বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়~নাট্যমঞ্চের তিন দীপ্তিময়ী

নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণের পথটা মোটেই মসৃন ছিল না দুশো বছর আগের বাংলার সমাজ মেয়েদের গান করা বা নাট্যাভিনয় করা অনুমোদন করতো না  রুশ যুবক গেরেসিম লেবেদেফের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গলি থিয়েটারে ১৭৯৫এর ২৭শে নভেম্বর কাল্পনিক সঙ বদলনামে যে প্রহসনটি মঞ্চস্থ করেছিলেন সেটিই বাঙালির প্রথম নাট্যাভিনয় লেবেদেফের ভাষা শিক্ষক গোলকনাথ দাস কলকাতার বারাঙ্গণা পল্লী থেকে তিন বারাঙ্গনা কন্যাকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন সেই নাটকে নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আমাদের জানার কোন উপায় নেই কারা ছিলেন বাংলা নাটকের প্রথম নারী অভিনেত্রী কিংবা কেমন ছিল সেই অভিনয়! বাঙালির সেই প্রথম নাট্যাভিনয় কোন ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। ইংরেজরা লেবেদেফের থিয়েটার পুড়িয়ে দিয়ে তাকে সর্বশান্ত করে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল পরের ৩৮ বছর বাঙালির কোন নাট্যাভিনয়ের সংবাদ পাওয়া যায় না  ইতিহাস লেবেদেফকে বাঙালির প্রথম নাট্যাভিনয়ের সূচনাকর্তার স্বীকৃতি দিয়েছে আরো একটি কারণে সেই থিয়েটার ঐতিহাসিক স্বীকৃতির দাবি রাখে তা হল বাংলা নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের অভিনয়ের অপরিহার্যতা, যার জন্য পরবর্তী আশি বছর সমাজপতিদের রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

নাট্যমঞ্চের তিন দীপ্তিময়ী
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

প্রাক কথন
    সম্পাদকের আদেশ বা নির্দেশ যাই বলি, লিখতে হবে বাংলা নাট্য মঞ্চের তিন দিকপাল অভিনেত্রীর জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে বাংলা রঙ্গালয়ের দেড়শো বছরের ইতিহাসে বিনোদিনী, গোলাপ সুন্দরী, তারাসুন্দরী, কুসুমকুমারী,সরযুবালা, প্রভা দেবী, থেকে গীতা দে, শোভা সেন, তৃপ্তি মিত্র,কেয়া চক্রবর্তী,ছন্দা চট্টোপাধ্যায়,মায়া ঘোষ পর্যন্ত কত নাম! তাদের থেকে মাত্র তিনজকে বেছে নেওয়া শুধু কঠিন নয় অঅম্ভব তবু লিখতে যেহেতু হবে, আমি বেছে নিয়েছি তিন যুগের তিন অভিনেত্রীকে বাংলা থিয়েটারের দেড়শো বছরের ইতিহাসে (১) অর্ধেন্দুশেখর- গিরিশ যুগ (২) শিশির-অহীন্দ্র যুগ এবং (৩) বিজন ভট্টাচার্য- শম্ভু মিত্র যুগ এই বিভাজনে বোধ করি কোন বিতর্কের অবকাশ নেই আমি বেছে নিয়েছি তিন যুগের তিন দীপ্তময়ীকে - বিনোদিনী, সরযূবালা এবং তৃপ্তি মিত্র এই নির্বাচনও কোন বিতর্কের অবকাশ রাখবে বলে মনে হয় না বিনোদিনী-নাট্য সম্রাজ্ঞী সরযূবালা -তৃপ্তি মিত্র শুধু তাঁদের সময়ের সেরা অভিনেত্রীই ছিলেন না, নিজেরাই হয়ে গিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউশন বিনোদিনী শূন্য থেকে শুরু করে গিরিশ যুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর মর্যাদা পেয়েছিলেন মাত্র বারো বছরের অভিনয় জীবনে সরযূবালা তাঁর সুদীর্ঘ নাট্য জীবনে পড়ন্ত ব্যবসায়িক থিয়েটারে গিরিশ যুগ, শিশির ভাদুড়ী যুগ এবং স্বাধীনতা-উত্তর আধুনিক চিন্তা-চেতনার অভিনয়ধারা আত্মস্থ করেছিলেন আর তৃপ্তি মিত্র শম্ভূ মিত্র-বিজন ভট্টাচার্য যুগের গণচেতনার অভিনয় ধারার অবিসংবাদি উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন

গোড়ার কথা

    নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণের পথটা মোটেই মসৃন ছিল না দুশো বছর আগের বাংলার সমাজ মেয়েদের গান করা বা নাট্যাভিনয় করা অনুমোদন করতো না  রুশ যুবক গেরেসিম লেবেদেফের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গলি থিয়েটারে ১৭৯৫এর ২৭শে নভেম্বর কাল্পনিক সঙ বদলনামে যে প্রহসনটি মঞ্চস্থ করেছিলেন সেটিই বাঙালির প্রথম নাট্যাভিনয় লেবেদেফের ভাষা শিক্ষক গোলকনাথ দাস কলকাতার বারাঙ্গণা পল্লী থেকে তিন বারাঙ্গনা কন্যাকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন সেই নাটকে নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আমাদের জানার কোন উপায় নেই কারা ছিলেন বাংলা নাটকের প্রথম নারী অভিনেত্রী কিংবা কেমন ছিল সেই অভিনয়! বাঙালির সেই প্রথম নাট্যাভিনয় কোন ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করতে পারেনি ইংরেজরা লেবেদেফের থিয়েটার পুড়িয়ে দিয়ে তাকে সর্বশান্ত করে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল পরের ৩৮ বছর বাঙালির কোন নাট্যাভিনয়ের সংবাদ পাওয়া যায় না  ইতিহাস লেবেদেফকে বাঙালির প্রথম নাট্যাভিনয়ের সূচনাকর্তার স্বীকৃতি দিয়েছে আরো একটি কারণে সেই থিয়েটার ঐতিহাসিক স্বীকৃতির দাবি রাখে তা হল বাংলা নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের অভিনয়ের অপরিহার্যতা, যার জন্য পরবর্তী আশি বছর সমাজপতিদের রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল
    লেবেদেফের পরে প্রথম নাট্যাভিনয়ের সংবাদ পাওয়া যায় ১৮৩৫ সনে ১৮৩৫এর ৬ই অক্টোবর শ্যামবাজারের জমিদার নবীনচন্দ্র বসুর বাড়িতে বিদ্যাসুন্দরনাট্যাভিনয় আয়োজিত হয় নবীনচন্দ্র লেবেডফের মতই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে বারাঙ্গণা পল্লী থেকে নারী চরিত্রের অভিনেত্রী সংগ্রহ করেছিলেন বারাঙ্গনা মেয়েদের নাট্যাভিনয়ে সুযোগ দেওয়ায় তখনকার রক্ষণশীল সমাজে নিন্দা-মন্দের ঝড় উঠলো, প্রবল আক্রমণাত্মক সমালোচনায় বিদ্ধ হলেন বাবু নবীনচন্দ্র তবুও এই প্রয়াসের মধ্যে সমাজসংস্কারের যে বার্তা ছিল তা চিহ্নিত করতে পেরেছিল সেই সমাজেরই একটা অংশ হিন্দু পাইওনিয়ারপত্রিকা তার প্রতিবেদনে লিখেছিল “... এই নাটকে বিশেষ করিয়া স্ত্রী চরিত্রের অভিনয় খুব চমৎকার হইয়াছিল ...। আমাদের সমাজের স্ত্রীলোকদের মানসিক শক্তির এই মহান ও নূতন দৃষ্টান্ত দেখিয়াও যদি লোকে স্ত্রী-শিক্ষায় অবহেলা প্রদর্শন করেন, তবে তাঁহাদের হৃদয় কঠিন ও চিত্ত আবেগহীন বলিতে হইবে ...। এই সকল প্রশংসনীয় কিন্তু ভ্রমে পতিত স্ত্রীলোকদের চারিত্রিক উন্নতি করিবার এই প্রচেষ্টার জন্য নাট্যশালার স্বত্বাধিকারী বাবু নবীনচন্দ্র বসু ধন্যবাদের পাত্র
    এমন প্রশংসা সত্তেও রক্ষণশীলদের প্রবল নিন্দাবাদের চাপে নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের নিয়োগের সাহস করলেননা আর কেউই,নাটকের নারী চরিত্রগুলির অভিনয় পুরুষের দখলেই থেকে গেলো ১৮৭২এ দীনবন্ধু মিত্রর নীলদর্পণঅভিনয়ের মধ্য দিয়ে সাধারণ রঙ্গালয়ের যাত্রা শুরু হলো,কিন্তু নাটকে নারী চরিত্রে অভিনয় পুরুষের দখলেই থেকে গেল কিন্তু নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের স্বাভাবিক অধিকারের প্রশ্নটিকে চাপা গেলো না,প্রবলভাবে উঠে এলো যখন আসরে নামলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    ১৮৭২এ বাঙালির প্রথম রঙ্গালয় ন্যাশনাল থিয়েটারপ্রতিষ্ঠার পরের বছর ধনকুবের আশুতোষ দেব বা ছাতু বাবুর দৌহিত্র শরৎচন্দ্র ঘোষ বেঙ্গল থিয়েটারনামে একটি রঙ্গালয় খুললেন আর তাদের জন্য নাটক লিখে দেবার জন্য মাইকেল মধুসূদন দত্তকে অনুরোধ করলেন মাইকেল সম্মত হলেন একটি সর্তে যে তাঁর নাটকের নারী চরিত্রগুলি মেয়েদের দিয়েই অভিনয় করাতে হবে বেঙ্গল থিয়েটারের উপদেষ্টামন্ডলীর সভাতেও মাইকেল থিয়েটারে অভিনেত্রী নিয়োগের প্রস্তাব করেন মধুসূদনের সমর্থন পেয়ে বেঙ্গল থিয়েটার কর্তৃপক্ষ  বারাঙ্গনাপল্লী থেকে জগত্তারিণী,গোলাপসুন্দরী,এলোকেশী ও শ্যামাসুন্দরী নামে চারজন অভিনেত্রীকে নিয়োগ করলেন ১৮৭৩এর ১৬ই অগস্ট মধুসূদনের শর্মিষ্ঠানাটক দিয়ে বেঙ্গল থিয়েটার তার যাত্রা শুরু করলো আর নাট্যাভিনয়ে পুরুষের একচেটিয়া অধিকার খর্ব করে সেইদিন থেকে শুরু হল থিয়েটারে নারীদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতাও থিয়েটারে নারীর অংশগ্রহণের প্রথম প্রবক্তা মধুসূদন দত্ত এই যুগান্তকারী ঘটনা দেখে যেতে পারেননি গোলাপসুন্দরীদের পথচলা শুরু হবার দেড় মাস আগেই তাঁর দেহাবসান হয় (২৯শে জুন ১৮৭৩) রক্ষণশীলদের প্রবল নিন্দাবাদ সত্তেও নাট্যাভিনয়ে মেয়েদের স্বাভাবিক অধিকারকে আর ঠেকানো যায়নি

পঙ্কজা থেকে মহীয়সী - নটী বিনোদিনী

   
সমাজের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে কোন প্রাপ্তির আশায় আমাদের বিনোদন শিল্পের সূচনাপর্বে এসেছিলেন এইসব বারাঙ্গনা কন্যারা? তারা এসেছিলেন অন্ধকার জগতের গ্লানি অগ্রাহ্য করে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার তাগিদে বাঙালির প্রথম বিনোদন মাধ্যম থিয়েটার সেইসব বারাঙ্গনা কন্যাদের কাছে অন্ধকার জগতের গ্লানিমুক্তির একটা অবলম্বন হয়ে দেখা দিয়েছিল তাদের একটা তাগিদ ছিল মুক্তির তাগিদ থিয়েটারকে তাই তারা নিজেদের মুক্তিতীর্থ মনে করলেন,থিয়েটারকে ভালোবেসে পবিত্র হতে চাইলেন এই পথ ধরেই থিয়েটারে এসেছিলেন গোলাপসুন্দরী, বিনোদিনী, কুসুমকুমারী, তারাসুন্দরী, কৃষ্ণভামিনী, প্রভাদেবীরা বস্তুত নাট্যাভিনয়ে তাঁদের যোগদানের কারণেই বাংলা থিয়েটার পুরোমাত্রায় পেশাদারী হয়ে ওঠার দিকে পা বাড়িয়েছিল গিরিশচন্দ্র স্বীকার করেছেন বিনোদিনী না থাকলে তিনি গিরিশচন্দ্রহতে পারতেন না
বাংলা নাট্যাভিনয়ের আদিপর্বের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিনোদিনী সম্পর্কে একালে আমরা কিছুই জানতে পারতাম না যদি না বিনোদিনী রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে সংস্রব ত্যাগ করার ছাব্বিশ বছর পরে কলম ধরতেন, আত্মকথা লিখতেন ১৯১০ এ নাট্যমন্দির পত্রিকার বিনোদিনী তাঁর আত্মকথা লেখা শুরু করেন দুবছর পরে আমার কথানামে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়
    বিনোদিনীর জন্ম তারিখ জানা যায় না,জানা যায় না তাঁর পিতৃপরিচয়ও ১১/১২ বছর বয়সে ১৮৭৪এ তাঁর প্রথম মঞ্চাভিনয়কে হিসাবে রেখে অনুমান করা হয় তাঁর জন্ম ১৮৬৩ সালে কলকাতায় ১৮৭৪এ বালিকা বিনোদিনী যখন মঞ্চাভিনয়ের জগতে প্রবেশ করলেন তার দুবছর আগে ১৮৭২এ  এদেশে সাধারণ রঙ্গালয়ের প্রতিষ্ঠা
     অন্ধকার জগৎ থেকে উঠে আসা বারো বছরের  এক অসহায় বালিকা তার দিদিমার হাত ধরে ধর্মদাস নিয়োগীর গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে এসেছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষের পরিচালনায় শত্রু সংহারনাটকে দু একটি সংলাপের সখীর চরিত্রে মঞ্চাবতরনের সুযোগ পেলেন তারপর তাঁর মাত্র বারো বছরের অভিনেত্রী জীবনে বাংলা মঞ্চে গিরিশ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর মর্যাদা  অর্জন করলেন আপন মেধা ও সাধনায় 
    বিনোদিনীর অভিনয় জীবনের বৃত্তান্ত লেখার আগে আমি বুঝতে চেয়েছি তার জীবনবৃত্তটিকে বুঝতে চেয়েছি পঙ্কজা থেকে মহিয়সী হয়ে ওঠা এক নারীর মর্মবেদনা, যিনি বারাঙ্গণা থেকে থিয়েটারকে ভালোবেসে পরিশুদ্ধ হয়েছিলেন,অভিজাত সমাজ তাকে মাথায় করে রেখেছিল নাট্যমঞ্চের প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের অর্জিত অর্থ,নিজের সুখ-সাচ্ছন্দ ত্যাগ করেছিলেন,শুধুমাত্র নাট্যমঞ্চের প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে বিক্রি করেছিলেন মারোয়াড়ি থিয়েটার ব্যবসায়ী গুর্মুখ রায়ের কাছে,আর সেই অভিজাত সমাজেই প্রতারিত হয়ে অভিনয় ত্যাগ করে অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন বাংলা মঞ্চের অবিস্মরণীয় অভিনেত্রী বিনোদিনী বুঝতে চেয়েছি সমকালীন বাংলা থিয়েটারের এই লজ্জাটুকু কেমন করে  সমাজের গভীর অন্ধকার স্তর থেকে উঠে আসা এক অসহায় নারী তাঁর তন্ময় সাধনা ও দুরূহ সিদ্ধি আয়ত্ব করেছিলেন স্থায়ী রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন এবং খ্যাতির শীর্ষ বিন্দু স্পর্শ করেও নীরবে মঞ্চের অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন তা ভাবলে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়
    বিনোদিনীর নাট্যজীবন ছিল মাত্র ১২বছর ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৬ এই ১২ বছরে বিনোদিনী সেকালের সবকটি মঞ্চেন্যাশনাল, গ্রেট ন্যাশনাল, বেঙ্গল ও ষ্টার থিয়েটারে ৮০টি নাটকে ৯০টিরও বেশি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনয়জীবন থেকে অন্তরালে চলে যাবার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর তারপরও দীর্ঘ ৫৫ বছর জীবিত ছিলেন বিনোদিনী কিন্তু অভিনয়ে ফিরে আসেননি ফিরে আসার জন্য কোন ডাকও পাননি
    ১৮৮৬তে মঞ্চ ত্যাগের ২৬ বছর পরে বিনোদিনী তাঁর আত্মকথা আমার কথালিখতে শুরু করেন আমাদের নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে বিনোদিনীর উল্লেখ নিতান্ত দায়সারা ভাবে একজন অভিনেত্রী রূপে উল্লেখ হয় আত্মকথার ভুমিকায় বিনোদিনী লিখেছেন ইহা কেবল অভাগিনীর হৃদয়-জ্বালার ছায়া! পৃথিবীতে আমার কিছুই নাই, শুধুই অনন্ত নিরাশা,শুধুই দুঃখময় প্রাণের কাতরতা! কিন্তু তাহা শুনিবারও লোক নাই! মনের ব্যথা জানাইবার লোক জগতে নাই কেননা আমি জগত মাঝে কলঙ্কিনী, পতিতা আমার আত্মীয় নাই, বন্ধু নাই, বান্ধব নাই, এই পৃথিবীতে আমার বলিতে এমন কেহই নাই সেকালের সমাজের কাছে বিনোদিনীর জিজ্ঞাসা ছিল “... বারাঙ্গনার জীবন কলঙ্কিত  বটে! কিন্তু সে কলঙ্কিত ঘৃণিত কোথা হইতে হয়? জননী জঠর হইতে তো একেবারে ঘৃণিত হয় নাই ...অনেকেই পুরুষের ছলনায় ভুলিয়া তাহাদের বিশ্বাস করিয়া চির কলঙ্কের বোঝা মাথায় লইয়া অনন্ত নরকযাতনা সহ্য করে। সে সকল পুরুষ কাহারা? যাহারা সমাজ মধ্যে পূজিত আদৃত তাহাদের মধ্যে কেহ নন কি”?

    বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় বাংলা মঞ্চের সর্বশ্রেষ্ঠা অভিনেত্রী তাঁর সমকালে বাংলা মঞ্চের রাজেশ্বরী,কি অতলান্ত প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন বিনোদিনী যিনি ঠাকুর রামকৃষ্ণের আশির্বাদ পেয়েছিলেন,সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র যার অভিনয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন - বড় বাসনা ছিল একমাত্র কন্যা কে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিয়ে শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দেবেন সেকালের সমাজপতিগণ বিনোদিনীর কন্যাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি না করার সমস্ত বন্দোবস্ত করেছিলেন এক বারাঙ্গনা অভিনেত্রীর কন্যাকে বিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ দেননি সেকালের সমাজপতিরা বিনোদিনীর নিজের কথায় নারীর নিস্তার নাই টলিলে চরণ

    থিয়েটার থেকে প্রতারিত হয়ে বিদায় নেবার পর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন এমনকি তাঁর আত্মকথা,যা সেকালের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তার উল্লেখও সামান্যই পাওয়া যায় থিয়েটার থেকে সরে আসার পর সাহিত্য চর্চায় নিজেকে বিজড়িত করেছিলেন, প্রকাশিত হয়েছিল দুটি কাব্যগ্রন্থ কিন্তু বাংলা সাহিত্যের একাডেমিক ইতিহাস একথা উল্লেখ করতে কুন্ঠিত হয় আজও। বারাঙ্গনা থেকে সম্রাজ্ঞী হওয়া নারীর রচনা যে! নারীর নিস্তার নেই টলিলে চরণ’!

    দশ বছর অভিনয়ের সূত্রে বাংলা মঞ্চের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান অর্জন করার পর বিনোদিনীর একটি বাসনা ছিল শিল্পীর থিয়েটার হোক, নির্মিত হোক একটা স্থায়ী মঞ্চ ১৮৮৩তে গুর্মুখ রায় নামে এক মারোয়াড়ি ধনাঢ্য যুবক গিরিশ চন্দ্রের কাছে প্রস্তাব দিলেন যে তিনি স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করে দেবেন কিন্তু বিনিময়ে বিনোদিনীকে তাঁর রক্ষিতা হয়ে থাকতে হবে গিরিশ চন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নাট্যরথীদের কাতর অনুনয়ে বিনোদি্নী সম্মত হলেন গুর্মুখ রায়ের রক্ষিতা হতে প্রতিশ্রুতি পেলেন যে গুর্মুখ রায় যে স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করে দেবেন তা বিনোদিনীর নামানুসারে নাম হবে বি-থিয়েটারবিনোদিনীর চোখে তখন স্বপ্ন তাঁর নামে হবে স্থায়ী নাট্য মঞ্চ হবে শিল্পীর থিয়েটার! গুর্মুখ রায় বিনোদিনীকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে বিনোদিনী স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণের দাবি ত্যাগ করুক চেয়েছিলেন মঞ্চ নির্মাণ না করে তাকেই পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে বিনোদিনী সম্মত হননি বলেছিলেন তিনি অর্থের জন্য গুর্মুখের রক্ষিতা হতে সম্মত হননি,হয়েছিলেন স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ হবে এই সর্তে একুশ বছরের তরুণী বিনোদিনী  তখন জানতেন না,অভিজাত পুরুষতন্ত্রের কাছে তাঁর জন্য কি প্রতারণার অস্ত্র লুকিয়ে রাখা আছে!
    বিডন স্ট্রিটে জমিদার কীর্তি মিত্রর জমিতে স্থায়ী মঞ্চ নির্মিত হ কিন্তু সে মঞ্চ বিনোদিনীর নামে বি-থিয়েটারলনা নাট্যরথীরা রেজিস্ট্রেশনের সময় নাম দিলেন ষ্টার থিয়েটার (ষ্টার থিয়েটার আগে বিডন স্ট্রিটে ছিল,পরে স্থানান্তরিত হয় হাতি বাগানে ) গুর্মুখ রায় এই প্রতারণা মেনে নিয়েছিলেন এমন সাক্ষ্য পাওয়া যায় না ওই বছরেই পারিবারিক ও ভগ্ন স্বাস্থের কারণে গুর্মুখ রায় ষ্টার থিয়েটারের অর্ধেক স্বত্ব বিনোদিনীর নামে লিখে দিয়ে থিয়েটার ব্যবসা থেকে সরে যেতে চাইলেন কিন্তু গিরিশ চন্দ্র ঘোষ বিনোদিনীকে থিয়েটারের স্বত্ব দেওয়াতে বাধা দিলেন বিনোদিনীর মাকে রাজি করালেন আসলে একজন বারাঙ্গনার মালিকানায় থিয়েটার সেকালের পুরুষ শাসিত সমাজ মেনে নিতে পারেনি বিনোদিনীকে বঞ্চিত করে অমৃতলাল মিত্ররা গিরিশ চন্দ্রকে ম্যানেজার রেখে ষ্টার থিয়েটার কিনে নিলেন তথাপি বিনোদিনী ভগ্ন মনেও ষ্টার থিয়েটার ছেড়ে যাননি,থিয়েটারের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন এখানেই চৈতন্যলীলানাটক  শ্রীরামকৃষ্ণ দেব দেখতে আসেন ও নিমাই চরিত্রের অভিনেত্রী বিনোদিনী তাঁর আশির্বাদ লাভ করেন বিনোদিনীর অভিনয় দেখতে রামকৃষ্ণদেব অনেকবার রঙ্গালয়ে এসেছিলেন বস্তুত বিনোদিনীর জন্যই বাংলা থিয়েটার সেকালের অভিজাত মহলের মর্যাদা অর্জন করেছিল

    বিনোদিনী তখন খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে  পুরুষ নাট্যরথীরা তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব ও অভিনয় দক্ষতায় ম্লান তার ওপর থিয়েটার মালিকের প্রিয় সঙ্গিনী বিনোদিনীকে অবলম্বন করে কার্যোদ্ধার হয়ে গেছে,স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করানো হয়েছে,বাংলা থিয়েটার মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সুতরাং প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী বিনোদিনীকে আর কি প্রয়োজন! বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন কিন্তু থিয়েটার প্রস্তুত হইবার পরও সময়ে সময়ে বড়  ভালো ব্যবহার পাই নাই আমি যাহাতে উক্ত থিয়েটারে বেতনভোগী অভিনেত্রী হইয়াও না থাকিতে পারি তাহার জন্যও সকলে বিধিমতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন মঞ্চ ছেড়ে অন্তরালে চলে গেলেন চলে যেতে বাধ্য হলেন পঙ্কজা থেকে থিয়েটারের রাজেশ্বরী হয়ে ওঠা নটী বিনোদিনী তারপরেও বিনোদিনী পঞ্চান্ন বছর নিভৃতে বেঁচেছিলেন অভিনয়ের বাসনাও ছিল,সবার অলক্ষ্যে নাটক দেখতেও যেতেন প্রায়সই কিন্তু কোন দল বা সেকালের নাট্যরথীদের কেউই তাঁকে আর মঞ্চে ফিরে আসার আহ্বান জানানো দরকার মনে করেননি 
    ১৮৮৬তে থিয়েটার থেকে বিদায় নেবার পর বিনোদিনী উত্তর কলকায় এক উদার হৃদয় ব্যক্তির আশ্রয়ে বধু জীবন যাপন করেন সেখানেই তাঁর এক কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে কন্যাকে আশ্রয় করে বিনোদিনী পূর্বের অনেক ক্লেদাক্ত স্মৃতি ভুলে যান কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৯১এ সেই কন্যার মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েন বিনোদিনী এর দুবছর পর তাঁর  শেষ আশ্রয়দাতারও মৃত্যু হয়,বিনোদিনী ফিরে যান তার ১৪৫ নম্বর কর্নোয়ালিশ স্ট্রীটের বাড়িতে সেখানেই সবার অলক্ষ্যে অনাদরে অবহেলায় একদা পঙ্কজা থেকে বাংলা থিয়েটারের রাজেশ্বরী হয়ে ওঠা বিনোদিনীর মৃত্যু হয় না কোন শোক সভা হয়েছিল কিনা,কোন সংবাদ পত্র প্রতিবেদন লেখা হয়েছিল কিনা তাও জানা যায়না ১৯৪১এ অভিজাত সমাজ যদিও অনেক উদার,কিন্তু ঐ যে বিনোদিনীর সেই কথাটা নারীর নিস্তার নাই টলিলে চরণ’!

    কত বড় অভিনেত্রী ছিলেন বিনোদিনী সেকথা বর্ণণা করা এখন স্বভাবতই অসম্ভব আমাদের নির্ভর করতে হবে সেযুগের সামান্য কয়েকটি পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদনে যেটুকু উল্লেখ পাওয়া গেছে তার  ওপর এব্যাপারে নিশ্চিত ভাবেই বিনোদিনীর নাট্যশিক্ষক গিরিশ চন্দ্র ঘোষের মূল্যায়ন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি কথা এ বিষয়ে আমরা মনে রাখবো এক,এগারো বছরের বালিকা বিনোদিনী যখন থিয়েটারে প্রবেশ করলেন তখন সবে মাত্র থিয়েটারে নারী চরিত্র নারীদের দিয়ে রূপায়ন করা শুরু হয়েছে সুতরাং বিনোদিনীর সামনে অভিনয়ের কোন অনুসরণযোগ্য আদর্শ ছিল না তাকে শুরু করতে হয়েছে শূণ্য থেকে দ্বিতীয়ত সেকালের অভিনেত্রীরা বারাঙ্গনা হওয়ার কারণে পত্র-পত্রিকাগুলিতে তাদের অভিনয়ের আলোচনা কদাচই থাকতো বিনোদিনীর প্রথম অভিনয় ১৯৭৪এর ১২ই ডিসেম্বর, গিরিশচন্দ্রের শত্রু সংহারনাটকে একটি অপ্রধান চরিত্র দ্রৌপদির সখির ভূমিকায় মাত্র চার পাঁচটি সংলাপ মাত্র তিনমাস পরেই ১৮৭৫এর ৬ই মার্চ হেমলতানাটকের নামভুমিকায় এবং ঐ বছরেই মার্চ থেকে মে অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির পরিচালনায় লক্ষ্ণৌ ও লাহোরে আটটি নাটক সতী কি কলঙ্কিনী?’, ‘নবীন তপস্বিনী’, ‘সধবার একাদশী’, ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’, ‘লীলাবতী’, ‘নীলদর্পণনাটকে প্রধান নারী চরিত্র অভিনয় করেন অতয়েব আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না অভিনয় দক্ষতার জন্যই মাত্র একবছরের মধ্যে নাটকের ক্ষেত্রে বিনোদিনী কত অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন

    সেকালের সমস্ত প্রধান নাট্যকারের সব নাটকেই প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন বিনোদিনী বিনোদিনী অভিনীত নাট্য চরিত্রগুলির ওপর চোখ বোলালেই বোঝা যাবে সেযুগের নাটকে বিনোদিনীর অভিনয় তাঁর অপরিহার্যতার কথা অসামান্য অভিনয় দক্ষতা না থাকলে নিশ্চিত ভাবেই সেই সব দুরূহ চরিত্রে বিনোদিনীকে নির্বাচিত করতেন না সেকালের কয়েকটি প্রসিদ্ধ নাটকের বিনোদিনী অভিনীত চরিত্র এই রকম সরোজিনী   নাম ভূমিকা,দুর্গেশনন্দিনীতে   আয়েষা,মেঘনাদ বধ নাটকে  প্রমীলা, মৃণালিনীতে  মনোরমা,কপাল কুন্ডলা  নাটকে  কপাল কুন্ডলা, বিষবৃক্ষতে  কুন্দনন্দিনী, রাবণবধ নাটকে   সীতা,দক্ষযজ্ঞতে  সতী, নল-দময়ন্তী নাটকে  দময়ন্তী, শ্রীবৎস চিন্তাতে   চিন্তা, চৈতন্যলীলা নাটকে নিমাই, বিল্বমঙ্গল নাটকে   চিন্তামণি বিনোদিনী তাঁর ১২ বছরের নাট্যজীবনে চারটি মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন গ্রেট ন্যাশানাল’‘বেঙ্গল থিয়েটার’,‘ন্যাশনাল থিয়েটারস্টার থিয়েটার১৮৭৬এ কুখ্যাত নাট্যনিয়ন্ত্রণ আইন জারি হওয়ার পর গ্রেট ন্যাশানালবন্ধ হয়ে যায়, বিনোদিনী যোগ দেন বেঙ্গল থিয়েটারে এখানে তাঁর অভিনয় শিক্ষক ছিলেন শরৎচন্দ্র ঘোষ এখানে প্রায় দুবছরের অভিনয় জীবনে বিনোদিনী  অনেক পরিণত হলেন, জটিল নারী চরিত্র রূপায়নে হয়ে উঠলেন অপরিহার্য এখানে বিনোদিনী অভিনীত চরিত্রগুলি সেযুগের নাট্যাভিনয়ের মাইলফলক হয়ে গিয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের মৃণালিনীতে মনোরমা’,‘কপাল কুন্ডলা’, দূর্গেশ নন্দিনীর আয়েষাতিলোত্তমামেঘনাদ বধপ্রমীলার মত জটিল চরিত্রের অভিনয়ে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছিলেন মৃণালিনীতে মনোরমার জটিল চরিত্রটিকে বিনোদিনী কেমন বিশ্লেষণ করেছিলেন সেকথা আত্মকথায় লিখে গেছেন একসঙ্গে বালিকা, প্রেমময়ী যুবতী, পরামর্শদাতা মন্ত্রী, অবশেষে পরম পবিত্র চিত্তে স্বামী সহ-মরণ অভিলাষিনী দৃঢ়চেতা এক রমণী বিনোদিনী তখন ১৪বছরের বালিকা এমন বিশ্লেষণই বলে দেয় তাঁর অভিনয় প্রতিভার গভীরতা স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র মৃণালিনীর অভিনয় দেখে মন্তব্য করেছিলেন আমি মনোরমার চরিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম,কখনো যে প্রত্যক্ষ করিব এমন আশা করি নাই আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল

    বেঙ্গল থিয়েটারে উনিশ মাস থাকার পর গিরিশচন্দ্র তাঁকে নিয়ে গেলেন ন্যাশানাল থিয়েটারে সেখানে গিরিশ ছিলেন ম্যানেজার ও নাট্যশিক্ষক এখানেই শুরু হল বিনোদিনীর নাট্যশিক্ষার উচ্চ পাঠ বস্তুত, গিরিশচন্দ্রের সংস্পর্শেই বিনোদিনীর অভিনয় সম্রাজ্ঞীতে উত্তরণ গিরিশ্চন্দ্র স্বয়ং লিখেছেনআমি মুক্তকন্ঠে বলিতেছি যে রঙ্গালয়ে বিনোদিনীর উৎকর্ষ আমার শিক্ষা অপেক্ষা তাহার নিজগুনে অধিক,সূর্যরশ্মিকে প্রতিফলিত করতে মণি খন্ডের প্রয়োজন বিনোদিনীর মত সহ-অভিনেত্রী না পেলে গিরিশ চন্দ্রের প্রবাদ প্রতীম নাট্যপ্রতিভার পূর্ণ ব্যাপ্তী ঘটতো না, একথা স্বয়ং গিরিশচন্দ্রও স্বীকার করে গেছেন বিনোদিনীর আত্মকথার ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন গিরিশচন্দ্র,সেখানে তিনি স্বীকার করেছেন তাহার সর্বতোমুখী প্রতিভার নিকট আমি সম্পূর্ণ ঋণী একথা স্বীকার করিতে আমি বাধ্য ...। অভিনয় করিতে করিতে সে তন্ময় হইয়া যাইত, আপন অস্তিত্ব ভুলিয়া এমন একটি অনির্বচনীয় পবিত্র ভাবে উদ্দীপ্ত হইয়া যাইত, সে সময় অভিনয় অভিনয় বলিয়া মনে হইত না,যেন সত্য ঘটনা বলিয়াই অনুভূত হইত”    বিনোদিনী তাঁর বারো বছরের অভিনয় জীবনের নয়বছরই কাটিয়েছেন গিরিশচন্দ্রের সংস্পর্শে, আর এই সময়কালেই তিনি অভিনয় দক্ষতার শিখর স্পর্শ করেছিলেন সেকালীন বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের শ্রেষ্ঠা অভিনেত্রী ছিলেন শুধু তাই নয়,বিনোদিনীর অভিনয় বাংলা থিয়েটারকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল সেকালের সমাজ নাট্যাভিনয়কে সম্মানের কাজ বলে মনে করতো না সম্ভ্রান্ত মানুষজন থিয়েটার থেকে দূরেই থাকতেন মঞ্চ থেকে সরে যাওয়ার দুবছর আগে আলোড়ন সৃষ্টিকারী চৈতন্যলীলানাটকে নিমাই চরিত্রের অসামান্য অভিনয় থিয়েটারের সঙ্গে সেকালীন সমাজের ব্যবধানের বেড়া ভেঙ্গে দিয়েছিল বিনোদিনীর অভিনয় দেখতে আসেন শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বিনোদিনীর নিমাই চরিত্র চিত্রন দেখে ভাববিহ্বল রামকৃষ্ণদেব বিনোদিনীর অভিনয়ের মধ্যে দেখতে পান আসল আর নকল যেন এক  থিয়েটারে পদার্পন করে থিয়েটারে লোক শিক্ষে হয়বলে বার্তা দিলেন রামকৃষ্ণ দেব চৈতন্য লীলার নিমাই চরিত্রের অভিনয়ে তিনি কি তন্ময় সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সেকথা বিনোদিনী নিজেই লিখে গিয়েছেন গিরিশ রচনাবলীর ৩য় খন্ডের পরিশিষ্টে গিরিশচন্দ্র বিনোদিনীর কথা উদ্ধৃত করেছেন লিখছেনচৈতন্য লীলা রিহার্শালের সময় অমৃতবাজার পত্রিকার এডিটর বৈষ্ণব চূড়ামণি শ্রীযুক্ত শিশির বাবু মহাশয় মাঝে মাঝে যাইতেন এবং আমার ন্যায় হীনা দ্বারা সেই দেব চরিত্র যতদূর সম্বব সুরুচি সংযুক্ত হইয়া অভিনয় হইতে পারে তাহার উপদেশ দিতেন, এবং বারবার বলিতেন আমি যেন সতত গৌর পাদপদ্ম হৃদয়ে চিন্তা করি আমিও তাঁর কথামত মহাপ্রভুর পাদপদ্ম চিন্তা করিতাম ...। যেদিন চৈতন্য লীলাপ্রথম অভিনয় করি, তাহার আগের রাত্রে প্রায় সারা রাত্রি নিদ্রা যাই নাই; প্রাণের মধ্যে একটা আকুল উদ্বেগ হইতো যে, কেমন করিয়া এই অকুল পাথারে কুল পাইব প্রাতে উঠিয়া গঙ্গা স্নানে যাইলাম; পরে ১০৮ দুর্গানাম লিখিয়া তাঁহার চরণে ভিক্ষা করিলাম ... আমি যেন তাঁর কৃপা লাভ করি ... আমি মনে মনে বুঝিতে পারিলাম যে ভগবান আমায় কৃপা করিতেছেন কেননা সেই বাল্যলীলার সময় রাধা বই আর নাইকো আমার, রাধা বলে বাজাই বাশি-  বলিয়া গীত ধরিয়া যতই অগ্রসর হইতে লাগিলাম ততই যেন একটা শক্তিময় আলোক আমার হৃদয়কে পূর্ণ করিয়া তুলিতে লাগিল ...। শেষে সন্যাসী হইয়া সংকীর্তন কালে হরি মন মজায়ে লুকালে কোথায় / আমি ভবে একা দাও হে দেখা প্রাণ সখা রাখো পায়এই গানটি গাহিবার সময়ের মনের ভাব আমি লিখিয়া জানাইতে পারিব না। আমার তখন মনে হইত যে আমি তো ভবে একা, কেহ তো আমার আপনার নাই! উন্মত্ত ভাবে সংকীর্তনে নাচিতাম,এক এক দিন হইত যে অভিনয়ের গুরুভার সইতে না পারিয়া মুর্ছিতা হইয়া পড়িতাম
    এমন অনন্য অভিনয় প্রতিভায় শ্রীচৈতন্য দেব চরিত্রাভিনয়ের মধ্য দিয়ে বিনোদিনী গ্লানিহীন হতে চেয়েছিলেন রামকৃষ্ণদেবের আশির্বাদে বিনোদিনীর কলুষমুক্তি ঘটলো আর বঙ্গ রঙ্গালয় থেকেও অশুচিতার বেড়া ভেঙ্গে দিলেন বিনোদিনী বিনোদিনীর মঞ্চ ত্যাগের পর গিরিশচন্দ্রের মত মহা শক্তিধর নাট্য পরিচালকও চৈতন্যলীলাআর মঞ্চস্থ করতে পারেন নি

    বারো বছরে আশিটি নাটকে নব্বইটিরও বেশি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিনোদিনী মেঘনাদ বধ নাটকে ছটি চরিত্র অভিনয় করেছিলেন এমনকি একই রাত্রে চৈতন্য লীলায় নিমাই চরিত্রে অভিনয় করার পরই অন্য নাটকে সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী চরিত্রে অভিনয় করতেন বিনোদিনী তাঁর অভিনয় জীবনের প্রায় সবটাই কাটিয়েছিলেন গিরিশচন্দ্রের মত প্রতিভার সংস্পর্শে তার আগে বিনোদিনীর প্রথম নাট্যশিক্ষক ছিলেন প্রতিভাবান নট অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি  এইসব ঘটনা এবং গিরিশচন্দ্রের উচ্ছ্বাসই সাক্ষ্য দেয় বিনোদিনীর অনন্য নাট্যপ্রতিভা সম্পর্কে

সখের থিয়েটারে ভিক্ষুক বালকের অভিনয় থেকে নাট্যসম্রাজ্ঞী – সরযূবালা

   
গিরিশ যুগ থেকে শিশির যুগ পর্যন্ত তারাসুন্দরী, তিনকড়ি, কুসুমকুমারী, কঙ্কাবতী, প্রভা দেবী প্রমুখ বহু প্রতীভাময়ী অভিনেত্রী সাধারণ রঙ্গালয়কে সমৃদ্ধ করেছেন অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি প্রয়াত হলেন ১৯০৯এ তিন বছর পরে ১৯১২তে গিরিশচন্দ্রও চলে গেলেন। অমরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রয়াত হলেন ১৯১৬তে অর্ধেন্দুশেখর, গিরিশচন্দ্র ও অমেরেন্দ্রনাথ দত্তর মত সৃজনশীল অভিনেতা-পরিচালকের প্রয়াণে ব্যবসায়িক থিয়েটারে বড় শূন্যতা এলো, থিয়েটারের সংগঠনেও নানান বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতা প্রকট হল ১০২০র দশকে বাংলা থিয়েটার পেয়েছিল এক অসামান্য অভিনেতাকে তিনি নির্মলেন্দু লাহিড়ী, ব্যক্তি জীবনে যিনি ছিলেন নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ভাগিনেয় প্রায় একই সময়ে বাংলা থিয়েটার পেল নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীকে বাংলা মঞ্চে তখন গিরিশ পুত্র দানিবাবু, নির্মলেন্দু লাহিড়ী ও শিশিরকুমারের সৃজনশীলতা ১৯২৭ - নির্মলেন্দু লাহিড়ীর তখন কোন বাঁধা মঞ্চ নেই ভ্রাম্যমান থিয়েটার দল নিয়ে বাংলার মফঃস্বলে নাট্যাভিনয় করেন নতুন নাটক ধরবেন নির্মলেন্দু,কিন্তু নায়িকা নির্বাচণ করতে পারছেন না তাঁর দলের প্রখ্যাত অভিনেত্রী তারাসুন্দরী, কুসুমকুমারী, আশ্চর্যময়ীরা বয়সের ভারে ক্লান্ত নতুন মুখের সন্ধান করছেন নির্মলেন্দু এই সময় নির্মলেন্দু সন্ধান পেলেন এক ষোড়সী কিশোরীর দক্ষিণেশ্বর অঞ্চলের শখের থিয়েটার এমিনেন্ট থিয়েটারে অভিনয় করে নির্মলেন্দু এমিনেন্ট থিয়েটারে সেই কিশোরীর অভিনয় দেখতে গেলেন চন্দ্রশেখরনাটকে শৈবলিনীর চরিত্রে অভিনয় করছিলেন সেই কিশোরী নাম তার সরযূবালা কিশোরীর অভিনয়ে মুগ্ধ নির্মলেন্দু তাকে তাঁর ভ্রাম্যমান নাট্যদলে যোগ দিতে বললেন চন্দ্রশেখর, চন্দ্রগুপ্ত,বঙ্গেবর্গী, প্রফুল্ল, দেবলাদেবী, শ্রীদুর্গা ও ষোড়শী এই সাতটি নাটক নিয়ে ভ্রাম্যমান নাট্যদল পূর্ব বাংলা ও বার্মা সফরে গেলেন নির্মলেন্দু আর প্রতিটি নাটকেই প্রধান স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করলেন সরযূবালা
    জন্ম ১৯১২, দক্ষিণেশ্বরের এক দরিদ্র পরিবারে পিতা ভূতনাথ দত্ত সরযূর নিতান্ত শৈশবেই প্রয়াত হন দারিদ্রের কারণে স্কুলশিক্ষা অর্জন করতে পারেননি সুরূপা ছিলেন না মোটেই, ছিলেন কিছুটা খর্বাকৃতির কিন্তু কন্ঠস্বর ছিল তাঁর ঐশ্বর্য নয় বছর বয়সে এমিনেন্ট থিয়েটারে কুমার সিংহনাটকে এক ভিক্ষুক বালকের চরিত্রে সরযূর প্রথম মঞ্চাভিনয় কলকাতার সাধারণ রঙ্গালয়ে অভিনয়ের আগেই সরযূ শখের থিয়েটারে বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করেন তাঁর অভিনয় প্রতিভা পরিণত হল নির্মেলেন্দু লাহিড়ীর নাট্যশিক্ষায়
    কলকাতায় ফিরে নির্মলেন্দু সরযূবালাকে নিয়ে এলেন মনমোহন থিয়েটারে গিরিশচন্দ্রের পুত্র দানীবাবু ছিলেন মনমোহনের ম্যানেজার এখানেই দানীবাবুর পরিচালনায় মীরাবাঈনাটকে প্রথম পেশাদারী রঙ্গালয়ে অভিনয় করলেন এখানে কিশোরী সরযূর সহ অভিনেত্রী ছিলেন প্রবাদ-প্রতীম তারাসুন্দরী ও কুসুমকুমারী ব্যবসায়িক থিয়েটারে তখন নানান বিশৃঙ্খলা নতুন নাটকের অভাব মনমোহন থিয়েটারে সরযূবালায় মুগ্ধ দানীবাবু পুরাতন নাটক নামাচ্ছেন বিষবৃক্ষনাটকে গুরুত্বপূর্ণ কুন্দনন্দিনীর ভুমিকা পেলেন সরযূ এরপর দক্ষযজ্ঞনাটকে সরযূ সতী ও দানীবাবু মহাদেব একদা যে চরিত্র দুটি অভিনয় করতে বিনোদিনী ও গিরিশচন্দ্র দানীবাবু তখন প্রৌঢ়ত্বের শেষ সীমায় আর সরযূ সতেরো বছরের কিশোরী দর্শক সে নাটক নেয়নি কিন্তু প্রসংশিত হয়েছিল সরযূর অভিনয়
    থিয়েটার থেকে সাময়িক সরে গিয়ে তখনকার নতুন বিনোদন সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন সরযূবালা ১৯৩১এ নির্বাক ছায়াছবি ঋষির প্রেমএ প্রথম অভিনয় এই নির্বাক চিত্রে নায়িকা ছিলেন কাননদেবী ১৯৩৫এ পায়ের ধুলোছবিতে অভিনয় করার পর আর সিনেমা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের চেহারা সম্পর্কে তাঁর একটা হীনমন্যতা ছিল কিন্তু প্রমথেশ বড়ুয়ার পিড়াপিড়িতে তাঁর সঙ্গে শাপমুক্তি’,‘মায়ের প্রাণসহ আরো কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন কিন্তু সিনেমা সরযূর যায়গা ছিল না। সিনেমাকে তিনি ভালোবাসতে পারেননি, ফিরে গিয়েছিলেন থিয়েটারে
    বিপুল বিস্তৃতি ছিল সরযূর নাট্যজীবনের ১৯২২এ ন বছর বয়স থেকে ১৯৭৮এ ৬৬ বছর পর্যন্ত মঞ্চাভিনয় করেছেন গিরিশ যুগের শেষ প্রতিনিধি দানীবাবু, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, শিশিরকুমার ভাদুড়ী থেকে আধুনিক অভিনয় ধারার নাট্যশিল্পী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সাবিত্রি চট্টোপাধ্যাএর সঙ্গেও অভিনয় করেছেন ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, সামাজিক, কৌতুক নাটক সব ধরণে নাটকেই অভিনয় করেছেন সরযূ গিরিশ যুগ, শিশির যুগ এবং ১৯৫০ পরবর্তী আধুনিক অভিনয় ধারার নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন তাই তিনি নাট্যসম্রাজ্ঞি
    কেমন ছিল নাট্যসম্রাজ্ঞীর অভিনয় তা জানতে স্বভাবতই আমাকে নির্ভর করতে হবে নাট্য ঐতিহাসিক,আলোচকদের বয়ানের ওপর তরুণ বয়সে নাট্যসম্রাজ্ঞির দু তিনটি নাট্যাভিনয় দেখার সুযোগ পেয়েছি,শুনেছি তাঁর রেডিও নাটক,যার কিছু স্মৃতি মাত্র আছে আমার স্মৃতিতে এখনো উজ্বল গ্রামফোন রেকর্ডে শোনা শাহজাহাননাটকে জাহানারাও শিরাজদৌল্লা নাটকে লুৎফাচরিত্রের অভিনয় নাট্য ঐতিহাসিক ও আলোচকরা বলেন জাহানারাচরিত্রের অভিনয়ই নাট্য সম্রাজ্ঞির শ্রেষ্ঠ অভিনয়কীর্তি নাট্য ঐতিহাসিক অধ্যাপক অজিতকুমার ঘোষ শিশির যুগের অভিনয় ধারার বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে লিখেছেন এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, অভিনেত্রীর কাম্য কতকগুলি সম্পদ থেকে সরযূদেবী বঞ্চিত তাঁর আকৃতি দীর্ঘ নয় এবং চেহারাতেও কোন অসামান্য আকর্ষণ নেই কিন্তু এসব সম্পদ না থাকা সত্বেও সযত্ন চেষ্টা ও অনুশীলনের দ্বারা তিনি তাঁর অভিনয়কে অসাধারণ স্তরে উন্নীত করতে পেরেছেন তিনি যখন তাঁর দেহভঙ্গিকে ঋজু, কঠিন ও প্রত্যয়শীল করে তোলেন তখন তাঁর আকৃতির খর্বতা আর চোখে পড়ে না স্বরের মধ্যে বৈচিত্র্য আনতে স্বরপ্রক্ষেপ করতে তিনি বিশেষ পারদর্শিনী শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর লক্ষণ প্রকাশ পায় বিচিত্র রসের অভিনয় ক্ষমতার মধ্যে” (রঙ্গালয়ে বঙ্গনটী /অমিত মৈত্র) তাঁর কন্ঠস্বরে দৃঢ়তার প্রকাশ,নিখুঁত উচ্চারণ ও অসামান্য স্বরপ্রক্ষেপন কৌশল সমস্ত শারীরিক ত্রুটি ঢেকে দিত শুধু ঐতিহাসিক বা সামাজিক নাটকের ব্যক্তিত্বময়ী অভিনয়ই বা কেন আমার স্মৃতিতে আছে ১৯৭৮এ জয়মা কালী বোর্ডিংভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পূর্ববাংলার বাকভঙ্গিমায় অসাধারণ অভিনয় এই নাটকেই ছিল নাট্যসম্রাজ্ঞীর ছাপ্পান্ন বছরের নাট্যজীবনের শেষ অভিনয় দীর্ঘ সাতান্ন বছরের অভিনয় জীবনে নাট্যসম্রাজ্ঞী অভিনয় করেন আশিটি নাটকে শেষ অভিনয় ১৯৭৯তে রঙ্গনা মঞ্চে জয়মা কালী বোর্ডিংনাটকে
    সুদীর্ঘ অভিনয় জীবনে সরযূবালা আশিটি নাটকে সুনামের সঙ্গে অভিনয় করেছেন কয়েকটি নাটকে তাঁর অভিনয় বাংলার থিয়েটারপ্রেমিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে আছে সেগুলি হল ১৯২৯এ মন্মথ রায় রচিত মহূয়ানাটকের নাম ভুমিকা,১৯৩০এ মন্মথ রায়ের কারাগারনাটকে কঙ্কাও শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের গৈরিক পতাকা’, ১৯৩৫এ মন্মথ রায় রচিত খনানাটকে নাম ভুমিকা,১৯৩৬এ শচীন্দ্রলাল সেনগুপ্তের শিরাজদৌল্লা নাটকে লুৎফা১৯৩৯এ দ্বিজেন্দ্রলা রায়ের শাহজাহাননাটকে জাহানারা’, ১৯৪৩এ দেবদাস নাটকে পার্বতীধাত্রী পান্না নাটকে পান্না’,১৯৫৩তে শ্যামলী  নাটকে সরলা
    ‘মহুয়ামন্মথ রায় লিখেছিলেন ময়মন সিংহ গীতিকার কাহিনী নিয়ে নাচ-গানে জমাটি প্রেমের নাটক ব্যবসায়িক থিয়েটারে সেই প্রথম লোকনাট্য নিয়ে এসেছিলেন মন্মথ রায় নাচ, গান অভিনয়ে সরযূর বহুমুখী প্রতিভার প্রকাশ হয়েছিল এ নাটকে মহুয়ার সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম সেই সুবাদে নজরুলের কাছে সঙ্গীত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন নাচঘর পত্রিকার আলোচক লিখেছিলেন এই নবীনা নটীর শক্তি আমাদের বিস্মিত করেছে এতটুকু দেহের ভিতরে এমন ভাব প্রকাশের শক্তি যে গোপন থাকতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত” (‘রঙ্গালয়ে বঙ্গ নটী’/ অমিত মৈত্র)  
    ১৯৩০এর দশকটা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অগ্নিসময় সেই সময়ের দুটি নাটক সরযূর অভিনয় জীবনে তো বটেই,বাংলার পেশাদারী থিয়েটারেরও স্মরণীয় প্রযোজনা শচীন্স্রনাথ সেনগুপ্তর গৈরিক পতাকাও মন্মথ রায়ের কারাগারসেদিন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে শক্তি যুগিয়েছিল ১৯৪৭এ স্বাধীনতার পরে সেই সময়ের প্রসিদ্ধ রূপমঞ্চপত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে সরযূ বলেছিলেন মনে হতনা  যে আমি থিয়েটার করছি মনে হস্বাধীনতা যুদ্ধে নেমেছি” (‘রঙ্গালয়ে বঙ্গ নটী’/অমিত মৈত্র) মনমোহন থিয়েটারের জন্য শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত মারাঠাবীর শিবাজীর জীবনী ও দেশপ্রেম নিয়ে লেখা নাটকটিতে প্রধান চরিত্রে ওভিনয় করেছিলেন নির্মলেন্দু লাহিড়ী ও সরযূবালা ঐ বছরেই পেশাদারী মঞ্চের আর একটি নাটক আলোড়ন তুলেছিল সেটি মন্মথ রায়ের রচনা কারাগার পৌরাণিক কাহিনীর রূপকে দেশাত্মবোধ জাগানোর নাটক ছিল কারাগার নাট্যকার মন্মথ রায়ের বয়ানে দেশে তখন রাজশক্তির বিরুদ্ধেমহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন চলছিল দলে দলে লোক কারাবরণ করছিল মহাত্মাজীর নির্দেশও ছিল তাই এই পটভূমিকায় মহাভারতে বর্ণিত কংশ-কারাগারের কথা আমার মনে এসেছিল। যে কারাগারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল সেই কারাগারেই আজ উদিত হবে আমাদের জাতীয় জীবনের স্বাধীনতা সূর্য চল সব সেই মহাতীর্থে এই ভাব থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল আমার এই কারাগারনাটক” ( ‘কারাগার ও নাট্যকার মন্মথ রায়’ / ধীরেন্দ্র দেবনাথ নাট্য আকাদেমি পত্রিকা ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭) নাটকটির সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম মাসখানেকের  মধ্যেই নাটকটির বিরুদ্ধে রাজরোষ নেমে এসেছিল রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাগারের অভিনয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো ইংরাজ সরকার,চুয়ান্ন বছর আগেকার নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারার জোরে কারাগারনাটক সেই সময় কী প্রবল উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল করেছিল তার বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় নাট্যসম্রাজ্ঞীর লেখায় “... ‘কারাগারঅভিনয় হবে... এটা আমাদের কাছে তখন আর অভিনয় নয়, রীতিমত মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম মনমোহন থিয়েটার ছিল সেন্ট্রাল এভিনিউতে প্রথম অভিনয় রজনীতে লোকজন ভেঙে পড়েছে। সে কী উন্মাদনা! মূল দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে আমরা মাঝে মাঝে পর্দার ফাঁক দিয়ে ভিড়ের সেই চেহারা দেখে আরো অনুপ্রাণিত হয়ে উঠছি অভিনয় হল সে কী আনন্দ আমাদের! ... অভিনয়ের মধ্যেই জনারণ্য থেকে স্লোগান উঠছে – ‘বন্দে মাতরম তখন অল্প বয়স আমাদের এই জাগরণ দেখে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি তখন আমরা আর কেউ অভিনেতা অভিনেত্রী নই,প্রত্যেকেই স্বাধীনতা সৈনিক” (নাট্যকার মন্মথ রায়ের জীবনী ও নাট্য সাধনা/অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী প.ব.নাট্য আকাডেমি পত্রিকা ফেব্রুয়ারি ৯৭ সংখ্যায় উদ্ধৃত)
    নাট্যকার মন্মথ রায় সরযূর নাচ,গান,অভিনয়ের বহুমুখী দক্ষতাকে মনে রেখে মহুয়ালিখেছিলেন তেমনই তাঁর অভিনয় ক্ষমতাকে মনে রেখে নায়িকা প্রধান ঐতিহাসিক নাটক খনামঞ্চস্থ হল ১৯৩৫এর জুলাই মাসে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় নির্মলেন্দু লাহিড়ী-সরযূবালা জুটি তখন প্রবল জনপ্রিয় অনেকদিন ধরে চলেছিল খনা নাট্য ঐতিহাসিক অজিতকুমার ঘোষ খনানাটকে সরযূর অভিনয় সম্পর্কে লিখেছিলেন তাঁর করুণ রসাত্মক অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য হল দ্রুত কন্ঠস্বরের পরিবর্তন করে হঠাৎ একটা ক্কূলহারা আর্তনাদের তাঁর কথাগুলি যেন ভেঙে পড়ে প্রবলভাবে নিঃশ্বাসবায়ু আকর্ষণের মধ্যেও একটা বুকফাটা বেদনার হাহাকার যেন ছড়িয়ে পড়ে
    ব্যবসায়িক থিয়েটারে তখন ক্ষয়ের কাল শুরু হয়েছে শিশিরকুমার ভাদুড়ী নতুন নাটক ধরতে পারছেন না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা এই আবহেও নির্মলেন্দু লাহিড়ী-সরযূবালা জুটির নাটক মঞ্চসাফল্য পাচ্ছে মহুয়া, গৈরিক পতাকা, কারাগার, খনা প্রভৃতি নাটকে অবিস্মরণিয় অভিনয় করে সরযূ তখন খ্যাতির শিখরে ১৯৩৮এ মিনার্ভা নতুন নাটক ধরলো শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর সিরাজদৌল্লা নির্মলেন্দু লাহিড়ী সিরাজ,সরযূবালা লুৎফা বাংলা রঙ্গালয়ের ইতিহাসে সিরাজ-উদ-দৌলা ছিল এক যুগান্তকারী প্রযোজনা এক সময় এ নাটকের সংলাপ প্রবাদের মত লোকের মুখে মুখে শোনা যেত বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, জাতীর সৌভাগ্যসূর্য আজ অস্তাচলগামী কে তাকে দেবে আশা ...দেশাত্মবোধের জাগরণ ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা সঞ্চার ছিল এ নাটকের উদ্দেশ্য সিরাজদৌল্লা কী প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল তার একটি বর্ণনা পাই নাট্য সম্রাজ্ঞীর স্মৃতিচারণে নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত শতবার্ষিকী স্মরণিকায় লিখেছিলেন “... সিরাজদ্দৌলার অভিনয় হচ্ছে হঠাৎ শুনলাম নেতাজী সুভাষচন্দ্র ও হেমেন্দ্রকুমার রায় এসেছেন নাটক দেখতে আমি মঞ্চের উপর লুৎফার অভিনয় করছি লুৎফার সংলাপে ছিল চলুন জাহাঁপনা আপনার হাত ধরে এই আঁধার রাতে আমরা বেরিয়ে পড়ি কেউ জানবে না,বাংলার নবাব তাঁর বেগমের হাত ধরে চিরদিনের মতো বাংলা ছেড়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন ... হঠাৎই সামনের সারিতে নজর পড়লো, সুভাষচন্দ্র রুমাল বার করে চোখ মুছলেন অভিনয় শেষে তিনি ভিতরে এসে শচীনদাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন নেতাজী আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন আমরা অভুভুত  হয়ে দুই মহান মানুষকে আলঙ্গনাবদ্ধ দেখলাম ( শচীন্দ্রনাথ ও সিরাজদ্দৌলা’ / দীপেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত নাট্য আকাডেমি পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি ৯৭)
    সিরাজদ্দৌলার পরে যে নাট্য চরিত্রটি সরযুকে লিজেন্ডকরেছিল সেটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের শাহজাহান নাটকের জাহানারা প্রথমে শিশিরকুমার ভাদুড়ী করতেন শাজাহান, ঔরঙ্গজেব দানীবাবু পরে নির্মলেন্দু লাহিড়ীও করেছেন, তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে পেশাদারী মঞ্চে নানান দল শাহজাহান নাটকের অভিনয় করেছেন শিশিরকুমার ভাদুড়ী থেকে ছবি বিশ্বাস কত অভিনেতাই শাজাহান করেছেন কিন্তু জাহানারা চরিত্রে সরযূর কোন বিকল্প ছিল না তিনি নিজেই যে কতবার জাহানারার করেছেন নিজেই বিস্মৃত হয়েছিলেন অখন্ড বাংলার এমন কোন শহর নেই যেখানে তিনি জাহানারা চরিত্রে অভিনয় করেননি জাহানারা সরযূর সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্র সৃষ্টি বস্তুত জাহানারা চরিত্রে অসামান্য অভিনয়ের পর থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে নাট্যসম্রাজ্ঞীর তকমা সংযোজিত হয়ে যায় আমাদের অশেষ সৌভাগ্য যে হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানী বা ইনরেকো সিরাজদ্দৌলাশাহজাহাননাটকদুটি গ্রামফোন রেকর্ডে ধ্বনিবদ্ধ করে রেখেছিলেন সেই সুবাদে আমরা আজও গ্রামফোন রেকর্ড থেকে কমপ্যাক্ট ডিস্কে রূপান্তরিত অডিও নাটকে নাট্যসম্রাজ্ঞীর অসামান্য বাচিক অভিনয় শোনার সুযোগ পাই
    ১৯৩৯এ শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ৪২এ ভারতছাড়ো আন্দোলনে উত্তাল বাংলা, ৪৩এ মানুষের সৃষ্টি মন্বন্তর কলকাতার রাস্তায় মৃত্যুমিছিল কলকাতার থেয়েটার হলএ দর্শকের আকাল, শিশিরকুমার নাটক করতে পারছেন না ব্যবসায়িক থিয়েটারে তখন চরম ক্ষয়ের সময় থিয়েটার হচ্ছে বটে কিন্তু দর্শক হচ্ছে না জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের অগ্নগর্ভ পস্থিতি, বাংলার মন্বন্তর এসব নিয়ে কোন হেলদোল ব্যবসায়িক থিয়েটারে ছিল না ইতিমধ্যে নতুনের আগমনের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছে ব্যবসায়িক থিয়েটার ১৯৪৩এ গঠিত হয়েছে গণনাট্য সঙ্ঘ,মঞ্চে শ্রমজীবি মানুষের জীবন আর সংগ্রামের সামাজিক ভাবনার নাট্যভাষ্য তুলে ধরার আদর্শ নিয়ে শিশিরকুমারের মঞ্চেই বাংলা থিয়েটারের নবযুগের উন্মেষ ঘটলো শিশিরকুমারের শ্রীরঙ্গম মঞ্চে,১৯৪৪এর ১০ই জুলাই শম্ভু মিত্রর পরিচালনায় অভিনীত হল গণনাট্য সঙ্ঘের নাটক জবানবন্দী,এবং ২৪শে অক্টোবর শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্যের যৌথ পরিচালনায় অভিনীত হল সেই যুগান্তকারী নাটক নবান্ন বাংলা নাটকে নবযুগের উন্মেষে - নতুনতর নাট্যভাবনা থেকে দূরে থাকতে পারেননি ১৯৪৬এ গণনাট্যকার তুলসী লাহিড়ীর নাটক দুখীর ইমানপ্রযোজনা করার সাহস দেখিয়েছিলেন নবতর নাট্যভাবনা বাংলা থিয়েটারে তখন এসে গেছেন বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভূ মিত্র,উৎপল দত্ত,ঋত্বিক ঘটকরা পেশাদারী থিয়েটারের সেই ক্ষয়ের কালেও সরযুবালা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দী অভিনেত্রী
    ১৯৩৯এ সাহজাহানের পর ১৯৫০ পর্যন্ত অনেকগুলি নাটকে অভিনয় করেছিলেন কিন্তু সেগুলি, ঐতিহাসিক নাটক, ‘ধাত্রী পান্নাও কিছুটা দেবদাসছাড়া দর্শক আনুকুল্য পায়নি সামাজিক ভাবনার নাট্যধারার কাছে আবেগ সর্বস্ব মেলোড্রামাটিকঅভিনয় ধারার সঙ্গে দর্শক আর মানিয়ে নিতে পারতেন না নতুন সময়ের সঙ্গে মানানসই চিন্তাধারার নাট্য সংগঠক ও পরিচালকও আর ছিলেন না। ১৯৫0এর শুরুতে সরযূর নাট্যগুরু নির্মলেন্দু লাহিড়ী প্রয়াত হলেন সরযূ প্রায় তিনবছর থিয়েটার থেকে সরে থাকলেন ১৯৫৩র অক্টোবরে স্টার থিয়েটারের আমূল সংস্কারের পর মঞ্চস্থ হল নিরূপমা দেবীর উপন্যাসের দেনারায়ণ গুপ্ত কৃত নাট্যরূপ শ্যামলী’ – এক বোবা মেয়ের দুর্ভাগ্যের নাট্যকথা নায়ক নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার ও সাবিত্রি চট্টোপাধ্যায় একনাগাড়ে ৪১৮ রাত্রি অভিনয়ের ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল শ্যামলী স্নেহময়ী মা সরলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সরযূবালা শ্যামলীর স্টার থিয়েটারের পরের নাটক পরিণীতাতেও নাট্যসম্রাজ্ঞীকে দেখি মা ভুবনেশ্বরী চরিত্রে একাদিক্রমে তিন বছর ধরে দুটি নাটকে মা চরিত্রের সংবেদনশীল অভিনয়ের সূত্রে ব্যবসায়িক থিয়েটারে সকলের কাছে,দর্শকদের কাছেও হয়ে উঠলেন সরযূ মা এরপর তিনি দীর্ঘ সময় রঙমহলথিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন শুধু অভিনয়ই নয়, থিয়েটারকে বাঁচানোর প্রয়াসেও সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন নাট্যসম্রাজ্ঞী ফেব্রুয়ারি ১৯৬২তে রঙমহলের কর্মী,কলাকুশলীরা ধর্মঘট করেছিলেন তাদের নানা দাবী নিয়ে কর্তৃপক্ষ থিয়েটার বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন,পারেননি রঙমহল শিল্পীগোষ্ঠীরপরিচালনায় থিয়েটার সচল থাকলো,নেতৃত্রে ছিলেন জহর রায়ের সঙ্গে নাট্যসম্রাজ্ঞী  ১৯৭৭ পর্যন্ত এই ভুমিকায় যুক্ত ছিলেন ১৯৬২ থেকে ১৯৭৭ রঙমহলের সঙ্গে যুক্ত থাকাকালীন এই পনেরো বছরে তাঁর অসামান্য অভিনয় রংমহলের প্রযোজনাগুলিকে সমৃদ্ধ করেছিল আর সেই সঙ্গে থিয়েটারের কর্মী-কলাকুশলী ও শিল্পীদের কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন তাদের রুজি-রুটির সংগ্রামে পাশে থাকার জন্য এই পর্যায়ে তিনি অভিনয় করেছিলেন মায়ামৃগ,কথা কও,স্বীকৃতি,নাম বিভ্রাট,অতয়েব,নহবত,সেমসাইড,আমি মন্ত্রী হবো, তথাস্তু, সুবর্ণগোলক প্রভৃতি নাটকে অগস্ট ১৯৭৭এ জহর রায় প্রয়াত হলেন ১৯৭৮এ দেবনারায়ণ গুপ্তর অনুরোধে এলেন রঙ্গনা,অভিনয় করলেন চন্দ্রনাথ ও জয়মা কালী বোর্ডিংএ পূর্ববঙ্গীয় বাকভঙ্গিমায় কৌতুকাভিনয় এই নাটকেই নাট্যসম্রাজ্ঞীর শেষ অভিনয় ১৯৭০এ নাট্যশিল্পে অনন্য অবদানের জন্য সঙ্গীত নাটক আকাদেমি সম্মানে ভূষিতা হন নাট্যসম্রাজ্ঞী
    ১৯৭৯র পরে আর অভিনয় করেননি সমসাময়িক অভিনেতা অভিনেত্রীরা সকলেই প্রয়াত হয়েছেন অথবা বয়সের ভারে ক্লান্ত হয়ে থিয়েটার থেকে সরে গেছেন প্রভা দেবী চলে গেলেন নভেম্বর ১৯৫২তে ছবি বিশ্বাস ১৯৬২, অহীন্দ চৌধুরী ১৯৭৪এ, ১৯৬৯এ চলে গেলেন জহর গাঙ্গুলী গিরিশ ও শিশির যুগের সন্ধিক্ষণে উঠে আসা সরযূবালা নাট্যসম্রাজ্ঞী হয়ে একা ব্যবসায়িক থিয়েটারের অন্তিম লগ্ন ১৯৮৯ পর্যন্ত অভিনয় করে গিয়েছেন ২২শে জুলাই ১৯৯৪ বিরাশি বছর বয়সে চির বিদায় নিলেন নাট্য সম্রাজ্ঞী সরযুবালা, থিয়েটারের মানুষজনের সরযূমা

স্বাধীনতা-উত্তর নবনাট্য ধারার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্র

   
১৯৪০ পরবর্তী ভারতীয় নাট্যামঞ্চের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্র এই কথনে বোধকরি কোন বিতর্কের অবকাশ নেই,অথচ তৃপ্তি মিত্রর নাট্যাভিনয়ে আসাটাই আকস্মিক এবং ঘটনাচক্রে গণনাট্য সঙ্ঘের ইতিহাস সৃষ্টিকারী নাটক নবান্নর প্রস্তুতিকালে এক অভিনেত্রী অনুপস্থিত হন ফলে বিজন ভট্টাচার্য তার মাসতুতো বোন তৃপ্তিকে রাজি করান অভিনয়ের জন্য ১৯৪৪এর ২৪শে অক্টোবর শ্রীরঙ্গম মঞ্চে গণনাট্য সঙ্ঘের প্রযোজনায় এবং শম্ভূ মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্যের যুগ্ম পরিচালনায় নবান্ন অভিনীত হল তারপর তৃপ্তিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তৃপ্তি মিত্র খুব বেশি সংখ্যক নাটকে অভিনয় করেছেন তেমন নয়, কিন্তু তিনি যে চরিত্রেই অভিনয় করেছেন সেই চরিত্রগুলি এমন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে নির্মাণ করেছেন যে নাট্যদর্শকরা সেই চরিত্রে অন্য কাউকে ভাবতেও পারতেন না,এখানেই তৃপ্তি মিত্রের অনন্যতা
    ১৯৪৩এর মন্বন্তরের পটভূমিকায় রচিত বিজন ভট্টাচার্যর নবান্ন নাটক দিয়ে তৃপ্তি মিত্রর নাট্যজীবন শুরু হয় তাঁর বা নবচেতনার অভিনয় ধারার সূত্রটিকে জানার জন্য সেই সময়টাকেও ছুঁয়ে যাবো ১৯৪০এর দশকটা ছিল এক উত্তাল সময় দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ শুরু হয়েছে ১৯৩৯এ যুদ্ধের অনিবার্য পরোক্ষ ফল নিষ্প্রদীপ বাংলায় কালোবাজারি, মজুতদারি আর সাধারণ মানুষের হতাশা,বেকারি,দারিদ্র,মনুষ্যত্বের লাঞ্ছনা বিয়াল্লিশে স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায় ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়েছে ১৯৪৩এ দেখা দিল মানুষের তৈরি ভয়ঙ্করতম মন্বন্তর কলকাতার রাস্তায় একটু ফ্যানের জন্য মৃত্যুমুখী মানুষের হাহাকার পঁয়ত্রিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল এই ভয়ঙ্করতম মন্বন্তরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের এই সমস্ত সামাজিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যকারণে গড়ে উঠেছিল গণনাট্য সঙ্ঘ লক্ষ লক্ষ মৃত্যু আর সামাজিক অবক্ষয়ের যন্ত্রণার গভীর থেকে জন্ম নিল এক  সৃজনশীল সংস্কৃতি রচিত হল দুটি নাটক জবানবন্দীনবান্ন’,যা বাংলা নাটক রচনা ও নাট্যাভিনয়ের ধারায় এনে দিল যুগান্তকারী দিক বদল পূর্ববর্তী একশবছরের সনাতনী নাট্য ও মঞ্চের প্রয়োগভাবনার ওলট পালট ঘটিয়ে নবান্নহয়ে গেল বাংলা নাটক ও মঞ্চের এক মাইলফলক  নাটক পেল এক নতুনতর নাট্যভাষা সনাতনী শিল্পের জন্য শিল্প’-অনুগত সাহিত্যভাবনা পরিবর্তিত হয়ে গেল নতুনতর স্লোগানে – ‘শিল্প হবে মানুষের জন্য তারও আগে ১৯৩৬এ স্থাপিত প্রগতি লেখক সঙ্ঘতার ইস্তাহারে আহ্বান জানালো আমাদের বিপর্যস্ত সমাজের দাবি মেনে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আমরা চাই জনসাধারণের সঙ্গে সর্ববিধ কলার নিবিড় সংযোগ নাটকের ক্ষেত্রে গণনাট্য সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই আহ্বানের বাস্তব প্রয়োগ হয়েছিল নবান্নকরেছিল গভীর জীবনবোধ সংপৃক্ত বাস্তববাদী অভিনয় ধারার সূচনা তৃপ্তি একটি প্রবন্ধে লিখেছেন নবান্নতে প্রথম কৃষক নায়ক হয়ে এল...ঐ নাটকের শেষ দৃশ্যে যখন বলা হয় জোর প্রতিবাদ প্রধান, জোর প্রতিরোধতখন এই সংলাপ আসত অনিবার্যভাবেই এবং ঐ সংলাপ বলাও হত এমনভাবে যাতে মনে হ, ঠিক ঐভাবেই ঐ সংলাপ আপনি বেরিয়ে আসে একে সাজানো কথা মনে হত না” (‘শম্ভূ মিত্রঃরঙ্গমঞ্চের বিস্ময়’/অজিত বসু) তৃপ্তি নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন সেই পালাই (নবান্ন) আমার অনুভবলোকে যেন এক ওলট-পালট করে দিয়ে গেল এই প্রথম মনে হল,অভিনয় একটা মিডিয়াম অফ এক্সপ্রেশন, এখানেও মানুষ নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে পারে ( সোনার দাগ’? গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ)
    তৃপ্তি মিত্রর জন্ম ১৯২৫এর  ২৫শে অক্টোবর, এখনকার বাংলা দেশের ঠাকুরগাঁওতে পিতা - আশুতোষ ভাদুড়ী এবং মাতা - শৈলবালা দেবী। তাঁর আত্মকথাধর্মী লেখা আমার ছেলেবেলায় তিনি লিখেছেন- আমার জন্মস্থান উত্তরবঙ্গে;অধুনা বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও সাব ডিভিশনে। আবহাওয়াটা ছিল একেবারেই গ্রাম্য। তাও টাউন বলা হত কারণ কোর্ট-কাছারি, ব্যাঙ্ক- এ সবই ছিল। এমনকী একটি ছোটখাটো থিয়েটার হল-ও ছিল। ছেলেদের জন্যে হাইস্কুল,মেয়েদের মাইনর গার্লস্ স্কুল- এ সবই ছিল। আমেজ ছিল গ্রামের খোলামেলা। মেয়েদের স্কুলের পাশ দিয়ে, এসডিও-র বাড়ির ধার ঘেঁষে এঁকেবেঁকে যে পাহাড়ি নদীটি বয়ে গেছে, তার নাম টাঙন। তারই অদূরে আমাদের বাড়ি(সূত্র পিয়াস মজিদ / অনন্যাওয়েব,বাংলা দেশ ) শৈশবের পড়াশোনা ঠাকুরগাঁওয়ের মাইনর গার্লস স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত,তারপর ১৯৩৯ থেকে কলকাতার প্যারীচরণ সরকার স্কুলে এবং সেখান থেকেই ১৯৪৩এ মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন আশুতোষ কলেজে
    ‘নবান্নর আগে ১৯৪৩এ বিজন ভট্টাচার্যর জবানবন্দীনাটকে অভিনয় করেছিলেন ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির তখনকার সম্পাদক পূরচাঁদ যোশীর আগ্রহে মুম্বাইয়ে খাজা আহমদ আব্বাস জবানবন্দীর কাহিনী নিয়ে নির্মাণ করেন হিন্দি চলচ্চিত্র ধরতি কে লাল শম্ভূ মিত্র ছিলেন সকারী পরিচালক ছবিটিতে তৃপ্তি অভিনয় করেছিলেন ১৯৪৫এর ডিসেম্বরে শম্ভূ মিত্রর সঙ্গে তৃপ্তির বিবাহ হয়
    ১৯৪৮এ গণনাট্য সঙ্ঘ থেকে সরে এসে তৃপ্তি-শম্ভূ মিত্ররা বহুরূপী নাট্য সংস্থা গড়ে তোলেন তারপর তো ইতিহাস! বহুরূপীর নবান্ন (১৯৪৮), পথিক (১৯৪৯), ছেঁড়া তার, উলুখাগড়া চার অধ্যায়’ (১৯৫১),‘দশ চক্র’ (১৯৫২),‘রক্ত করবী’(১৯৫৪),‘ডাকঘর’ (১৯৫৭),‘পুতুল খেলা’(১৯৫৮), ‘কাঞ্চরঙ্গ’ (১৯৬১), ‘বিসর্জন’ (১৯৬১), ‘রাজা’ (১৯৬৪), ‘ওয়াদিপাউস’ (১৯৬৪), ‘বাকি ইতিহাস’ (১৯৬৭), ‘বর্বর বাঁশি’ (১৯৬৯), পাগলা ঘোড়া (১৯৭১), ‘চোপ আদালত চলছে’ (১৯৭১),  ‘অপরাজিতা’ ‘যদি আর একবার’, ‘সরিসৃপ’, পেশাদারী মঞ্চে সেতুপ্রভৃতি নাটকে অসামান্য অভিনয় শম্ভূ মিত্রর শিক্ষায় নিজেকে তৈরি করেছিলেন তৃপ্তি সেই শম্ভূ মিত্র সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল থিয়েটারী কারণে পুতুল খেলানাটকের রিহার্শালে তাঁর অভিনয় চলাকালীন শম্ভূ মিত্র এমন একটা ভঙ্গি করতেন তাতে তৃপ্তির মনে হয়েছিল তার মনসংযোগে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্যই তিনি এটা করছেন দুই প্রবল ব্যক্তিত্বের সঙ্ঘাত দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছিল শম্ভূ মিত্র বহুরূপী থেকে সরে যাবার পরেও তৃপ্তি বহুরূপীতে ছিলেন ১৯৮২ পর্যন্ত   ১৯৮৩তে নিজের বাড়িতে গড়ে তোলেন নাট্যশিক্ষা কেন্দ্র আরব্ধ’, সেখানে নবীন শিক্ষার্থীদের নাট্যাভিনয় শেখাতেন, শিল্পী গড়ার কাজ করতেন  আরব্ধতৃপ্তির নির্দেশনায় নবরূপে রক্তকরবীর নির্মাণ ও অভিনয় করেছিল ১৯৮৪র জানুয়ারিতে নব পর্যায়ের রক্তকরবীতে অবশ্য তিনি অভিনয় করেননি এছাড়া আরব্ধতাঁর নির্দেশনায় আরো কয়েকটি নাটক - একক নাট্য অপরাজিতাও বিধায়ক ভট্টাচার্যর সরিসৃপহাজার চুরাশির মামঞ্চায়ন করেছিল বহুরূপীর রবীন্দ্রনাটক ডাকঘরনাটকটিরও পরিচালক ছিলেন তৃপ্তি মিত্র
    নবান্ন নাটকে ছোট বউ বিনোদিনী, ‘ছেঁড়া তারএ ফুলজান বিবি, ‘বিসর্জনএ গুণবতী, ‘ওয়াদিপাউসএ ইয়োকান্তে,কাঞ্চনরঙ্গে তরলা, ‘বাকি ইতিহাসএ কণা, ‘চোপ আদালত চলছেতে বেনারে, পুতুল খেলায় বুলু ও রাজানাটকে রাণী সুদর্শনা প্রভৃতি স্মরণীয় চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র তুবু তাঁর রক্তকরবীর নন্দিনী চরিত্রটিই লিজেন্ড হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় রক্তকরবীর কোন মঞ্চায়ন দেখে যেতে পারেন নি তিনি চেয়েছিলেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী রক্তকরবীঅভিনয় করুন শিশিরকুমারেরও তেমন ইচ্ছা ছিল, কিন্তু নন্দিনী করার মত অভিনেত্রীর সন্ধান পাননি, ফলে তাঁরও রক্তকরবী করা হয়নি অবশেষে শম্ভূ মিত্রর নাট্য শিক্ষায় সার্থক নন্দিনীপেয়েছিল বাংলা থিয়েটার রক্তকরবীর নন্দিনী যেমন  রবীন্দ্রনাট্যের শ্রেষ্ঠ নারী চরিত্র, তেমনই তৃপ্তি মিত্রর নন্দিনীভারতীয় থিয়েটারের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে দীর্ঘ এগারো বছর নানা সময়ে তিনি নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করেছেন নন্দিনী রবীন্দ্রনাথের এক আশ্চর্য সৃষ্টি নন্দিনী প্রেমের প্রতীক সুন্দরের প্রতীক হয়ে যক্ষপুরীতে আসে নন্দিনী,যক্ষপুরীর জাল ছিঁড়ে আলোর দরজা খুলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখায় নন্দিনী চরিত্রে তাঁর যেন সম্মোহন করে রাখতো পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহের দর্শকমন্ডলীকে নন্দিনী কখনো স্নেহ প্রবণ, কখনো গদ্যময়, কখনো তেজস্বিনী আর প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি একবার যারা নন্দিনী চরিত্রে তৃপ্তি মিত্রর কাব্যিক বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় প্রত্যক্ষ করেছেন, সেটি তার অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে আছে
    রক্তকরবীর নন্দিনী তৃপ্তি মিত্রর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃজন, সংশয় নেই নন্দিনী ছাড়াও রাজা ওয়াদিপাউসনাটকে ইয়োকান্তে,পুতুল খেলায় বুলুও রবীন্দ্রনাট্য রাজা তে রাণী সুদর্শনার চরিত্রে তার সম্মোহনী অভিনয় ওয়াদিপাউসেরাজার চরিত্রে শম্ভূ মিত্র হয়তো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছিলেন তেমনই রাণি ইয়োকাস্তের চরিত্রে তৃপ্তি মিত্রর অনন্য অভিনয় প্রতিভার ছটায় উজ্বল হয়ে আছে রাজা ওয়াদিপাউস যে তাঁরই সন্তান এই সত্য জানার পর ইয়েকাস্তের হাহাকার হায় মানুষ, নিজের ইতিবৃত্ত তুমি যেন কখনো না জানোকোনদিন ভোলার নয় রাজা নাটকের রাজা কোন রক্তমাংসের রাজা নয়, রাণী সুদর্শনারই এক খন্ডসত্তা সুদর্শনা চরিত্রে তৃপ্তি মিত্র আঙ্গিক ও বাচিক অভিনয়ে যেন মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন দর্শকদের কখনো উগ্র, কখনো হতাশা জর্জর, কখনো অভিমানী স্বর নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্ষেপনে সম্মোহিত করে রাখতেন নাট্যচরিত্রের অনুপুঙ্খ অধ্যয়ন ও তার ভেতরে প্রবেশ করার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর সেই ক্ষমতা বলেই প্রখর মেধা ও শিল্প চেতনার অপরূপ সমন্বয় ঘটিয়ে তাঁর অভিনীত নাটকগুলির চরিত্র নির্মাণকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন পরিচয়পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে তৃপ্তি বলেছিলেন “......সেই রাজার কথা ভাবো রাজা নাটকে রানী সুদর্শনা, দেখো তার আগে ওয়াদিপাউসএ রানী করেছি, অনেক রানী দেখেছি, যাত্রা থিয়েটারের অভিনয়ে, এদেশের বিদেশের অনেক রানী চরিত্র দেখেছি কিন্তু রাজার যে রানী সুদর্শনাসে একেবারেই অন্যরকম কে রাজা? রানী কে? ওয়াদিপাউসের রানী করা সহজ কারণ,এ রকম রানী ইতিহাসে ছিল কিন্তু রাজার রানী কোথাও নেই,কেউ ছিল না, ... (তথ্যসূত্র - পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকা / মে ২০০৭ সংখ্যা থেকে) রাজানাটকের সুদর্শনার চরিত্রে তৃপ্তি মিত্রর অভিনয় প্রসঙ্গে সাহিত্যিক সন্তোষ কুমার ঘোষের মন্তব্য উদ্ধার করি আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৯৬৬র ১৭ই জুন সন্তোষকুমার লিখেছিলেন ... সম্রাজ্ঞীর মত সমগ্র রঙ্গমঞ্চ জুড়ে ছিলেন তৃপ্তি মিত্র উদাসীন রাজার আচরণে কখনওওবিমানিনী, কখনও সর্বস্ব ত্যাগিনী বহু পরস্পর-খন্ডী আলো-ছায়ায় সুদর্শনা রূপিনী তিনি এই-স্থির, এই-চঞ্চল পায়ে নায়াসে সঞ্চরণ করেছেন রাজা যদি অরূপ বীণা তিনি সেই বীণার গান (পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকা / মে ২০০৭ সংখ্যা থেকে )
    এ দেশে থিয়েটার তার কর্মীদের রুজি-রুটির ব্যবস্থা করতে পারে না অতয়েব তাঁকে যেতে হয়েছিল পেশাদারী থিয়েটারে সংসার চালানোর তাগিদে ১৯৫৯এ যোগ দিলেন বিশ্বরূপা থিয়েটারে রাসবিহারী সরকার পরিচালিত সেতুনাটকে অভিনয় করেছিলেন তৃপ্তি তাপস সেনের আলোর জাদু আর তৃপ্তি মিত্রর অসামান্য অভিনয়ে ভর করে সেতুনাটকটি নজির গড়েছিল ১২৫০ রজনী অভিনয়ের
    অনেকগুলি ছায়াছবিতেও অভিনয় করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র ১৯৪৬এ খাজা আহমেদ আব্বাসের ধরতি কে লালকরার পর ১৯৫০এ ঢাকায় চলচ্চিত্রায়িত উর্দু ছবি জাগা হুয়া সবেরাতে অভিনয় করেন এ ছাড়া অনেকগুলি বাংলা ছবিতেও অভিনয় করেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পথিক (১৯৫৩),ময়লা কাগজ (১৯৫৪), রিক্সাওয়ালা (১৯৫৫), শুভ বিবাহ (১৯৫৯), মাণিক (১৯৬১), সূর্যস্নান (১৯৬২), ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পপ্রভৃতি আকাশবাণী কলকাতায় রেডিও নাটক ও প্রশাসনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি আকাশবাণীর সংগ্রহশালা থেকে কমপ্যাক্ট ডিসকে ধ্বনীবদ্ধ রেডিও নাটক তাহার নামটি রঞ্জনায় শম্ভূ মিত্রর সঙ্গে তাঁর বাচিক অভিনয় এখনও শিহরণ জাগায় ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত তিনি আকাশবাণীর বিশেষ সম্মানীয় প্রযোজক (প্রোডিউসার এমিরিটাস) ছিলেন ১৯৮১তে বিশ্বভারতী নাট্য বিভাগের ভিজিটিং ফেলো মনোনীত হয়েছিলেন তৃপ্তি মিত্র ১৯৬২তে ললিতকলার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা সঙ্গীত নাটক আকাডেমি সম্মানপান এছাড়া ১৯৭১এ পদ্মশ্রী,১৯৮৭তে পশ্চমবঙ্গ নাট্য আকাডেমি সম্মান ও ১৯৮৯তে মধ্যপ্রদেশ সরকারের কালীদাস সম্মানে ভূষিতা হন ১৯৮৯এর ২৪শে মে কলকাতায় প্রয়াত হন স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় থিয়েটারের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্র চৌষট্টি বছর বয়সে
    দেড়শো বছর আগের বিনোদিনীর মঞ্চাভিনয় আমরা দেখিনি নাট্যসম্রাজ্ঞী সরযুবালা ও নবনাট্য ধারার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্রর অভিনয় এখনও অনেকের স্মৃতিতেই উজ্বল প্রযুক্তির কল্যাণে এই দুজনের কিছু বাচিক অভিনয় কমপ্যাক্ট ডিসক বা অন্তর্জাল প্রযুক্তিতে শোনা যায় এই তিন মহান অভিনেত্রীর জীবন ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমি বুঝতে চেয়েছি বাংলা নাটকের স্ত্রী চরিত্রে বিগত দেড়শো বছরের নাট্যাভিনয়ের ধারাটি ও তার বিবর্তনকে ভারতীয় থিয়েটারে এঁদের অবিস্মরণীয় অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে আমাদের স্মরণ করতেই হবে

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়