাকে রুখে দিয়েছে। সেদিকে পশ্চিম বঙ্গে বাম পন্থা চিন্তাধারার আধিপত্য থাকাতে ধর্মান্ধতা এতোকাল মাথা তুলতে পারেনি। বামপন্থার বাংলার বাইরে বিস্তারের অভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামতে এখন আমরা তার ফল ভগ করছি। গত কয়েক বছর পশ্চিম থেকে আগত দক্ষিনপন্থি ধর্মান্ধ শক্তি যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছে তাদেরকে বেড় করে না দিতে পারলে, বামপন্থিদের এ রাজ্যে ফেরা প্রায় অসম্ভব। এর জন্য দরকার সমস্ত দক্ষিনপন্থি ধর্মান্ধ বিরোধী শক্তিকে এক হওয়া। দক্ষিনপন্থি ধর্মান্ধ শক্তিকে বিতাড়নের পর-ই আমরা ঠিক করতে পারব বামপন্থা কোন রাস্তায় চলবে।    


রংরুট: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও পূর্বইউরোপের পটপরিবর্তনের হাত ধরে বর্তমানের একমেরু বিশ্ব মানুষের মৌলিক অধিকারগুলির পক্ষে কতটা বিপদসংকুল বলে আপনি মনে করেন? নাকি সমাজতন্ত্রের লৌহযবনিকার আড়াল উঠে যাওয়াতেই মানুষের মৌলিক অধিকার অধিকতর সুরক্ষিত এখন? আপানার অভিমত।

সুমেরু রায়চৌধুরী: মানুষের মৌলিক অধিকার এখন মোটেই অধিকিতর সুরক্ষিত নয়।ধণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় এক মেরূ বিশ্ব মানুষের মৌলিক অধিকারগুলির পক্ষে ভীষণ বিপদসঙ্কুল। এটা বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন লাগে না। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থাই মানুষের বাঁচার পথ। বর্তমানে ভবিষ্যৎ কোনদিকে বলা মুশকিল। তবে ট্রাম্প-এর বাড় বাড়ন্ত হলে আর একটা বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী। সেটা কি ধরনের বিপ্লব হবে সেটাও বলা মুশকিল। 


রংরুট: সারা বিশ্বের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির মধ্যে দিয়েই অনেকেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি চর্চার মধ্যে সুকৌশলী স্বৈরতন্ত্রের ক্রমবিকাশের অশনি সংকেত দেখছেন। এর পিছনে কি ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদেরই বলিষ্ঠ হাত রয়েছে? এই প্রসঙ্গে মুসোলিনির একটি উক্তি মনে পড়ছে, “Fascism should more appropriately be called corporatism because it is a merger of state and corporate power.’ -- Benito Mussolini” আপনার অভিমত।

সুমেরু রায়চৌধুরী: ক্ষমতা জিনিসটাই স্বৈরতান্ত্রিক। তা সে ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রহোক বা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রসুতরাং নতুন কোন অশনি সঙ্কেত দেখছি না। স্বৈরতন্ত্র হয়ে আসছে ও চলবে যতদিন না রাষ্ট্র সীমানা উঠে যাচ্ছে


রংরুট: আজকে একদিকে বিশ্বায়ন ও আর একদিকে ইনটারনেট বিপ্লবে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নতিতে আপনার কি মনে হয়, দেশীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার যে গণ্ডীবদ্ধতা তৈরী করে- যাতে মানুষে মানুষে অন্তত সাংস্কৃতিক ও মানসিক একটি বিভাজন রেখার দূরত্ব রয়েই যায়; অদূর ভবিষ্যতে মানুষ সেই দূরত্বের বিভাজন রেখা মুছে ফেলে বিশ্বমানবতায় পৌঁছাতে পারবে কি অনেক সহজেই?

সুমেরু রায়চৌধুরী: ইন্টারনেটএর মাধ্যমে চিন্তাশক্তির অবাধ আদান প্রদান অবশ্যই সীমানাহীন পৃথিবীর ইঙ্গিত। এতে মানুষের কল্যান ও সামাজিক উন্নতি বাধ্য। কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে রাশ্ত্রজন্ত্রের বিপদ। খবর আদান প্রদান কন স্বৈরাচারী রাশ্ত্র ব্যাবস্থা ভাল চোখে দেখেনা। যেহেতু ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রহোক বা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র’-র শাসন ব্যাবস্থাটাই স্বৈরতান্ত্রিক, আমার মনে হয় রাষ্ট্রযন্ত্র এই শুভ আবিষ্কারের ব্যাপ্তি কোনো না কোনো ভাবে আটকে দেবে নিকট ভবিষ্যতে। বরং এই আবিষ্কারের অপব্যাবহার করবে, যেমন আধার কার্ড’  


রংরুট: আধুনিক জীবনে ভোগবাদ মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিভুমিকেই টলিয়ে দিয়েছে এমানটাই যদি কেউ ভাবেন, সেই ভাবনাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? ভোগবাদের বিস্তারের সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সমানুপাতিক সম্পর্ক সেকথা মাথায় রেখেও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে ভোগবাদের ভুমিকাকে কি কোন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন আপনি?

সুমেরু রায়চৌধুরী: ভোগবাদ আগেও ছিল
, আগামীদিনেও থাকবে। এটা প্রকৃতির নিয়ম। আমি মনে করি মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সাথে ভোগবাদের খুব কম সম্পর্ক আছে। অবক্ষয়ের সম্পর্ক শিক্ষার অবনতির সঙ্গে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে আটকাতে পারে শিক্ষা।  


রংরুট: আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তার স্বাধীনতার পরিসর ও নাগরিক জীবনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এই দুইয়ের মধ্যে ফারাকই বা কতটা ও সামঞ্জস্য বিধানই বা কি ভাবে সম্ভব? অবশ্যই এই ফারাক ও সামঞ্জস্য বিধান এক এক অঞ্চলে এক এক সমাজ ও রাষ্ট্রে এক এক রকম হওয়ারই কথা। কিন্তু বিশ্বায়ন কি এই বিষয়ে সঠিক কোন দিশা দিতে পারবে বলে মনে হয়?

সুমেরু রায়চৌধুরী: না। বিশ্বায়ন এই ফারাক কে কোন দিশা দিতে পারবে না। নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আপনি যেমন বললেন, এক এক রাষ্ট্রে এক এক রকমই চলতে থাকবে। একমাত্র সীমাহীম রাষ্ট্র হলেই কোন একটা সামাঞ্জস্য আসবে। বিশ্বায়নে নয়।


রংরুট: সাহিত্য দর্শন বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিবর্তনের পথে আমরা যে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি, সে কথা হয়তো বলাই যায়। কিন্তু সমাজ সংসার বিবর্তনের পথে বিগত দুই হাজার বছরের হিসাবটুকুই যদি ধরি খৃষ্টাব্দের সূত্রে- তাহলে সত্যই কতটুকু এগোলো মানুষের সমাজ সংসার সভ্যতা? আপনার মূল্যায়ন।

সুমেরু রায়চৌধুরী: যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ও মানুষের চাহিদার প্রয়োজনে মানুষের সমাজ ব্যাবস্থা, সংসার চরিত্র, সভ্যতার, আমূল উন্নতি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতি ও শিক্ষার আদান প্রদান এর প্রধান কারন। এর ফলেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-র ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আজ আমরা বিশ্ব ব্রহ্মান্দ-কে আরো ভাল ভাবে জেনেছি।


রংরুট: সবশেষে এসে শুরুর সেই সূত্রটুকুর স্মরণে জানতে চাইবো; রংরুটই বলুন আর অগ্রগতিই বলুন সাধারণ মানুষের জন্যে এই বিশ্ব কতটা নিরাপদ আজ, কারণ সেইখানেই বিশ্বমানবতার নোঙরটি ফেলতে হবে না কি আমাদের?

সুমেরু রায়চৌধুরী: আতংকিত হবার কিছু নেই। প্রকৃতির ধর্মেই মানব সভ্যতা টিকে থাকবে। একটু হাল্কা ছলে বলা যায়, এই বিশ্ব কেন, মানব সভ্যতা অন্য বিশ্বেও ছড়াতে পারে।

সুমেরু রায় চৌধুরী, কলকাতা নিবাসী, পেশায় স্থপতি, বয়সে প্রবীণ। ইতিহাস, সমাজব্যাবস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ চর্চায় আগ্রহী  

রংরুট সম্পাদকমণ্ডলীর পক্ষে থেকে আপনার সহযোগিতার জন্যে আন্তরিক ধন্যবাদ।